শুক্রবার ২৩ আগস্ট, ২০১৯

২৭ মার্চ নারায়ণগঞ্জে প্রথম প্রতিরোধ

বুধবার, ২৭ মার্চ ২০১৯, ১৬:৫৭

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

রফিউর রাব্বি: ১৯৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের পরদিন লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাম পত্রিকায় `পুরাতন পাকিস্তানের ইতি` শিরোনামে সাংবাদিক ডেভিড লুসাক একটি প্রতিবেদনে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তখন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমই বিশ্ববাসীর কাছে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার সংবাদটি তুলে ধরছিল। এখানে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলি ভুট্টোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বৈঠক ব্যর্থ হলে এ দেশের মানুষ বুঝে নেয় যে, পশ্চিমাদের সঙ্গে অনিবার্য এক যুদ্ধের মুখোমুখি এসে তারা দাঁড়িয়েছে।

২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসকে সামনে রেখে দিনটি বিভিন্ন দল বিভিন্নভাবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ প্রতিরোধ দিবস, ভাসানী ন্যাপ স্বাধীন পূর্ব বাংলা দিবস, জাতীয় লীগ স্বাধীন বাংলাদেশ দিবস, কৃষক শ্রমিক পার্টি লাহোর প্রস্তাব দিবস ইত্যাদি। ওইদিন ভোর ৫টায় বঙ্গবন্ধু নিজে তার ধানমণ্ডির বাসভবনে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলন করেন। বিভিন্ন ভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। বিভিন্ন দূতাবাসও স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। টেলিভিশনে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শিত হয়নি। ওই দিনটি সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের জেনারেল রাও ফরমান আলি বলেছেন, "২৩ মার্চ ছিল শেখ মুজিবের আন্দোলনের সর্বোচ্চ পর্যায়। এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক দিন। পাকিস্তান দিবসটিকে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করত। অথচ শেখ মুজিব দিনটিকে `লাহোর প্রস্তাব দিবস` হিসেবে উদযাপন করেছিল।" সেদিন থেকেই মূলত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।

নারায়ণগঞ্জে ২৫ মার্চ সকালে তৎকালীন ঢাকা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের একটি দল নারায়ণগঞ্জ কোর্টে অবস্থিত মালখানা থেকে অস্ত্র সংগ্রহের জন্য যায়। মালখানার বাঙালি কর্মকর্তারাও সংগ্রামের পক্ষে ছিলেন। তারা ছাত্রদের বলেন, আমরা তোমাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে পারব না; তবে তোমরা লুট করে নিয়ে যাও, আমরা বাধা দেব না। ছাত্ররা মালখানা ভেঙে ১২১টি রাইফেল ও ছয় পেটি গুলি সংগ্রহ করেন। অস্ত্রগুলো দেওভোগ জনকল্যাণ সমিতিতে জমা রাখা হয়। ওইদিন বিকেল থেকেই তারা নাগবাড়ী মাঠে অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ শুরু করেন। ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দেন সাধারণ জনতা।
২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ হলে ২৬ মার্চ সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে_ যে কোনো সময় পাক হানাদার বাহিনী এখানে চলে আসবে এবং এখানেও হত্যাযজ্ঞ চালাবে। তখন প্রস্তুতি শুরু হয় ব্যারিকেড স্থাপনের। ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ আসার পথে আলীগঞ্জ, পাগলা, ফতুল্লা ও নারায়ণগঞ্জের সমস্ত রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। আলীগঞ্জ, পাগলা, ফতুল্লায় বড় বড় গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। রেলস্টেশন থেকে ওয়াগন এনে চাষাঢ়া ও ২নং রেললাইনের ওপরে রাখা হয়। তখন মণ্ডলপাড়া ও সলিমুল্লাহ রোডের দুটি কারখানায় একটি চিনিকলের জন্য ট্রলি তৈরি হচ্ছিল। ছাত্ররা সেই ট্রলিগুলো এনে রাস্তায় ফেলে ডায়মন্ড হল মোড় থেকে চাষাঢ়া রেললাইন পর্যন্ত ব্যারিকেড তৈরি করে। ছাত্র-জনতা ফতুল্লা থেকে চাষাঢ়া পর্যন্ত রেললাইনের স্লিপার তুলে ফেলে; যাতে রেলপথেও পাকবাহিনী নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ করতে না পারে। ওইদিন দুপুর থেকেই নারায়ণগঞ্জবাসী শহর ছাড়তে শুরু করে।

২৭ মার্চ ভোররাতে পাকবাহিনী ট্যাঙ্ক, কামান ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে ঢাকা থেকে রওনা হয়। ব্যারিকেড তুলে তুলে আস্তে আস্তে নারায়ণগঞ্জের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। রহমতউল্লা ক্লাব তখন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। সকাল ১০টার দিকে ক্যাম্পে খবর আসে, পাকসেনারা নারায়ণগঞ্জের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ঢাকার টিকাটুলি থেকেই গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। পাগলা অঞ্চলে প্রথমে তারা এক নাইটগার্ডকে হত্যা করে। বেলা ১১টার দিকে পাকবাহিনী পঞ্চবটীর কাছাকাছি চলে আসে। এদিকে সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে ছাত্র জনতা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে একটি গ্রুপ মাসদাইর কবরস্থানের কাছে অবস্থান নেয়, একটি গ্রুপ মাসদাইর খায়ের সাহেবের বাড়ির কাছে ও অপর গ্রুপটি চাঁদমারী টিলাতে অবস্থান গ্রহণ করে। অন্যদিকে ছাত্রদের একটি দল অস্ত্র সংগ্রহ করতে থাকে। বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের সংগ্রহে থাকা বন্দুক, পিস্তল রহমতউল্লা ক্লাব ক্যাম্পে এসে জমা দিতে থাকে। বহু পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্য তাদের অস্ত্র দেশের যুদ্ধের জন্য ক্যাম্পে এসে জমা দিয়ে যান।

একদিকে ট্যাঙ্ক, কামান ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাকবাহিনী; অপরদিকে শুধু রাইফেল আর দোনলা বন্দুক নিয়ে তাদের প্রতিরোধের জন্য ছাত্র-জনতা। পাকবাহিনী পঞ্চবটী থেকে শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকলে কবরস্থানের কাছে অবস্থান নেওয়া গ্রুপটি অতর্কিতে পাকবাহিনীর দিকে গুলি ছুড়তে থাকে। একজন পাকসেনা গুলিবিদ্ধ হলে পাকবাহিনীর একটি জিপ তাকে নিয়ে ঢাকা রওনা হয়। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে পাকসেনারা সেখানেই থমকে যায় এবং ট্যাঙ্ক সামনে রেখে জিপ থেকে নেমে হামাগুড়ি দিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। ছাত্রদের গ্রুপটি পেছনে হটতে থাকে এবং চাষাঢ়া এসে অবস্থান নেয়। পাকবাহিনী গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। বিকেল ৩টার দিকে তারা মাসদাইর এলাকায় পেঁৗছে গানপাউডার দিয়ে বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। বাড়িঘর থেকে ধরে এনে গুলি করে নির্বিচারে হত্যা করে নিরীহ সাধারণ মানুষকে। তারা এমএ ছাত্তারের (পরে এরশাদ সরকারের উপদেষ্টা) জ্যেষ্ঠ পুত্র তৌফিক সাত্তার ও তৌফিক সাত্তারের বন্ধু জালালকে হত্যা করে। মাসদাইরে জামিরুল হকের বাসায় ঢুকে তাকেসহ তার পুরো পরিবারকে হত্যা করে। হানাদার বাহিনী বাসায় ঢুকে হত্যা করে আবদুস সাত্তারকে ও তার বাড়ির দারোয়ানকে। মসজিদ পবিত্র স্থান, এখানে পাকসেনারা হামলা করবে না ভেবে ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে অনেকে মাসদাইরে `হানজত আলীর মসজিদ` নামে একটি মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নেন। হানাদার বাহিনী বুট জুতা পায়ে সে মসজিদে ঢুকে ভেতর থেকে ১৫-১৬ জনকে ধরে এনে বাইরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে তাদের হত্যা করে। এখানে শহীদ হন ব্যাংক কর্মকর্তা শরিয়তউল্লাহ (পিতা আশেক আলী মাতব্বর), জসিমউল হক ও তার স্ত্রী লায়লা হক, মো. জিন্নাহ (পিতা পাগলা বাদশা), ফটিক মিয়া (পিতা বেলায়েত আলী), ফকির চাঁন (পিতা শ্যামা মুন্সী), সাচ্চু মিয়া (পিতা সামসুল হুদা), ড্রাইভার নুরুল ইসলাম, বেলায়েত হোসেন, উত্তর মাসদাইরের ওমর আলী, আবদুস সাত্তার নামে আরও একজন। তারা অবাঙালি দুই সহোদর আলী আক্তার ও আলী আহাম্মদকে হত্যা করে। বাড়িঘরে দাউদাউ আগুন জ্বলতে থাকে। আগুনে পুড়ে শহীদ হন সমিরউদ্দিন সারেংয়ের স্ত্রী তাহেরুন্নেছা। ওইদিন পাকবাহিনী শহরে প্রবেশ না করে রাতে নারায়ণগঞ্জ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে অবস্থান নেয়। আর এ সময়ের মধ্যে শহরের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য শহর ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে চলে যায়।

২৮ মার্চ পাকবাহিনী পূনরায় আক্রমণ শুরু করে। সকাল প্রায় ১০টার দিকে তাদের একটি দল পশ্চিম দিক থেকে চাষাঢ়া ও অন্য একটি দল চাঁদমারী ঘুরে আক্রমণে এগিয়ে আসে। দু`দিকের আক্রমণে ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ দলটি পেছনে হটতে থাকে। পাকবাহিনী দুপুর ১২টার দিকে চাষাঢ়া অতিক্রম করে শহরে প্রবেশ করে। মূল সড়ক দিয়ে চলতে চলতে তারা নিতাইগঞ্জ পুলে এসে অবস্থান নেয়। পথে যেতে তারা দু`পাশের ভবন, বাড়িঘর মেশিনগান ও কামানের গোলায় ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। তারা প্রেসিডেন্ট রোডের মোড়ে পাকবে ভবন, হাজেরা কুটির, পৌরসভা অফিস কামানের গোলায় ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। ওই রাতেই তারা ছাত্রদের পরিচালিত ক্যাম্প রহমতউল্লা ক্লাব, দেওভোগের সমাজ উন্নয়ন ক্লাবসহ বহু বাড়িঘর গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। নারায়ণগঞ্জে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। নৃশংস সে হত্যাযজ্ঞ চলে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

সব খবর
ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ বিভাগের সর্বশেষ