শনিবার ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮

স্কুলে ভলিবল প্লেয়ার ছিলাম

রবিবার, ১৭ জুন ২০১৮, ১৫:৪২

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: কখনো ঘন্টার পর ঘন্টার ধরে মাটির খেলনা বানাচ্ছেন। আবার কখনো বোরকার কাপড়ে নিজেকে পরিবেষ্টিত করে পুকুরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন,নারীর চলার পথের প্রতিকূলতার প্রতীক হয়ে। আবার সুন্দরবন ধ্বংসের প্রতিবাদে মুখর হচ্ছেন। তিনি মানুষকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করেন, মানুষকে ভাবতে বাধ্য করেন তাঁর পারফর্মিং আর্ট এর মধ্য দিয়ে। তিনি শিক্ষকতা করেন, আবার অবসরে সাইকেলে চষে বেড়ান পুরো নারায়ণগঞ্জ। তাঁর কাজের ব্যাপ্তি শহর, দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আরো অনেক দুর। এত এত বৈচিত্রের অধিকারী যিনি তিনি সুমনা আক্তার। পারর্ফমার, নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক সুমনা আক্তার। এবারের ঈদ আড্ডায় আমরা কথা বলেছি এই গুণী শিল্পীর সাথে।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: কেমন আছেন?
সুমনা আক্তার: কাজ নিয়ে একটু ব্যস্ততার মধ্যে সময় কাটছে।
প্রেস নারায়ণগঞ্জ: বর্তমানে কি নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
সুমনা আক্তার: জুলাইতে শিল্পকলা একাডেমীতে একটা পারর্ফমেন্স করবো সেটা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে। আমি আগে একটা পারর্ফমেন্স করেছিলাম “ফিরে দেখা” যেখানে আমি মাটি দিয়ে নানান খেলনা বানাই। আমাদের ছেলে মেয়েরা এখন খুব বেশি প্রযুক্তি নির্ভর । মাটির সাথে কোন সংযোগ নেই বললেই চলে। ঐ ভাবনা থেকেই “ফিরে দেখা” কাজটি করা। জুলাইতে যেটা করবো সেটার নাম “খেলাঘর”। আমরা ছোটবেলায় যে খেলা খেলতাম হাডুডু, দারিয়া বান্ধা। এসব আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে। আমার পারর্ফমেন্স এর মাধ্যমে যা হারিয়ে যাচ্ছে সেগুলোকে রিপ্রেজেন্ট করার চেষ্টা করবো আরকি। এছাড়া, বাংলাদেশ শিল্প কলা একাডেমীতে আগস্টে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের অংশগ্রহনে দ্বিবাষির্ক এশিয়া চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজন আছে। সেখানে অংশগ্রহনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।


প্রেস নারায়ণগঞ্জ: এখন পর্যন্ত কতগুলো পারর্ফমেন্স করেছেন?
সুমনা আক্তার: সেটা তো আসলে সংখ্যায় হিসেব করা মুশকিল। ১০ বছর ধরে কাজ করছি।
প্রেস নারায়ণগঞ্জ: আপনার পড়াশোনা তো ছিল ড্রয়িং এন্ড পেইন্টি। কিন্তু পারর্ফমিং আর্টে আপনাকে খুজে পাওয়া যায় । সেটা কেন?
সুমনা আক্তার : আমি যে শুধু পারর্ফমিং আর্ট নিয়ে কাজ করি তা নয়। ভিডিও নিয়েও আমার অনেক কাজ আছে। পেইন্টিং ও করা হয়। পারর্ফর্মিং আর্ট বেশি করি, কারণ একটা ছবিতে আমি যতখানি দর্শকের সাথে কানেক্ট করতে পারবো,পারর্ফমেন্স করার সময় তার থেকে বেশি মানুষের সাথে সরাসরি ইন্টারেক্ট করা যায়। মানুষের অনুভুতিগুলো চোখের সামনে ধরা যায়। আমার কাছে মনে হয় পেইন্টিং এর চেয়ে পারর্ফমেন্সগুলো অনেক জীবন্ত। যেমন, “ফিরে দেখা” যে কাজটা করেছি সেখানে আমি প্রায় ৫ থেকে ৮ ঘন্টা মাটি দিয়ে অনেক খেলনা তৈরী করেছিলাম। তখন অনেক ছোট ছেলেমেয়ে এসে আমার সাথে মাটির দিয়ে খেলনা বানানো শুরু করে। বয়স্করা তাদের ছেলেবেলার স্মৃতি মনে করে নস্টালজিক হয়ে পরে। এই ব্যপারগুলো পেইন্টিং এ থাকে না।
প্রেস নারায়ণগঞ্জ: আপনার প্রিয় কাজ কোনটা?
সুমনা আক্তার: আসলে নানান বিষয় নিয়ে কাজ করা হয়েছে। তবে সুন্দরবন নিয়ে আমার সবচেয়ে বেশি কাজ করা হয়েছে। সুন্দরবন নিয়ে করা আমার কাজের নাম হচ্ছে, ফাইভ মিনিটস ফর সুন্দরবন অথ্যর্ৎ জীবন থেকে সুন্দরবনের জন্য পাঁচ মিনিট ব্যয় করুন। সর্বশেষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সুন্দরবন নিয়ে কাজ করেছি। একটা বড় গাছ ধরে আমি প্রায় ৪ ঘন্টা দাড়িয়ে ছিলাম। এই কাজটা করার পরে আমি জানতে পারি, অনেক বছর আগে কোন এক জাতিগোষ্ঠি তাদের বনায়ন রক্ষার জন্যে গাছকে ধরে এভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে ছিল। তো এত বৎসর পরে এসে আমার এই ভাবনার সাথে তাঁদের ভাবনার মিল পাওয়ার অভিজ্ঞতাটা আনন্দের।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: ৪ ঘন্টার পারর্ফমেন্স করাটা নিশ্চয় সহজ ছিল না....
সুমনা আক্তার: স্বাভাবিক অবস্থায় ৪ ঘন্টা গাছ ধরে গাছ ধরে দাঁড়িয়ে থাকার কথাতো ভাবতেই পারি না। তবে যখন পারর্ফমেন্স করি তখন ৪ ঘন্টা কিভাবে চলে যায় তা আসলে বুঝতে পারি না। পিপড়াঁ ছিল, মশা ছিল আরো নানান ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিল কিন্তু পারর্ফমেন্সের সময় তা আসলে অতটা প্রতিবন্ধক মনে হয়না।
প্রেস নারায়ণগঞ্জ: নারী ইস্যু নিয়ে করা কাজগুলোর সম্পর্কে কিছু বলুন...
সুমনা আক্তার: নারীদের নিয়ে সর্বশেষ আমি যে কাজটা করেছি সেটা হলো ‘আইডেনটিটি ক্রাইসিস’। এখানে আমি সমাজে নারীদের নিয়ে প্রচলিত যে সকল অশ্লীল অথ্যর্ৎ গালি প্রচলিত আছে তার সিলমোহর বানিয়েছি। নানান মানুষ তখন তাদের পছন্দ বা তাদের ভাবনায় উপযুক্ত স্ল্যঙ আমার গালে মুখে লাগিয়ে দেয়।
আমাদের সমাজে নারীদেরকে নানান ভাবে অবদমিত বা অপমানিত করার জন্যে ‘ডাইনী’, ‘কুলটা’ ‘অলক্ষী’ এসব ধরনের গালি বা স্ল্যাঙ ব্যবহার করা হয়। গালির আদলে নারীর যে পরিচয় সমাজে তৈরী হয় তা নির্দ্বিধায় বলা যায় একজন নারীর চলার পথকে বন্ধুর করে। এই ব্যপারটাকে আমি আমার আর্টের মধ্যে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
প্রেস নারায়ণগঞ্জ: এসব কাজের পরেও নারাযণগঞ্জ চারুকলা ইন্সটিটিউটে শিক্ষক হিসেবে আছেন। শিক্ষকতা করতে কেমন লাগে?
সুমনা আক্তার: ভাল লাগে। তবে নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইন্সটিটিউটের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। ফলে শিক্ষক হিসেবে অনেক কিছু দেয়ার থাকলেও হয়ত বাস্তবতার কারণে পারিনা। তবে চারুকলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নানান রকমের পরিবর্তন পরিবর্ধনের কাজ কর্তৃপক্ষ হাতে নিচ্ছে ফলে আশা করা যায় এ ভঙ্গুর অবস্থার পরিবর্তন হবে।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: অবসরে কি করেন?
সুমনা আক্তার: আবসরে সাইকেলিং করি। সাইকেলিং করতে ভাল লাগে। আর বিভিন্ন হাতের কাজ , সেলাই করতে ভাল লাগে।
প্রেস নারায়ণগঞ্জ: এবার একটু শৈশবের দিকে ফিরি। ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকির দিকে ঝোক ছিল?
সুমনা আক্তার: আমার পড়াশোনো নারায়ণগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। স্কুলে থাকতে আমি ভলিবল খেলতাম। ক্লাস নাইন পর্যন্ত স্কুল টিমে খেলেছি, বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত খেলার অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু আমার উচ্চতার সীমাবদ্ধতার কারণে সুযোগ হয়নি । সেটা হলে হয়ত একজন ভলিবল প্লেয়ার হতাম।
প্রেস নারায়ণগঞ্জ: শৈশবের ঈদের স্মৃতি সম্পর্কে জানতে চাই...


সুমনা আক্তার: শৈশবের ঈদ ছিল অনেক রঙিন। সালামি পাওয়ার একটা উত্তেজনা কাজ করতো। আমার বাবা ছিলেন বিআইডব্লিউটিএ এর সরকারি কর্মকর্তা। ঈদের বোনাসে আমারদের দুই বোনের জন্য একই রকম জামা কিনতেন। আমাদের সময়ে রাণী ফ্রকের ট্রেন্ড ছিল। ঐ রানী ফ্রক পরে ঈদ উদযাপনের আনন্দ আর এখনকার আনন্দের অনেক ফারাক।
প্রেস নারায়ণগঞ্জ: আপনাকে ঈদের অনেক শুভেচ্ছা।
সুমনা আক্তার: প্রেস নারায়ণগঞ্জকেও অভিনন্দন।

সব খবর
সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বশেষ