মঙ্গলবার ২১ জানুয়ারি, ২০২০

৯৫ ব্যাচের ক্রিকেট কার্নিভালের চ্যাম্পিয়ন জয়গোবিন্দ

শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:২৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: ফতুল্লার ইসদাইরস্থ একেএম সামশুজ্জোহা স্টেডিয়ামে ইউনাইটেড নাইন্টিফাইভ নারায়ণগঞ্জ এর আয়োজনে বিজয় দিবস ক্রিকেট কার্নিভাল ২০১৯ পরিণত হয়েছিল নারায়ণগঞ্জের ১৯৯৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী প্রাক্তন শিক্ষার্থী বন্ধুদের মিলনমেলায়। শুক্রবার ১৩ ডিসেম্বর দিনব্যাপী ক্রিকেট টুর্নামেন্টে ৬টি স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অংশ নিলেও সেটা যেন ছিল নির্মাণ স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্টের প্রতিচ্ছবি। অতিথিদের কন্ঠেও উচ্চারিত হয়েছে এমনই বক্তব্য। টুর্নামেন্টে আসরের ফেভারিট নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে জয়গোবিন্দ হাইস্কুল।

জানা গেছে, ইউনাইটে নাইন্টিফাইভ নারায়ণগঞ্জ এর আয়োজনে বিজয় দিবস ক্রিকেট কার্নিভাল ২০১৯ টুর্নামেন্টে নারায়ণগঞ্জের ৬টি স্কুলের ১৯৯৫ ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। টুর্নামেন্টে অংশ নেয়া দলগুলো হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল, নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমী, আদর্শ স্কুল, গণবিদ্যা নিকেতন, জয়গোবিন্দ হাইস্কুল ও সৈয়দপুর বঙ্গবন্ধু হাইস্কুল। তবে টুর্নামেন্টে ৬টি স্কুলের খেলোয়াররা অংশ নিলেও এতে হাজির হয়েছিল অপরাপর স্কুলের অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। যার মধ্যে আইইটি উচ্চ বিদ্যালয়, বিএম ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, নারায়ণগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মর্গ্যান গার্লস হাইস্কুল, বিবি মরিয়ম হাইস্কুল, আদর্শ বালিকা স্কুল এন্ড কলেজসহ বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরাও হাজির হয়েছিল টুর্নামেন্টটি উপভোগ করতে। প্রাণের এই মিলনেমলায় নব্বই থেকে পচানব্বই এই ৫ বছর ঘন্টার পর ঘন্টা সময় পার করা, দল বেধে স্কুল পালানো, খেলাধুলা, খুনসুটিতে অনেকেই হয়ে পড়েছিল আত্মার আত্মীয়। শুধু টুর্নামেন্ট উপভোগ করাই নয় দলবেধে আড্ডা প্রাণবন্ত করেছিল গোটা আয়োজনকে। কারো মধ্যেই ছিলনা বড় ছোট উচু নিচুর ভেদাভেদ। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ব্যবসায়ি, সরকারি বেসরকারী চাকুরীজীবীদের এক মিলনেমলা দেখতে হাজির হয়েছিলেন অনেকের পরিবার পরিজনও।

শীতের সকালে অনেকেই দেরীতে ঘুম ত্যাগের অভ্যাস থাকলেও সকাল ৭টা থেকেই মাঠে উপস্থিত হতে থাকেন বন্ধুরা। সকালের মাঠের চারিদিকে অবস্থান নিয়ে মিষ্টি রোদ উপভোগ করতে থাকে সকলে। সঙ্গে চলতে থাকে দল বেঁধে ফটোসেশন এর সেলফি তোলার প্রতিযোগিতা।

টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচ ছিল জয়গোবিন্দ হাইস্কুল ও গণবিদ্যা নিকেতনের। উদ্বোধনী ম্যাচে টস জিতে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক কামরুল। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে বাদলের অপরাজিত ৭৮ রান ও শাহাবুদ্দিনের ২৮ রানের উপর ভর করে ১৩৭ রানের পাহাড় গড়ে তোলে জয়গোবিন্দ হাইস্কুল। জবাবে ব্যাট করতে নেমে অধিনায়ক হাবিবের ৩৫ ও অনলের ২৭ রান সত্বেও ৪০ রানে হার মানতে হয় গণবিদ্যাকে। এতে ম্যান অব দি ম্যাচ হন জয়গোবিন্দের বাদল।

দ্বিতীয় ম্যাচটি ছিল টুর্নামেন্টের ফেভারিট টিম নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল ও নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমীর মধ্যে। যাতে টস জিতে ব্যাট করতে নেমে রুহুল আমিন শুভ’র ৩৩, হাসনাত রুবেলের ১৬ ও চঞ্চলের ১৩ রানের উপর ভর করে ৮২ রান সংগ্রহ করে নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমী। জবাবে ব্যাট করতে নেমে জাতীয় সাবেক খেলোয়ার নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের পাপ্পুর হার না মানা ৫৮ রানের উপর ভর করে ৯ বল বাকী থাকতেই লক্ষ্যে পৌছে যায় নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল। এতে ম্যান অব দি ম্যাচ হন হাইস্কুলের পাপ্পু।

তৃতীয় ম্যাচটি ছিল গণবিদ্যা নিকেতন ও সৈয়দপুর বঙ্গবন্ধু হাইস্কুলের মধ্যে। যাতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে বাহালুলের ৪৪ ও সেন্টুর ২৫ রানের উপর ভর করে ১০৪ রানের লড়াকু পুঁজি সংগ্রহ করে সৈয়দপুর বঙ্গবন্ধু হাইস্কুল। জবাবে ব্যাট করতে নেমে অধিনায়ক হাবিবের ৩৬ ও অনলের ৪৫ রানের উপর ভর করে ৮ বল বাকী থাকতেই লক্ষ্যে পৌছে যায় গণবিদ্যা। এতে সেমিফাইল নিশ্চিত হয় গণবিদ্যার। আর প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়ে সৈয়দপুর বঙ্গবন্ধু হাইস্কুল। এতে ম্যান অব দি ম্যাচ হন গণবিদ্যার অনল।

চতুর্থ ম্যাচটি ছিল নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল ও আদর্শ স্কুলের মধ্যে। যাতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে পাপ্পুর অপরাজিত ৬৭ ও রোমানের অপরাজিত ৩২ রানের উপর ভর করে ১৩৩ রানের পাহাড় গড়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল। ব্যাট করতে নেমে ইমনের উইকেট হারিয়ে ধাক্কা খেলেও অধিনায়ক নবির ৫২ ও ফয়সালের ৩৪ রানে লড়াকু পুঁজি পেলেও সেটা জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিলনা। তারা দু’জন আউট হয়ে গেলে পরে আর কেউই হাল ধরতে পারেনি। ২৬ রানে হার মানতে হয় আদর্শ স্কুলকে। এতে ম্যান অব দি ম্যাচ হন হাইস্কুলের পাপ্পু।

পঞ্চম ম্যাচটি ছিল জয়গোবিন্দ হাইস্কুল ও সৈয়দপুর বঙ্গবন্ধু হাইস্কুলের মধ্যে। যাতে টস হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে মিলনের ৪৭ ও বাদলের ২১ রানের উপর ভর করে ১১০ রান সংগ্রহ করে জয়গোবিন্দ। ব্যাট করতে নেমে সৈয়দপুর বঙ্গবন্ধু হাইস্কুলের কোন ব্যাটসম্যানই দলের হাল ধরতে পারেননি। শুধুমাত্র সৈয়দপুর বঙ্গবন্ধুর কমল দুই অংকের ঘরে পৌছিয়েছেন জয়গোবিন্দের মোয়াজ্জেম ৩ উইকেট নিয়ে ধসিয়ে দেন সৈয়দপুর বঙ্গবন্ধুর ব্যাটিং লাইনআপ। জয়গোবিন্দ জয় তুলে নেয় ৫৯ রানের। এতে ম্যান অব দি ম্যাচ হন জয়গোবিন্দের মিলন।

৬ষ্ঠ ম্যাচটি ছিল আদর্শ স্কুল ও নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমীর মধ্যে। যাতে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে অধিনায়ক মিনারের ১৬, চঞ্চলের অপরাজিত ৪৭ ও রুবেলের অপরাজিত ৩৬ রানের উপর ভর করে ১১৬ রানের লড়াকু পুঁজি সংগ্রহ পায় বার একাডেমী। জবাবে ব্যাট করতে নেমে নবী ১১ রানে ও সাজিদ ১৫ রানে আউট হয়ে গেলে এরপর আসিফ ৩২ রান করলেও সেটা জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিলনা। ৯৬ রানে থামতে হয় আদর্শ স্কুলকে। সেই সঙ্গে প্রথম রাউন্ডেই ছিটকে পড়ে আদর্শ। সেমিফাইনাল নিশ্চিত হয় বার একাডেমীর। এতে ম্যান অব দি ম্যাচ হন বার একাডেমীর চঞ্চল।

৭ম ম্যাচটি ছিল প্রথম সেমিফাইনাল যাতে মুখোমুখি হয় আসরের ফেভারিট নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল ও গণবিদ্যা নিকেতন। টস জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে পাপ্পুর অপরাজিত ৭১ রান ও রোমানের অপরাজিত ৪৩ রানের উপর ভর করে ১৩৭ রান সংগ্রহ করে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল। জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই অনলের উইকেট হারিয়ে ধাক্কা খায় গণবিদ্যা। অধিনায়ক হাবিবের অপরাজিত ৭৬ রান জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিলনা। ৩৫ রানে হার মানে গণবিদ্যা। ফাইনালে পদার্পন করে হাইস্কুল। এতে ম্যান অব দি ম্যাচ হন হাইস্কুলের পাপ্পু।

৮ম ম্যাচটি ছিল দ্বিতীয় সেমিফাইনাল যাতে মুখোমুখি হয় নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমী ও জয়গোবিন্দ হাইস্কুল। টস জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে চঞ্চল ২০ ও হাসনাত রুবেল ১৭ রানে আউট হয়ে গেলে বড় পুজি সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয় বার একাডেমী। জবাবে ব্যাট করতে নেমে বাদলের অপরাজিত ২৩ ও মিলনের অপরাজিত ৩৫ রানের উপর ভর করে ১০ উইকেটে সহজ জয় তুলে নেয় জয়গোবিন্দ হাইস্কুল। এতে ম্যান অব দি ম্যাচ হন জয়গোবিন্দের মিলন।

৯ম ম্যাচটি ছিল টুর্নামেন্টের মূল আকর্ষণ ফাইনাল যাতে মুখোমুখি হয় নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল ও জয়গোবিন্দ হাইস্কুল। যাতে টস জিতে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের অধিনায়ক মিজান প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাটিংয়ে নেমে পাপ্পু ৪৬ রান সংগ্রহ করে আউট হয়ে গেলে হাইস্কুলের হাল ধরতে পারেনি অন্যান্য ব্যাটসম্যানরা। মোয়াজ্জেম, শাহাবুদ্দিন ও বাদল ধসিয়ে দেন হাইস্কুলের ব্যাটিয় লাইনআপ। যে কারণে ৬৯ রানে থেমে যায় হাইস্কুলের রানের চাকা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে শাহাবুদ্দিনের ২৯ রান ও সোলেমানের ১১ রানের উপর ভর করে সহজেই জয়ের লক্ষ্যে পৌছে যায় জয়গোবিন্দ। ৮ উইকেটে ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন বনে যায় জয়গোবিন্দ হাই স্কুল।

টুর্নামেন্টে ধারাভাষ্যকারের দায়িত্ব পালন করেন বার একাডেমীর সবুজ রায়, হাইস্কুলের বাবু, বিপু, গণবিদ্যার বিধানসহ বন্ধুরা। চার ছক্কার সঙ্গে বাদ্য বাজানার তালে তালে বেজে উঠা উপভোগ করেন সকলেই।

পরে ইউনাইটেড নাইন্টিফাইভ নারায়ণগঞ্জের কো অর্ডিনেটর শরীফ সুমনের সঞ্চালনায় পুরস্কার বিতরণীতে প্রধান অতিথি ছিলেন নারায়ণগঞ্জের গর্ব সাবেক জাতীয় দলের ক্রিকেটার জাহাঙ্গীর আলম। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জয়গোবিন্দ হাইস্কুলের শিক্ষক গোলাম মোস্তফা।

পুরস্কার বিতরণীর পূর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি দীর্ঘক্ষণ ধরেই টুর্নামেন্টটি উপভোগ করেছেন। তার মনে হয়েছিল তিনি যেন নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটের যুগে ফিরে গিয়েছেন। এ ধরনের আয়োজন ভবিষ্যতেও থাকবে বলে তিনি মনে করেন।

পরে আমন্ত্রিত অতিথিরা চ্যাম্পিয়ন, রানার আপসহ বিভিন্ন পুরস্কার খেলোয়ারদের হাতে তুলে দেন। ম্যান অব দি টুর্নামেন্ট ও বেস্ট ব্যাটসম্যানের পুরস্কার গেছে পাপ্পুর ঝুলিতে। সেরা বোলার নির্বাচিত হন জয়গোবিন্দের মোয়াজ্জেম ও সেরা ফিল্ডার জয়গোবিন্দের মিলন। এছাড়াও প্রতিজন খেলোয়ারকে দেয়া হয়েছে মেডেল।

উপস্থিত সকলেই এমন একটি সুন্দর আয়োজনের জন্য ইউনাইটেড নাইন্টিফাইভ নারায়ণগঞ্জের কো অর্ডিনেটর সকল সদস্যকে সাধুবাদ জানান এবং ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সহযোগিতায় পাশে থাকার আশ্বাস দেন। অনুষ্ঠানটি সফল করতে নেপথ্যে ৯৫ ব্যাচের অনেক বন্ধুই নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। বিশেষ করে আদর্শ স্কুলের রিপন, ইমন, নবী, বার একাডেমীর মিনার, রাশেদ, কালিম, শোয়েব, ফারুক, হাইস্কুলের কামাল, পাপ্পু, সোহেল, ফেরদৌস, গণবিদ্যার টুকু, সোয়েব মনির, রনি, জয়গোবিন্দের কামরুল, সৈয়দপুর বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ, আইইটি স্কুলের হানিফ, বিএম ইউনিয়নের আকরাম, হানিফসহ যারা পুরো আয়োজনটি সম্পন্ন করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন তাদের নাম না বললেই নয়। এছাড়াও সোহানা, সূচী, মৌরি, ফারজানা, নদী, শাওনসহ ইউনাইটেড নাইন্টিফাইভ নারায়ণগঞ্জের কো অর্ডিনেটর সকল নারী সদস্যরা সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি মাঠে উপস্থিত থেকে সকলকে উৎসাহ দেয়ায় তাদেরকেও ধন্যবাদ জানিয়েছে আয়োজক কমিটি।

এরপর সন্ধ্যায় ইউনাইটেড নাইন্টিফাইভ নারায়ণগঞ্জের কো অর্ডিনেটর মিজানুর রহমান মিজানের সঞ্চালনায় এবং নবীর পরিচালনায় বর্ণিল আতশবাজি যা উপভোগ করে মোহিত হন উপস্থিত সকলে। আতশবাজি শেষ হতে না হতেই বেজে উঠে প্রাণের মিলনমেলার বিদায়ের সূর যখন সবার মুখে ছিল একই উচ্চারণ ‘বন্ধু ভালো থাকিস আবার দেখা হবে’।

সব খবর
খেলাধুলা বিভাগের সর্বশেষ