শুক্রবার ১৬ নভেম্বর, ২০১৮

সংগ্রামী এক বাসন্তীর গল্প

রবিবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৮, ২০:১২

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

সুস্মিতা পাল সেতু (প্রেস নারায়ণগঞ্জ): জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘খড়ের প্রতিমা পুজিস রে তোরা, মা কে তো তোরা পুজিস নে। প্রতি মার মাঝে প্রতিমা বিরাজী, হায়রে অন্ধ বুঝিস নে। দশভূজা দেবী দূর্গা পাঁচদিন মত্যলোকে থাকলেও আমাদের চারপাশে হাজারও দশভূজা ঘুরে বেড়ায় আমাদের দৃষ্টির আড়ালে’।

সকল দশভূজাদের জীবন সংগ্রাম তুলে ধরতে না পারলেও একজন দশভূজার জীবন চিত্র তুলে ধরছে প্রেস নারায়ণগঞ্জ ।

দৃষ্টির আড়ালের সেই জীবন্ত দূর্গার নাম বাসন্তী রানী দাস। ২৯ বছর ধরে ঘরের ভেতরে মূর্তি দিয়ে দূর্গা পূজা করে আসছেন তিনি। বর্তমানে শহরের আল্লামা ইকবাল রোডে (কলেজ রোড) ৩৮/১৪ ফজলুল হকের বাড়িতে ভাড়া থাকছেন তিনি। বাসন্তী রানীর জন্ম ৩০ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে ভারতের নবদ্বীপ ধামে মাতুলালয়ে। বাবা রাধা রমন কুন্ড পেশায় ছিলেন নারায়ণগঞ্জ অগ্রনী ব্যাংকের অফিসার। তার মা শুভদ্রা কুন্ড ছিলেন গৃহিনী। সাত ভাইবোনের মধ্যে বাসন্তী দ্বিতীয়। কলকাতাতে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য তার বাবা তার জন্মের আগেই স্ত্রীকে ভারতে পাঠিয়ে দেন। প্রতি মাসে টাকাও পাঠাতেন। কিন্তু তার দাদু সেই টাকা বাসন্তী রানীর পরিবারে খরচ না করে তার অন্য মেয়েদের বিয়ের জন্য জমা রাখতেন। এমন সময়ে তার বাবা তাদের দুরাবস্থার চিত্র দেখে ১৯৭২ সালে তাদের বাংলাদেশে নিয়ে আসেন।

বাংলাদেশে এসে তারা বসবাস শুরু করেন নারায়ণগঞ্জ মীরজুমলা রোডের সরকারী ব্যাংক কোয়াটারে। মর্গ্যান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন বাসন্তী রাণী। বাবার ইচ্ছে ছিল মেয়ে তারই মত ব্যাংকার হবে। তাই ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর বাবার পরামর্শে রপ্ত করে নেন টাইপিং শর্ট হ্যান্ড। শখ করে তিনি ২-৩টি টিউশনও করতেন। ম্যাট্রিক পাশ করার পর ভর্তি হন নারায়ণগঞ্জ সরকারী মহিলা কলেজে। এরই মধ্যে তার উচ্চমাধ্যমিক ফাইনাল পরীক্ষা শুরুর ঠিক আগে তার বড় ভাইয়ের হঠাৎ মৃত্যুতে তাদের পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। ভাইয়ের মৃত্যু শোক বুকে নিয়েই ১৯৭৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন তিনি। কিন্তু বড় ভাইয়ের শোক না কাটতেই এক বছরের মাথায় হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা যান তার বাবা।

বাবা মারা যাওয়ার কারণে ব্যাংক কোয়াটারে আর ঠাঁই হলো না তাদের। শহরের সনাতন পাল লেন রোডে একটি ছোট বাসা ভাড়া নেন তারা। ছোট ৫ জন ভাইবোন ও মায়ের পেটে ভাত যোগানোর জন্য নেমে পড়েন জীবন সংগ্রামে। অভাবের তাড়নায় বন্ধ হয়ে যায় তার পড়ালেখা।

দিনরাতের হিসাব না করে পড়ানো শুরু করেন টিউশন। এসময়ে তার সংগ্রামে তার সঙ্গী হন তার মেজ ভাই। বড় ভাইয়ের লাইসেন্স করা ব্যবসা নতুন করে শুরু করেন তার মেজ ভাই।

এদিকে রূপবতী হওয়ার কারণে বাসন্তী রানীকে বিয়ে দেবার জন্য প্রতিনিয়ত প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনরা তার পরিবারকে চাপ দিতে থাকেন। হিন্দুধর্মালম্বীরা বিয়ের ক্ষেত্রে সমজাতিতে বিয়ে করে থাকে। কিন্তু সমাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে ১৯৮২ সালে তার পরিবার তাকে বিয়ে দেন ভিন্ন কাস্টের ছেলে অশোক কুমার দাসের সঙ্গে। তিনি পেশায় ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক ও ব্যবসায়ী।

বাসন্তী রানী কুন্ড হয়ে যান বাসন্তী রানী দাস। নতুন পরিবার নতুন সংস্কৃতিতে প্রথমে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হলেও ধীরে ধীরে অভ্যস্থ যান তিনি। এরমধ্যে তার ঘর আলো করে আসে এক কন্যা সন্তান।

তিনবেলা প্রতিদিন শ্বশুরবাড়ির জন্য রান্না করাসহ দিনশেষে তার মনে হত, তিনি কি শুধু রান্না করার জন্যই উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে ।

একদিন তিনি তার ইচ্ছের কথা তার স্বামীকে বলেন। তার স্বামী তাকে বললেন, অসুস্থ মা (শাশুড়ি) ও বাচ্চাকে রেখে ৬-৮ ঘন্টা চাকরি করলে সংসার কে সামলাবে ? এমতবস্থায় বাসন্তী চিন্তা করতে থাকলেন কোথায় ২/৩ ঘন্টার চাকরি পাবেন যার মাধ্যমে তার পড়াশুনাকে কাজে লাগাতে পারেন ।

আশেপাশের কিছু বাচ্চাকে নিয়ে ঘরের ভেতরে দিলেন টিউশন। সংসারের সব কাজ সেরে বাচ্চাদের পড়াতে বসতেন। কিছু ছেলে-মেয়ে বিনা পয়সাতেই পড়ত তার কাছে। ভালোই চলছিল বাসন্তী রানীর দিনকাল।

কিন্তু ভাগ্যদেবীর সাথে তার বনিবনা না হওয়ায় আবার পড়তে হল তাকে দারিদ্রতার কবলে। ব্যবসায় ভালোভাবে মননিবেশ করার জন্য তার স্বামী চাকরি ছেড়ে দিলেও ব্যবসায় বিশাল পরিমাণ তার লস হয়। খুব কষ্ট করে সংসার চালাতে হত তাদের। এই দুঃসময়েই তার আবার সন্তান জন্ম হয়। খুব কষ্ট করে আড়াই বছর কাটানোর পর তিনি পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে বাহিরে টিউশন পড়ানো শুরু করেন। এসময় বাইরে কাজ করার ব্যাপারে তিনি পরিরারের সাপোর্ট পান। তিনবেলার রান্না, পূজা দেয়া, দুজন বাচ্চাকে সামলে তিনি তার কাজ করতেন। অনেক চেষ্টা করেও যখন সচ্ছলতা ফেরাতে পারছিলেন না, তখন মা দূর্গা তার সহায় হলেন।

১৯৮৮ সালে শরৎকালে একবার তার স্বামী অশোক কুমার তার মামার কর্মস্থল টাঙ্গাইল মির্জাপুরে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে একজন প্রতিমা কারিগর রাস্তায় তাকে দূর্গা মূর্তিটি সাধলে তিনি মূর্তিটি বাড়িতে নিয়ে আসেন। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে ব্যয়বহুল দূর্গা পূজা করা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তাই একবছর প্রাত্যাহিক ঘরের পূজার মতই দূর্গা মাকে পূজা করতেন তারা।

এরপর মা দূর্গার কৃপায় তাদের আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে পরিবারিক অর্থায়নে প্রথম ১৯৮৯ সালে এক ঘট দিয়ে ব্রাহ্মণের সাহায্যে প্রথম পূজা করেন। এরপর ৬-৭ বছর এক একঘট দিয়ে পূজা করেন তারা। ২০০৪ সালে বন্যার সময় পরিচিত কিছু মানুষের সহায়তায় শুরু হয় তার ১১টি ঘট দিয়ে পূজা। বর্তমানে তার ঘটের সংখ্যা ১৮টি। বেড়েছে পূজার উপাচারও। কিন্তু সেই নিয়ে শঙ্কিত নন বাসন্তী-অশোক দম্পতি। কারণ ২৯ বছরে ভক্তবৃন্দও বেড়েছে অনেক। বিভিন্ন গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ যেমন, বাদল সাহা, সরকারী তোলারাম কলেজের প্রফেসর নিরেন চন্দ্র সাহাসহ বিশিষ্ট লোকেরা তার পূজোতে বড় মাপের অনুদান দিয়ে যান। কেউ কেউ মানত করে ফল পেলে মাকে স্বর্ণ-শাড়ি ইত্যাদি উপাচার দিয়ে যায়।

বাসন্তী রানীর ২জন সন্তান। এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েকে চট্টগ্রামে বিয়ে দিয়েছেন, সেখানে মেয়ে একজন স্কুল শিক্ষক এবং ছেলে নারায়ণগঞ্জের একটি স্বনামধন্য একটি গার্মেন্টসে হিসাব শাখায় কর্মরত আছেন। ছেলে মেয়ে দুজনই উচ্চশিক্ষিত। তার স্বামী বর্তমানে শিশু-কিশোরদের ক্রিকেট কোচ হিসেবে কর্মরত।

হাস্যজ্বল বাসন্তী রানী বলেন, বর্তমানে আমি স্বামী-সন্তান নিয়ে ভালো আছি। তবে বয়স হবার কারণে স্বামী মাঝে মাঝে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যায়।

রাত পোহালেই পূজা! মায়ের কাছে এবারের চাওয়া কি জানতে চাইলে তিনি জানান , প্রতিবছরই ইচ্ছা করে ঢাকি দিয়ে মায়ের পূজা করব কিন্তু বাড়িওয়ালারা অন্য ধর্মালম্বী হওয়াতে বাড়িতে ঢাক আনার অনুমতি নেই । মায়ের কাছে তাই এটাই ইচ্ছা মরার আগে একবার ঢাক বাজিয়ে যেন মায়ের পূজা করতে পারি।

সব খবর