রবিবার ১৩ জুন, ২০২১

২৯ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য আর কত অপেক্ষা

মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর ২০১৭, ২০:৫৬

আব্দুল আজিজ

২৯ নভেম্বর বক্তাবলী পরগণার জন্য শোকাহত দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শস্য ভান্ডারখ্যাত বক্তাবলী পরগণায় মেতে উঠেছিল নির্মম হত্যাযজ্ঞে। সেদিন তাদের বর্বরতার শিকার হয় বক্তাবলী পরগণার নিরীহ মহিলা, শিশু, আবাল বৃদ্ধ-বণিতা। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় গ্রামের পর গ্রাম। ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় বক্তাবলীর জনপদ। বিভিন্ন গ্রাম থেকে নিরীহ লোকজনকে ধরে এনে ধলেশ্বরী নদীর পশ্চিম পাড়ে দাঁড় করিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় ১৩৯ জন। তাদের মধ্যে অনেককে লক্ষ্মীনগর গণকবরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অনেকের লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয় ধলেশ্বরী নদীতে। মানুষের লাশ সেদিন পরিণত হয় শেয়াল-কুকুরের আহারে। পুরো বক্তাবলী পরগণা পরিণত হয় মৃত্যু পুরীতে। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মানচিত্র, লাল-সবুজ পতাকা।

নতুন রাষ্ট্র, রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম, আন্দোলন, আত্মহুতির ঘটনা ইতিহাসে অজস্র। কিন্তু রক্তের মূল্যে কেনা স্বাধীনতায় জীবন উৎস্বর্গকারী শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য ৪৩ বছর অপেক্ষা, আন্দোলনের ঘটনা পৃথিবীতে বিরল। যেমনি বিরল মাত্র ২০ হাজার জন-অধ্যুষিত লোকের ১৫ বর্গমাইলের এলাকায় একদিনেই শহীদ হয়েছে ১৩৯ জন। আর এ বিরল ঘটনা শুধুমাত্র বক্তাবলীর জন্যই ঐতিহাসিক সত্য।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বরের গণহত্যার বিষয়টি অজানাই থেকে যায় ১৯৯১ সালের পূর্ব পর্যন্ত। তারপর গণতান্ত্রিক শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের তৎপরতায় জাতীয়, স্থানীয় ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার বদৌলতে দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

বাংলাদেশের মোটা দাগের মানুষ এখনও বিশ্বাস করে পাকিস্তানিরা আমাদের ধর্মীয় ভাই। তাই তারা আমাদেরকে অন্যায় কিছু করতে পারেনা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, মুসলমান এবং ইহুদী দুটি ধর্মেও মানুষই মনে করে জেরুজালেম তাদের পূর্ণভূমি সেই জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে যুগের পর যুগ যে যুদ্ধ চলছে তাতে প্রাণহানি ঘটেছে হাজার হাজার লোকের। কিন্তু মাত্র নয় মাস যুদ্ধে পাকিস্তানিরা হত্যা করেছে ৩০ লক্ষ লোক, ইজ্জত লুটেছে ২ লক্ষ মা-বোনের। আমরা কি এখনো ধর্মের দোহাই দিয়ে যুক্তি দাঁড় করাব পাকিস্তানিরা আমাদের ভাই ?

১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে বক্তাবলীর কানাইনগর ছোবহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শহীদদের স্মরণে শোকসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে জাতির জনকের কন্যা ঘোষণা দিয়েছেন তার দল ক্ষমতায় এলে শহীদদের যথাযথ মর্যাদা ও তাদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তারা ক্ষমতায় এলে একই মাঠে শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমানও শহীদদের স্মরণে শ্বেতপাথরে স্মৃতিস্তম্ভ করার ঘোষণা দেন। তারপর আওয়ামীলীগের প্রয়াত, জীবিত প্রথম সাঁরির এমন কোন নেতা নেই যারা বক্তাবলীতে আসেননি। তারপর বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকতে তিনবার বক্তাবলীতে এসেছেন কিন্তু তাদের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি। তবে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সাংসদ শামীম ওসমান লক্ষ্মীনগর স্কুল মাঠে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ২০০১ সালে নির্বাচনে মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মো গিয়াসউদ্দিন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কানাইনগরে স্থাপন করেন স্মৃতিস্তম্ভ।

২০০৮ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বেসরকারি চ্যানেলগুলো ফলাও করে ২৯ নভেম্বরের ঘটনা প্রচার করতে থাকলে সাংস্কৃতিক সংগঠন বধ্যভূমি ’৭১ সামাজিক সংগঠন ও বক্তাবলী ফাউন্ডেশন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের মাননীয় সাংসদ সারাহ্ বেগম কবরীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় যোগাযোগ করলে তারা গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে বলে। তারই ফলশ্রুতিতে ২০১২ সালের ২৯শে নভেম্বর গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী এবং সারাহ্ বেগম কবরীকে নিয়ে লক্ষ্মীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে লক্ষ্মীনগরে অবস্থিত ’৭১ বধ্যভূমি সরেজমিনে গিয়ে কবর জিয়ারত করে নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত অফিসের প্রধান প্রকৌশলীকে তাৎক্ষণিকভাবে একটি বাজেট তৈরি করে তার থেকে ৭৫ লক্ষ টাকায় বধ্যভূমিটি সংরক্ষণ-রক্ষণাবেক্ষনের ঘোষণা দেওয়া হয়। তারপর নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত অফিসে যোগাযোগ করলে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের ডি.ও. লেটার আসলেই কাজ শুরু হবে। তারপরে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। ঢাকা থেকে এখনও নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত অফিসে পৌঁছায়নি সেই কাঙ্ক্ষিত ডি.ও. লেটার। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা কত দূর? তাহলে আমাদের কি আবার ৪৬ বছর অপেক্ষার পালা। আর এ অপেক্ষার শেষই বা কোথায়? আমরা এ অপেক্ষার শেষ দেখতে চাই কথায়, কাজে, বাস্তবে, বাস্তবায়নে।

লেখক: সম্পাদক, বধ্যভূমি ’৭১।

সব খবর