সোমবার ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

'রনজিত কুমারের অসময়ে চলে যাওয়া সংস্কৃতির বড় ক্ষতি'

শনিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:৪২

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: রনজিত কুমারের অসময়ে চলে যাওয়া আমাদের সংস্কৃতির বড় একটি ক্ষতি। তিনি অনেক প্রতিভা তৈরি করেছেন। সক্রেটিস যেমন তাঁর শিষ্য প্লেটোর মাধ্যমে বেঁচে আছেন রনজিত কুমারও তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে বেঁচে থাকবেন।

নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের ২০১৯-২০২১ সেমিনার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সমগীত সংস্কৃতি প্রাঙ্গণের উদ্যোগে ‘সাংস্কৃতিক সংগঠন বিকাশে রনজিত কুমারের সৃজনশৈলী’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা প্রয়াত সাংস্কৃতিক সংগঠক রনজিত কুমার সর্ম্পকে এমন মন্তব্য করেন।

শুক্রবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৫ টায় শহরের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তনের এক্সপেরিমেন্টাল হলে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, সমগীত সংস্কৃতি প্রাঙ্গণের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অমল আকাশ।

সমগীত সংস্কৃতি প্রাঙ্গণ নারায়ণগঞ্জের সভাপতি আমির হোসেনের সভাপতিত্বে ও কেন্দ্রীয় সহসভাপতি দিনা তাজরিনের সঞ্চালনায় প্রবন্ধের উপর আলোচনা করেন-সংস্কৃতিজন রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ভবানি শংকর রায়, সহসভাপতি ও শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমির পরিচালক ধীমান সাহা জুয়েল, কবি আরিফ বুলবুল, প্রাবন্ধিক ফিরোজ আহম্মেদ, গণমাধ্যমকর্মী মিলটন আনোয়ার এবং সমগীতের রেবেকা নীলা।

বক্তারা বলেন, তিনি সচেতনভাবে শিশুদের সংগঠিত করেছেন ভবিষত্যের জন্য আদর্শ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। তিনি সংস্কৃতি ধরে তাঁর কাজ শুরু করেছেন এবং নতুন কিছু করার জন্য সবসময় অস্থির থাকতেন।

বক্তারা আরও বলেন, তিনি কখনও বিজ্ঞানমনস্কতার বাইরে কোনো কিছু বিশ্বাস করতেননা। সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে শেখা কাজ তিনি চাকুরীর ক্ষেত্রে কাজে লাগাতেন আবার চাকুরী থেকে শেখা অভিজ্ঞতা তিনি সংগঠনের কাজে লাগিয়েছেন। তিনি চাকুরীর সুবাধে দেশের প্রায় সমস্ত উপজেলায় ভ্রমণ করেছেন এবং শিশুদের সাথে বিশদভাবে মিশেছেন। তিনি এটা বলতেন যে, সমাজ সংস্কারের আগে সমাজ পরিবর্তন করা জরুরি। রনজিত কুমার আমাদের সকলের কাছে শিক্ষা গুরুর মর্যাদা পেয়েছেন তাঁর কাজের জন্য।

বক্তারা বলেন, রনজিত কুমার একজন চারণ সংগঠক ছিলেন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের পাশাপাশি তিনি কবি ছিলেন। তিনি অনেক কাজের স্বপ্ন দেখতেন এবং কাজে নেমে যেতেন। আমরা ভাবতাম তিনি একসাথে এতগুলো কাজ কীভাবে করবেন। 

এছাড়া মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন-রইস মুকুল, দীপক ভৌমিক, মাঈন উদ্দীন মানিক প্রমুখ। এর আগে রনজিত কুমারের ‘কেহ ভাঙ্গে কেহ গড়ে’ কবিতা আবৃত্তি করেন সমগীতের তিথী সুবর্ণা। 

উপস্থিত ছিলেন-বাসদ’র জেলা সমন্বয়ক নিখিল দাস, সিপিবি’র জেলা সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, খেলাঘর জেলা সভাপতি রথীন চক্রবর্তী, শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমির সভাপতি আবদুর রহমান, গণসংহতির জেলা সমন্বয়কারী তরিকুল সুজন, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি জাহিদুল হক দিপু, জিয়াউল ইসলাম কাজল, সহসভাপতি মনি সুপান্থ, সাধারণ সম্পাদক শাহীন মাহমুদ, যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল আলম নান্টু, উপ পরিচালক উজ্জ্বল উচ্ছ্বাস, নীতি নির্ধারণী সদস্য কবি কাজল কানন, নারীনেত্রী পপি রাণী সরকার, শ্রমিক নেতা অঞ্জন দাস প্রমুখ। 

মূল প্রবন্ধে অমল আকাশ রনজিত কুমারের জন্ম বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের মেডিকেলে পড়া, ব্রহ্মপুত্রের কাইশ্যার চরে ভূমিহীন কৃষকদের সংগঠিত করে আন্দেলন করা, আক্রমণের শিকার হয়ে লেদু মাদবরের অন্ধকার ঘরে আহত হয়ে রনজিত কুমারের পরে থাকা নিয়ে আলোচনা করেন। আন্দোলন সংগ্রামে তৎকালীন স্বৈরশাসকের রোষানলে পরে দুই বছর জেল খেটে মেডিকেলের পাঠ চুকিয়ে নব্বইয়ের দশকে নারায়ণগঞ্জে চলে এসে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার উপরও বিশদ আলোচনা করেন তিনি।

ব্রহ্মপুত্রের মাঝি এসে শীতলক্ষ্যায় নাও ভিড়ানোর পর ১৯৯২ সালে শুরু করেন শ্রুতি আবৃত্তি সংসদ নামে সাংস্কৃতিক সংগঠন। এর পর তার হাতে গড়ে তোলেন অসংখ্য কর্মী যারা আজ দেশের সংস্কৃতি ও মিডিয়া জগতের দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন অমল আকাশ। 

প্রাবন্ধিক উল্লেখ করেন, রনজিত কুমার সংগঠনের কর্মীদের নিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতির স্থান ও মানুষের কাছে ভ্রমণ করার কথা। রনজিত কুমার কর্মীদের সবসময় বোঝাতেন তিনটি ‘অ’-এর গুরুত্ব অধ্যায়ন, অভিজ্ঞতা ও অনুশীলন।

নারায়ণগঞ্জ তথা দেশের একজন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক হয়েও কেন নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের নেতৃত্ব গ্রহণ করেননি বা অর্জন করেননি। রনজিত কুমার স্বপ্ন দেখতেন শান্তি নিকেতনের মতো ‘শ্রুতি নিকেতন’ গড়ে তুলবেন। ‘আনন্দ আকাশ’ নামে শিশুদের মানবিক বিকাশে একটি মান সম্পন্ন স্কুল করার স্বপ্ন দেখতেন রনজিত কুমার। সর্বশেষ ‘শতফুল ফুটুক, শতফুল ফুটতে দাও’ রনজিত কুমারের এ শ্লোগান তুলে ধরেন তাঁর প্রবন্ধে।

প্রসঙ্গত, নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরের মাতুলালয়ে ১৯৬২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রনজিত কুমারের জন্ম। পিতা রামেন্দ্র দাস নারায়ণগঞ্জের কুমুদিনীতে কর্মরত ছিলেন, মা সবিতা রাণী দাস। নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমি থেকে এসএসসি, নটরডেম কলেজ ঢাকা থেকে এইচএসসি পাশ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। রাজনীতি ও সাহিত্যের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে পড়েন।   

তিনি ময়মনসিংহের সাহিত্য সংগঠন ‘বীক্ষণ’ এর আহ্বায়ক হন। পরে বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ময়মনসিংহের কাশিয়ার চরে ভূমিহীনদের খাসজমি উদ্ধারে আন্দোলনে যুক্ত হয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে আহত হয়ে দীর্ঘদিন হাসপালে থাকেন। সুস্থ হয়ে পুনরায় ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে ভূমিহীনদের খাস জমি উদ্ধারের আন্দোলন করে গ্রেফতার হন। আর এরই মধ্যে চুকে যায় তার চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাঠ। পরে মানবিক বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। দু’বছর কারাগারে থেকে ১৯৮৯ সালে মুক্তি পান। 

১৯৯০ সালে নারায়ণগঞ্জ ফিরে আসেন এবং শুরু করেন শিশুদের সংগঠিত করার কাজ। ১৯৯২ সালে গড়ে তোলেন শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমি এবং পরে ধাবমান সাহিত্য আন্দোলন। এসব সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিত সাহিত্য, আবৃত্তি, সংগীত এবং অভিনয়ে কর্মী গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত হন। 

কর্মজীবনে রনজিত কুমার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুগরের আউট রিচ প্রকল্পের সমন্বয়ক। তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে তুলে আনেন মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা ইতিহাস। সাহিত্যে তিনি কবিতা ও গদ্যে একাধারে বিচরণ করেছেন। লিখেছেন প্রবন্ধ, ছড়া ও শিশু নাটক। তাঁর প্রকাশিত কবতিা গ্রন্থ ‘এক সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে’ (২০১২), ‘প্রবন্ধ-নিবন্ধ নিয়ে চৌহদ্দির রিনিঝিনি’ (২০১৬), ‘মুক্তিযুদ্ধের কিশোর ইতিহাস : নারায়ণগঞ্জ জেলা ’ (২০১৭), সম্পাদনা গ্রন্থ’ ‘সমভূ মানব কথা ’। 

১৯৯৭ সালে রনজিত কুমার বিশিষ্ট প্রকৃতি বিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মার ভ্রাতুষ্পুত্রী সঞ্চিতা শর্মাকে বিয়ে করেন। সঞ্চিতা শর্মা বর্তমানে মৌলভীবাজারের জেলার বড়লেখার সুজানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। তাদের দুই সন্তান-প্রথম প্রান্ত (১৯) ও অনন্ত উৎসাহ (১৭)।

উল্লেখ্য, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ বছরের ২ জানুয়ারি সকালে তাঁর অস্ত্রোপচার হয়। সেদিনই সন্ধ্যায় রনজিত কুমারের কর্মময় জীবনের পরিসম্পাপ্তি ঘটে। ৩ জানুয়ারি সকালে তার মরদেহ রাখা হয় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে। সেখানে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠন ও নেতৃবৃন্দের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নগরের মাসদাইর শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।  

সব খবর
শিল্প ও সাহিত্য বিভাগের সর্বশেষ