বুধবার ২৭ জানুয়ারি, ২০২১

'মৃত স্কুলছাত্রী' জিসার বিচারবিভাগীয় তদন্তের শুনানি শুরু

বুধবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২১, ২০:১৮

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জে `মৃত স্কুলছাত্রী` জিসা মনির জীবিত ফিরে আসার ঘটনায় বিচারবিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে শুনানি শুরু হয়েছে। বুধবার (১৩ জানুয়ারি) হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে এই ঘটনাতে পুরো পুলিশ বাহিনীর গায়ে মাখানোর দরকার নেই বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেন, ‘বিছিন্ন ঘটনাকে বিছিন্নভাবেই দেখা উচিত। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে তাহলে সেটা থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়, সেটা পুলিশ বাহিনীর ভেবে দেখা উচিত।’

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন। তার সাথে ছিলেন ডেপুর্টি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারোয়ার হোসেন। অন্যদিকে, আবেদনকারী পাঁচ আইনজীবীর পক্ষে শুনানি করেন মোহাম্মদ শিশির মনির। এই মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আল-মামুনের পক্ষে ছিলেন মনসুরুল হক চৌধুরী।

আদালত সব পক্ষের কথা শুনে এই মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২০ জানুয়ারি ধার্য করেন। ওই দিন অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য শুনবেন আদালত।

এর আগে গত ৪ জানুয়ারি স্কুলছাত্রীকে অপহরণ মামলায় তিন আসামির ‘ধর্ষণের পর হত্যার’ জবানবন্দি ও দেড় মাস পর সেই স্কুলছাত্রী জিসা মনির ফিরে আসার ঘটনায় বিচারবিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দেন নারায়ণগঞ্জের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা ফেরদৌস। পরদিন ৫ জানুয়ারি মামলাটি ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করেছিলেন আদালত।

ফারহানা ফেরদৌস ওই প্রতিবেদনের মতামত অংশে হাইকোর্টকে জানান, ‘বিচারিক অনুসন্ধানে মামলার এজাহার, সাক্ষীদের প্রদত্ত জবানবন্দি, ভিকটিমের ২২ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দি, আসামিদের ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, জব্দকৃত আলামতসহ মামলাটির সার্বিক দিক পর্যালোচনা করা হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৭ ধারা অনুযায়ী আসামিদের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর, ১৬৪ ধারায় আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটদের কোনও অনিয়ম বিচারিক অনুসন্ধানকালে প্রতীয়মান হয়নি। তবে পুলিশ হেফাজতে (পুলিশ রিমান্ড) থাকাকালীন তদন্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আল-মামুনের বিরুদ্ধে আসামিদের মারধর, ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে স্বীকারোক্তি প্রদানে বাধ্য করার অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।’

উল্লেখ্য, গত বছরের ৪ জুলাই নিখোঁজ হয় দেওভোগের একটি সরকারি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী জিসা মনি। এই ঘটনার একমাস পর ৬ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অপহরণ মামলা করেন জিসার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন। গ্রেফতার করা হয় বন্দর উপজেলার বুরুন্ডি খলিলনগর এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আব্দুল্লাহ (২২), বুরুন্ডি পশ্চিমপাড়া এলাকার সামসুদ্দিনের ছেলে রকিব (১৯) ও নৌকার মাঝি খলিলকে (৩৬)। নির্যাতনের মুখে আসামিরা আদালতে জবানবন্দি দেয় যে, জিসা মনিকে অপহরণের পর গণধর্ষণ করে তারপর শীতলক্ষ্যায় তার লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর ২৩ আগস্ট সশরীরে ফিরে আসে জিসা মনি। সে জানায়, প্রেমিকের সাথে পালিয়ে গিয়ে স্বামীর সাথে আত্মগোপনে ছিল এতদিন।

এই ঘটনায় স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকগুলোতে সংবাদ প্রকাশিত হলে তোলপাড় শুরু হয় সারাদেশে। বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। এরপর আদালত আইনজীবীকে লিখিতভাবে হাইকোর্টে আবেদন করতে বলেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৫ আগস্ট ওই ঘটনায় রিভিশন আবেদন দাখিল করা হয়। রিভিশন আবেদনে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় করা মামলা এবং মামলা পরবর্তী প্রক্রিয়ার শুদ্ধতা, বৈধতা এবং যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এছাড়া ওই মামলার নথি তলবেরও আবেদন করা হয়। নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, মূল মামলার বাদী এবং আসামিদের বিবাদী করা হয়।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ জীবিত থাকার পরও নারায়ণগঞ্জের স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আসামিদের স্বীকারোক্তি আদায় সংক্রান্ত সদর থানার কার্যক্রমের বিষয়ে বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে নারায়ণগঞ্জের চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে এই প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সে নির্দেশের ধারাবাহিকতায় ৪ জানুয়ারি হাইকোর্টে সিলগালা করে প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়।

সব খবর
নগর বিভাগের সর্বশেষ