সোমবার ২৭ মে, ২০১৯

‘গরিবের গোশত সমিতি’

শুক্রবার, ১০ মে ২০১৯, ২১:৪০

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: সারাদিন ভ্যান চালিয়ে সংসারের ঘানি টানেন। তার উপর দু সন্তানের লেখাপড়ার খরচা। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। ঈদ আসলে সকলের কাপড়-চোপড় কেনা আর তেল-সেমাই-চিনি কিনতে গিয়ে হিমশিম খান তিনি। আদরের সন্তানদের বায়না থাকে ঈদের দিনে গোশত খাওয়ার জন্য। কিন্তু দিনমজুর বাবার সাধ থাকলেও সাধ্যে নেই। গত ঈদুল ফিতরে সন্তানের বায়না পূরণ করতে না পেরে এবার নগর পাড়া এলাকার দিনমজুর বাবু গোশত সমিতির সদস্য হয়েছেন। শুধু দিনমজুর বাবু নন, রূপগঞ্জের শত শত পরিবার এখন গোশত সমিতির সদস্য। ঈদুল ফিতরের ঈদকে ঘিরে রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ৭০ টি সমিতি গড়ে উঠেছে। ‘গরীবের গোশত সমিতি’ এখন ব্যাপক সাড়া পেয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খামার পাড়া এলাকার তরুণ ফয়সাল মিয়া ২০১৭ সালে প্রথমে এ উদ্যোগ নেন। মোট ২৫ জন সদস্য নিয়ে তাদের গোশত সমিতির যাত্রা শুরু হয়। চাঁদা গুণতে হয় সপ্তাহে একশ টাকা। বছরে জমা হয় ৫২০০ টাকা। বিনিময়ে ঈদুল ফিতরের আগের দিন গোশত মেলে ১২ কেজি। এরপর থেকে এলাকায় একে একে গড়ে উঠতে থাকে গরিবের গোশত সমিতি। খোদ খামার পাড়া এলাকায় বর্তমানে ৬টি সমিতি রয়েছে। এছাড়া নগরপাড়া, দেইলপাড়া, কামশাইর, বরুণা, বরালুসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এ সমিতি গড়ে উঠেছে।

জানা গেছে, উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ২ টি পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ২০০’র বেশি সমিতি ঈদের সময় গরীব, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের গোশতের চাহিদা পূরণ করছে। সারাবছর একটু একটু করে সঞ্চয় করে ঈদের আগে পশু কিনে জবাই করে মাংস ভাগ করে নেন মাংস সমিতির সদস্যরা। এতে করে ঈদে গরিব পরিবারগুলো বাড়তি আনন্দ পান এবং তাদের আর্থিক চাপও কমে যায়। রূপগঞ্জ উপজেলার গ্রাম, পাড়া বা মহল্লায় ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে এ ধরনের মাংস বা গরু সমিতি গঠন করা হয়। মাংস সমিতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গ্রামের লোকজনের সাথে আলাপ করে জানা যায়, প্রতিবছর বাড়ছে মাংস সমিতির সংখ্যা। প্রতিটি মাংস সমিতির সদস্য সংখ্যা ৪০ থেকে ৬০ জন। প্রত্যেক সদস্য সপ্তাহে ১০০ টাকা চাঁদা জমা দেন। ঈদুল ফিতরের দুই একদিন আগে জমা করা টাকায় গরু কিনে এনে জবাই করে সদস্যরা মাংস ভাগ করে নেন। তবে চামড়া বিক্রির টাকায় পরের বছরের জন্য তহবিল গঠন করে সমিতির কার্যক্রম চলে।

সরজমিনে ঘুরে জানা গেছে, খামার পাড়া এলাকার সমিতির খবর ছড়িয়ে পড়লে গত দুই বছরে রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে গোশত সমিতি। এ সমিতি এখন গরিবের জন্য আর্শীবাদ বয়ে এনেছে। সপ্তাহে একশ টাকা সঞ্চয় হওয়ায় কারো তেমন সমস্যা হয় না। কথা হয় সমিতির সদস্য খামার পাড়া গ্রামের সফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা গরীব মানুষ। ঈদে পোলাপানগো কাপড়-চোপড় কিনা টেকা শেষ অইয়া যায়। কোনমতে তেল-সেমাই কিনি। আবার গোশত কিনুম কেমনে? যহন জানলাম সমিতি অইছে। তহন থেইক্যা সমিতিতে নাম লেহাই। অহন ঈদের আগে ১২ কেজি গোশত পামু। একই গ্রামের ফজলু হোসেন, মারতুজা ও আমির হোসেন বলেন, এ সমিতি হওয়ায় গরিব মাইনসের (মানুষ) জন্য ভালা অইছে। সপ্তাহে ১০০ টাকা দিতে কষ্ট অয়না। ঈদ আইলে বাড়তি চিন্তা থাহেনা। বাগবাড়ী এলাকার সুজন আহম্মেদ বলেন, এ সমিতির কারণে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। নগড় পাড়া এলাকার জাকির হোসেন বলেন, আমরা দিন আনি দিন খাই। ঈদ আইলে মাংস কিনবার টেকা থাহে না। তাই সমিতিতে নাম দিছি। ঈদের আগে মাংস পাই ১০ থেকে ১২ কেজি।

মুল উদ্যোক্তা ফয়সাল আহমেদ জানান, প্রথমে তাদের সমিতিতে সদস্য সংখ্যা ছিল ২৫ জন। প্রত্যেকে সপ্তাহে টাকা জমা দিতেন। বছর ঘুরে সমিতিতে জমা হয় ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে গরু কিনে এনে সমিতির সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকের ভাগে পাঁচ কেজি করে মাংস পড়েছে। তাদের এলাকাতেই এ ধরনের অন্তত ছয়টি সমিতি রয়েছে। উপজেলার প্রতিটি গ্রামেই রয়েছে এই গোশত সমিতি। শবে কদরের দিন থেকে শুরু হয় সমিতির গরু জবাইয়ের কাজ। চলে ঈদের দিন পর্যন্ত। কায়েতপাড়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মাসুম আহম্মেদ বলেন, গরীবের গোশত সমিতি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দিন দিন এ সমিতির সংখ্যা বাড়ছে। সমিতির কারণে ঈদুল ফিতরে এখন ঘরে ঘরে গরুর গোশত থাকে।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মমতাজ বেগম বেগম বলেন, আমার জানা নেই। তবে নিঃসন্দেহে ভাল উদ্যোগ।

সূত্র: পূর্বপশ্চিম

সব খবর
নগরের বাইরে বিভাগের সর্বশেষ