সোমবার ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

৫২’র ভাষা আন্দোলনে না.গঞ্জ ‘বিদ্রোহের শহর’

শনিবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২০:২৩

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

 

প্রেস নারায়ণগঞ্জ ডটকম: নারায়ণগঞ্জ জেলা বা মহকুমা ইতিহাস ঐতিহ্যের শহর। ব্রিটিশ শাসনামল এবং উপমহাদেশ ভাগ হয়ে যখন ভারত ও পাকিস্তান নামে দুইটি দেশের জন্ম হয় তখনও এই নারায়ণগঞ্জ মহকুমাই (১৮৮২-১৯৮৪) ছিল। মহকুমা-শহর হিসেবে এর যথেষ্ট খ্যাতিও ছিল। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ শিল্প-শহর হিসেবেও পরিচিত ছিল।

ব্যবসা-বাণিজ্য সমৃদ্ধ নারায়ণগঞ্জের আরেক বৈশিষ্ট্য বৃটিশ শাসনামলে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতার সঙ্গে পূর্ববঙ্গের একমাত্র সংযোগ সেতু ‘নারায়ণগঞ্জ-গোয়ালন্দ স্টিমার সার্ভিস’। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জ তৎকালীন মহকুমা শহরগুলোর মধ্যে নানামাত্রিক বৈশিষ্ট্য বিচারে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে।

ঢাকার কাছাকাছি হওয়ায় ঢাকার রাজনৈতিক উত্তাপ বরাবর নারায়ণগঞ্জকে স্পর্শ করেছে। সংগ্রামী চেতনা উদ্বুদ্ধ করেছে। ভাষা-আন্দোলন তেমন একটি উদাহরণ।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পূর্ববঙ্গে প্রধানত বাঙালি ছাত্র-সমাজের তৎপরতায় সূচিত ভাষা-আন্দোলন সংগঠিতভাবে শুরু ১৯৪৮ সালের মার্চ থেকে।

পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকা সফরে সুস্পষ্ট ভাষায় বলে গেলেন, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়। তার মৃত্যুর পর পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠি একই পথে চলেছে। তাদের মতে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার কথা যারা বলে তারা পাকিস্তানের দুশমন।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ব্যাপক, বিস্ফোরক আন্দোলন ঘটেছে সারাদেশ জুড়ে। এর ঐতিহাসিক প্রভাব সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন ঘটায়।

ভাষা আন্দোলন ও তার মূল ইতিহাস প্রধানত ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও জেলা-মহকুমা-থানা শহরগুলোও বাঙালীর স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান উদ্দীপক ভাষা আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।

ঢাকার নিকটবর্তী মহকুমা-শহর নারায়ণগঞ্জে ভাষা-আন্দোলন অসাধারণ তীব্রতা ও ব্যাপকতা নিয়ে সংঘটিত হয়েছিল। চরিত্র বিচারে এর গুরুত্ব ঢাকার চেয়ে কম নয়।

সংস্কৃতিমনস্ক এ শহরের সেই আন্দোলনের ইতিহাস লিখিত আকারে একটি বইয়ের মধ্যে লিপিবদ্ধ করেছেন নারায়ণগঞ্জের প্রগতিশীল আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি রফিউর রাব্বি।

রফিউর রাব্বির বই ‘নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলন’ ভাষা আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের যে অবদান ছিল তা সত্যানুসন্ধানি আগামী প্রজন্মের জন্য পথ দেখাবে নিশ্চয়। বইটিতে ভাষা-আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের ভূমিকা অনেকটাই উঠে এসেছে। সেই সাথে বইটিতে প্রকাশিত তথ্যের উৎস সূত্রও উল্লেখ করা হয়েছে। বইটিতে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জ পূর্ববঙ্গের ভাষা-আন্দোলনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভাষা-আন্দোলনের সার্বিক সার সংক্ষেপসহ ১৯৪৮ থেকে নারায়ণগঞ্জে ভাষা-আন্দোলনের বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে বইতে।

বইয়ের বিবরণ থেকে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে ভাষা-আন্দোলনের সূচনা ১৯৪৮ সালের মার্চ থেকে।

লেখক তার বইয়ে উল্লেখ করেন ‘১১ মার্চ নারায়ণগঞ্জে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। নারায়ণগঞ্জের পার্শ¦বর্তী শিল্পাঞ্চল গোদনাইলে অবস্থিত লক্ষ্মীনারায়ণ কটনমিল ও ঢাকেশ্বরী কটনমিলেও সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয়। এই সংবাদ ১৫ই মার্চ দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ‘বাংলা ভাষার দাবিতে নানা স্থানে হরতাল’ শিরোনামের সংবাদ প্রকাশ করে বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তান অবজারভারও এনিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে।

বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নেতৃস্থানীয় অনেকের নাম, সাথে উল্লেখ করা হয়েছে এদের সাহসী ভূমিকার কথা। যেমন শামসুজ্জোহা, মমতাজ বেগম, সফি হোসেন খান, বজলুর রহমান, বদরুজ্জামান, মফিজ উদ্দিন আহমদ, হাব্বির রশিদ, সুলতান মাহমুদ মল্লিক, কাজী মজিবর, শেখ মিজান প্রমুখ।

এছাড়াও উল্লেখ রয়েছে, শামসুল হুদা, মুস্তফা সারওয়ার এর নাম। উল্লেখ করা হয়েছে, পৌরসভার কর্মচারি বাদশা মিয়ার নাম। যে কিনা ভাষা আন্দোলনের পোষ্টার ঢাকা থেকে ছাঁপিয়ে এনেছিলেন। এই পোষ্টার নারায়ণগঞ্জের কোন প্রেস তখন ছাঁপাতে রাজি হয়নি।

এছাড়া আন্দোলন করার কারণে নারায়ণগঞ্জে গ্রেফতারের শিকার হয়েছিলেন, মমতাজ বেগম, খান সাহেব এম ওসমান আলী, তার বড় ভাই স্কুল শিক্ষক আজগর আলী, ভাতিজা জালাল উদ্দিন, তৃতীয় ছেলে মুস্তফা সারওয়ার, নূরুল ইসলাম মল্লিক, সফি হোসেন খান, লুৎফর রহমান, জানে আলম, এমএইচ জামিল, ৮ বছরের বালক মোসলেহ উদ্দিন, বাদশা মিঞা, নাজির হোসেন, সুলতান মোহাম্মদ, মুস্তফা মনোয়ার, মশিউর রহমান, লুৎফর রহমান, নিখিল সাহা, শামছুর রহমান, শাহজাহান মল্লিক, আবু বকর সিদ্দিক, কবির উদ্দিন, নাছির উল্লাহ, আব্দুল মোতালিব, রুহুল আমিন, জালাল আহমেদ, দুলু আফেন্দি, হাদিস মোল্লা, সুবিমল গুহ, আবু বকর, সফি হোসেন খান, ইলা বকশি (মর্গান স্কুলের ছাত্রী) বেলু বেগম, দবির উদ্দিন, নাসির উল্লাহ, কাজী হাবিবুল্লাহ, জালাল, আয়েশা আক্তার, ফিরোজা বেগম, খাজা জহিরুল হক প্রমুখ।

বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সে সময়ে দেয়ালে দেয়ালে মাসুদ নামের এক যুবক বিভিন্ন স্লোগান লিখতেন। এছাড়া বিলাস নামের এক যুবক তখন রাজপথে খড়িমাটি দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান লিখে রাখতেন। লোকে তাকে ‘বিলাইস্যা পাগল’ বলে ডাকতেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেন ‘নারায়ণগঞ্জের নেতাকর্মীদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার কথা কোন রাজনৈতিক কর্মী ভূলতে পারে না।’

বইটি থেকে জানা যায়, ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জ দেশের মহকুমা শহরগুলো থেকে অনেক এগিয়ে। ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের শুরু থেকেই ঢাকার কর্মসূচির সাথে তাল মিলিয়ে মহকুমা শহর নারায়ণগঞ্জ ভাষা-আন্দোলনের তৎপরতায় উত্তপ্ত হয়ে উঠতে শুরু করে। শুধু ধর্মঘট বা মিছিল করেই এখানকার আন্দোলনকারীরা ক্ষান্ত হননি, পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে দিয়েছিল শহরের দেয়ালগুলো।

বইটিতে প্রকাশ পায়, ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এ শহরের স্কুলছাত্রীরা। তাদের অসাধারণ ভূমিকার নেপথ্য নায়িকা ছিলেন তৎকালীন মর্গ্যান স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম। যার জন্য মহিয়সী এই নারীর ঠিকানা হয় ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে।

একুশের উত্তাপে নারায়ণগঞ্জে সেসময় শ্রমিকদের অনেকেই যোগ দেয় যা বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার নারায়ণগঞ্জ হয়ে উঠে মিছিলের নগরী। সকাল থেকেই মিছিল আর মিছিল। সকাল দশটার দিকে বাবুরাইল থেকে আফজল হোসেন, আব্বাস আলী ও আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে শহরে প্রতিবাদ মিছিল হয়। মিছিলটিতে আবুল কালাম আজাদ ও মহিউদ্দিনকে যথাক্রমে এমএইচ কোরেশী ও নূরুল আমিন সাজিয়ে মিছিলের অগ্রভাগে রেখে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড় করিয়ে জুতা পেটা করা হয়। বিকেলে বিভিন্ন এলাকায় মিছিল হয়। মহিলারাও সে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন।’

তৎকালীন মর্গ্যান স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম এর গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলন এবং চাষাড়ায় জনতা-পুলিশ সংঘর্ষ হয়।

এছাড়া বইটিতে উঠে এসেছে শহরের কালীরবাজার এলাকায় সরকারি ষড়যন্ত্রে সংঘটিত একজন পুলিশ কনষ্টেবল হত্যার ন্যক্কারজনক ঘটনা যা সরকারের, বিশেষ করে মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছিল। এমনকি উদ্ঘাটিত করেছিল নূরুল আমিন সরকারের অবিশ্বাস্য দমননীতি, নির্যাতন এবং চক্রান্তকারী ও নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদী চরিত্র। বইটিতে এই ঘটনার বিশদ বিবরন প্রকাশ করা হয়েছে। সাথে দেয়া হয়েছে তৎকালীন দৈনিক আজাদে ছাপা হওয়া সংবাদের বিবরন। যা পত্রিকাটি ২ মার্চ ১৯৫২ সালে প্রকাশ করেছিল।

নারায়ণগঞ্জের ভাষা আন্দোলনের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, ছাত্র-জনতার পাশাপাশি বহু সংখ্যক ছাত্রী, নারী ও শ্রমজীবি মানুষের অংশগ্রহণ। একুশের ভাষা-আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ওঠে ‘বিদ্রোহের শহর’।

তথ্য সূত্র: ‘নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলন’ বই থেকে নেয়া।

সব খবর
ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ বিভাগের সর্বশেষ