বৃহস্পতিবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৯

সিদ্ধিরগঞ্জে দুই স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

রবিবার, ৬ অক্টোবর ২০১৯, ১৩:১৫

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: সিদ্ধিরগঞ্জের সুমিলপাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের দুই কর্মচারির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত ওই দুজন হলেন, পরিবার কল্যান পরিদর্শক মো. রাকিব আব্দুল্লাহ এবং পরিবার কল্যাণ সহকারি জুলেখা আক্তার। তাদের একজনের বিরুদ্ধে নিয়মিত কর্মস্থলে না আসা এবং অন্যজনের বিরুদ্ধে রোগীদের বিভিন্ন রকম হয়রানির অভিযোগ পাওয়া যায়।

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার অধীনে যে কয়টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জের সুমিলপাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র হচ্ছে একটি। এখানে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এই কেন্দ্রে রয়েছে একজন উপ-সহকারি মেডিকেল অফিসার, একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক (নারী), একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক (পুরুষ), তিনজন পরিবার কল্যাণ সহকারি।

অভিযোগ রয়েছে এই কেন্দ্রের অন্য সবাই নিয়ম মেনে চললেও পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক রাকিব আব্দুল্লাহ ও পরিবার কল্যাণ সহকারি জুলেখা আক্তার এই দুজন কোন নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা করেন না। পরিদর্শক মো. রাকিব আব্দুল্লাহ যেই পদটিতে কর্মরত আছেন সেখানে কাজ করতে হলে নিয়ম অনুযায়ী তাকে ওই ইউনিয়নের বাসিন্দা হতে হবে অথবা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি সুমিলপাড়া এলাকার বাসিন্দা নন। এমনকি তিনি সেখানে থাকেনও না। তিনি বসবাস করেন নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকায়। এছাড়াও তিনি নিয়মিত কর্মস্থলেও আসেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। মাসে একদিন এই কেন্দ্রের অধীনে চর সুমিলপাড়া এলাকায় স্যাটেলাইট ক্লিনিক পরিচালিত হয়। পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক রাকিব আব্দুল্লাহ সেই স্যাটেলাইট ক্লিনিকটি পরিচালনা করবেন। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই তিনি তা করেন না। এদিকে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ হতে ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখ পর্যন্ত হাজিরা খাতায় কোন স্বাক্ষর নেই রাকিব আব্দুল্লাহর। জানা যায় তিনি ওই সময় পরিসংখ্যান বিভাগের হয়ে বাড়তি কাজ করেন। কিন্তু নিয়ম হচ্ছে প্রতিদিন কর্মস্থলে উপস্থিত হয়ে হাজিরা বহিতে স্বাক্ষর করে এবং নিজ কর্মস্থলের কাজ সম্পাদক করে সেই শুমারির কাজ করা। কিন্তু তিনি তা না করে একটানা ১মাস ৬দিন কর্মস্থলেই আসেননি। বিভিন্ন সময় কেন্দ্র পরিদর্শনে এসে রাকিব আব্দুল্লাহর এইসব অনিয়মের বিষয়গুলো সহকারি পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা সদানন্দ রায় এবং ওয়াহিদা খাতুন কেন্দ্র পরিদর্শন বইতে লিখে রেখে যান।

অপরদিকে সুমিলপাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিবার কল্যাণ সহকারি জুলেখা আক্তারের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। জুলেখা আক্তারের কাজ হলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করা এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিনামূল্যে বিতরণ করা। এছাড়াও গর্ভবতী নারীদের সন্তান প্রসবের জন্য প্রয়োজনে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে আসা। কিন্তু তিনি তা না করে অনেক সময় গর্ভবতী নারীদের ফুসলিয়ে সকলের অগোচরে বিভিন্ন ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে সিজারের মাধ্যমে ডেলিভারি করিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এছাড়াও সরকার কর্তৃক প্রদত্ত জন্ম নিয়ন্ত্রন সামগ্রী ও ঔষধ বিনামূল্যে প্রদানের কথা থাকলেও তিনি তার বিনিময়ে টাকা নিয়ে থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। জুলেখার প্ররোচনায় পড়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সেবা নিতে আসা নূপুর নামে এক গৃহবধূ স্থানীয় এক ক্লিনিকে গিয়ে সিজার করিয়েছেন।

এ বিষয়ে নূপুরের স্বামী আমানুল্লাহর সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ তার গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে আসেন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। ওই সময় স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডাক্তার বাহিরে থাকায় পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা খালেদা বেগমের কাছে যান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জুলেখা। জুলেখা আমানুল্লার স্ত্রীকে দেখেই বলেন তোমার আজকের মধ্যেই বাচ্চা হবে এবং তার বাসার ঠিকানা রেখে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। পরে ওই দিন বিকেলেই স্বইচ্ছায় আমানুল্লাহর বাড়িতে গিয়ে হাজির হয় জুলেখা। গিয়ে প্রথমে আমানুল্লাহর স্ত্রী নূপুরকে একটি ইনজেকশন পুষ করে। এর পরে নূপুরের প্রসব ব্যাথা ওঠে। কিছুক্ষণ পরে এমনিতেই ব্যাথা কমে যায়। এরই মধ্যে রাতে আমানুল্লাহ তার বাড়িতে যায়। তখন জুলেখা তাকে বলে আপনার স্ত্রীকে সিজার করতে হবে। তখন আমানুল্লাহ সিজারের কারণ জানতে চাইলে জুলেখা বলেন বাচ্চার গলায় নারি পেচিয়ে গেছে এবং পানি শুকিয়ে গেছে। তখন আমানুল্লাহ বলেন আপনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন। এসময় আমানুল্লাহ তার স্ত্রীকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে তারা স্বামী স্ত্রী দুজনেই ডাক্তারকে আল্টাসোনোগ্রাফ করিয়ে পরীক্ষা করার কথা বলেন। কিন্তু সেদিকে জুলেখা কর্ণপাত না করে কৌশলে আমানুল্লাহকে রক্ত জোগার করার কথা বলে বাইরে পাঠিয়ে দেয়। এবং এরই মধ্যে নুপুরের সিজার করে ফেলেন। পরে এবিষয় নিয়ে জুলেখার সাথে অনেক বাদুনুবাদ হয় আমানুল্লাহর।

অপরদিকে সুমিলপাড়া এলাকার বাসিন্দা ইতির সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৭ আগষ্টে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এসে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন। সন্তান প্রসবের পর মা ও সন্তান দুজনেই সুস্থ ছিলেন। কিন্তু সপ্তাহখানেক পর জুলেখা ইতির বাড়িতে গিয়ে তাকে ভূল বুঝিয়ে টি আর সেলাইয়ের কথা বলে। অন্যথায় তার সমস্যা হবে বলে জানায় জুলেখা। ইতি ওই সময় ভয় পেয়ে তার কথায় রাজি হয়ে টি আর সেলাই করেন। এর বিনিময়ে জুলেখা ইতির কাছ থেকে সাত হাজার টাকা নেয়। কিন্তু কিছুদিন পরে ইতির সেলাই করা স্থানে ইনফেকশন হয়ে যায়। পরে বেশ কিছুদিন ভোগার পর অন্যত্র চিকিৎসা নিয়ে সে সুস্থ হয়।

এদিকে এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে কথা বলতে সুমিলপাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে পাওয়া যায়নি পরিদর্শক রাকিব আব্দুল্লাহকে। কেন্দ্রর অন্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি অসুস্থতাজনিত কারণে ছুটিতে রয়েছেন। তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

অপরদিকে পরিবার কল্যাণ সহকারি জুলেখা আক্তাররের সাথে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাকেও পাওয়া যায়নি।

এদিকে রাকিব আব্দুল্লাহ ও জুলেখার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে নারায়ণগঞ্জ পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক বশির উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কর্মস্থলে নিয়মিত না আসার কোন সুযোগ নাই। রাকিব বর্তমানে অসুস্থতা জনিত কারণে ছুটিতে আছে জানি। তবে এর আগে তার এধরনের কিছু সমস্যা ছিলো। আমি নিজেও তাকে কয়েকবার সতর্ক করেছি। আর জুলেখার বিষয়ে যে অভিযোগ তার বিষয়ে আমি অবগত নই। কেননা সে একজন মাঠ কর্মী। তার মাঠে কাজ করার কথা। জুলেখা মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়েই অনেককে হয়রানি করেছে বিষয়টি জানেন কিনা জিজ্ঞাসা করলে এই কর্মকর্তা বলেন বিষয়টি আমি অবগত নই। তবে কেউ যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেয় তাহলে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

সব খবর
নগরের বাইরে বিভাগের সর্বশেষ