মঙ্গলবার ১৮ জুন, ২০১৯

শ্রমিকরা আমার ভবিষ্যৎ: মনসুর আহমেদ

মঙ্গলবার, ১ মে ২০১৮, ১৭:৩৭

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ(সৌরভ হোসাইন সিয়াম): আজ (মঙ্গলবার)পহেলা মে। বিশ্বের কোটি কোটি শ্রমজীবি মানুষের অধিকার ও দাবি আদায়ের মহান ‘মে দিবস’। ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা উপযুক্ত মজুরি আর দৈনিক আট ঘন্টা কাজের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।

কল-কারখানা তখন গিলে খাচ্ছিল শ্রমিকের গোটা জীবন। অসহনীয় পরিবেশে প্রতিদিন ১৬ ঘন্টা কাজ করতে হতো। সপ্তাহজুড়ে কাজ করে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে যাচ্ছিল। শ্রমজীবি শিশুরা হয়ে পড়েছিল কঙ্কালসার। তখন দাবি উঠেছিল, কল-কারখানায় শ্রমিকের গোটা জীবন কিনে নেয়া যাবে না। ৮ ঘন্টা শ্রম দিনের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের সময় ওই বছরের ১লা মে শ্রমিকরা ধর্মঘট আহবান করে। প্রায় তিন লাখ মেহনতি মানুষ ওই সমাবেশে অংশ নেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে এখন ৮ ঘন্টা কর্মদিবস।

মে দিবসে শুধু শ্রমিকদের নয়, ভুমিকা ছিল মালিক শ্রেণিরও। মহান মে দিবস উপলক্ষে কথা হয় নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমই এর সহ-সভাপতি ও মাদার কালার লিমিটেড এর মালিক মনসুর আহমেদের সঙ্গে। খোলামেলা এ আলোচনায় উঠে আসে মালিক ও শ্রমিক বিষয়ে অনেক কথা। প্রেস নারায়ণগঞ্জের পাঠকদের জন্য সম্পূর্ন সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: কেমন আছেন?

মনসুর আহমেদ: জ্বি, ভালো আছি।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: প্রথমেই আপনার কাছে জানতে চাই, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় গার্মেন্টের ভুমিকা সম্পর্কে।

মনসুর আহমেদ: বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় গার্মেন্টের ভুমিকা অন্যতম। গার্মেন্ট শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অন্যতম ভুমিকা পালন করে। বৈদেশিক আয়ের ৮০.৯৬ ভাগ গার্মেন্ট শিল্প থেকে আসে। বাংলাদেশের উন্নয়নে যা অন্যতম ভুমিকা পালন করে।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: গার্মেন্ট শিল্প একটি লাভজনক পোশাক খাত। যার ফলে উদ্যোক্তারা গার্মেন্ট শিল্পে বেশি বিনিয়োগ করছে। প্রচুর সম্ভবনাময় ও লাভজনক এই পোশাক খাতে আপনাদের কি কি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়?

মনসুর আহমেদ: এ খাতে আমাদের মূল সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে রানা প্লাজা ধ্বসের পর। রানা প্লাজার দূর্ঘটনার পর আমাদের তৈরি পোশাকের দাম কমে গিয়েছিল আন্তর্জাতিক বাজারে। যেহেতু প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করতে হচ্ছে, সেই অনুযায়ি বাইরের বিশ্বে আমরা তেমন দাম পাচ্ছিলাম না। একটা ভালো দামের জন্য আমরা বিভিন্ন আবেদন জানাই। আমরা বিভিন্ন ভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এছাড়া আমাদের শ্রমিকদের অনুন্নত মান ছিল। যেসব শ্রমিদের মান ভালো ছিল না, আমরা তাদের মান উন্নয়ন করেছি। এসব করেছি যাতে আমাদের তৈরি পোশাকের দামটা অন্তত ফেয়ার থাকে। তারা কিছুটা দাম বাড়িয়েছে তবে আরো বাড়ানো দরকার।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: বিগত সময়ের রানা প্লাজা ও তাজরিন গার্মেন্টস দূর্ঘটনায় বিদেশী বিনিয়োগে এক প্রকার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। ঠিক এখন আপনারা সেই দিক থেকে কতোটা কাটিয়ে উঠেছেন এবং এখন কোন অবস্থানে আছেন?

মনসুর আহমেদ: রানা প্লাজা ধ্বসের পর মানসিক দিক থেকেই একটা ধ্বস আমাদেরও নেমেছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন সকলে একত্র হয়ে বাংলার মুক্তির জন্য ঝাপিয়ে পড়েছিল। যদিও ভারত আমাদের সাহায্য করেছিল কিন্তু আমাদের দৃঢ় মনোবল ছিল আমরা পারবো। ঠিক তদ্রুপ রানা প্লাজা দূর্ঘটনার পরে আমরা মালিক শ্রেণি ও শ্রমিকরা সকলে মিলে এ লোকসান পূরণ করার জন্য একত্রে কাজ করেছি। আমাদের বায়ারদের মানসম্পন্ন মাল সাপ্লাই দিতে পারবো, আমরা এমনটা তাদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছি। এবং শুধু কথাই নয় আমরা এটা করে দেখিয়েছি। যার ফলে রানা প্লাজা দূর্ঘটনার পর যে ঝামেলাটা তৈরি হয়েছিল সেটা কিন্তু এখন আর নাই। আপনারা জেনে খুশি হবেন যে, বিশ্বের মধ্যে ১৫টি গ্রীন ফ্যাক্টরি রয়েছে যাদের প্লাটিনাম খেতাব দেয়া হয়। আর তার মধ্যে ৭টি ফ্যাক্টরিই বাংলাদেশে।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী শ্রমিকের বেতন ৫৩০০ টাকা কতোটা সঙ্গতিপূর্ণ?

মনসুর আহমেদ: বলা হয়, একজন শ্রমিকের বেতন ৫৩০০ টাকা। আসলে এভাবে ৫৩০০ টাকা বেতন কথাটা ঠিক না। একজন শ্রমিক যখন কোন কাজ জানে না, তার কোন যোগ্যতা নাই তখন শুরুতে তার বেতন হয় ৫৩০০ টাকা কিন্তু ওভারটাইম মিলিয়ে সে ৭০০০ এর মতো পায়। এখন কথা হচ্ছে এই টাকায় বাড়িভাড়া ও অন্যান্য সব দিয়ে কেবল একজন মানুষ চলতে পারে। এই টাকায় তো আর পুরো ফ্যামিলি নির্ভর করে থাকলে চলবে না। যেহেতু ৫০০০ কিংবা ৭০০০ টাকায় একটি পুরো সংসার চলবে না। তাই স্বামীর পাশাপাশি স্ত্রীকেও কাজ করতে হবে। স্ত্রী কাজ করবে আর স্বামী বসে বসে খাবে তাহলে তো চলবে না। স্বামী-স্ত্রী একত্রে কাজ করলে সংসার টিকমতো চলবে।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: গার্মেন্টে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকরা বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা বিভিন্ন সময় সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। শ্রমিকের নিরাপদ কর্ম পরিবেশের বিষয়ে আপনারা কি ভাবছেন?

মনসুর আহমেদ: মাঝে মাঝে গাড়িতে, ট্রেনে, প্লেনে চলতে চলতেও তো এক্সিডেন্ট হচ্ছে। মানুষকে বুঝানো যায় না, দূর্ঘটনা নিছক দূর্ঘটনা। এতে কারো কোন হাত নেই। তবে পেশাগত স্বাস্থ্যের দিকে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি সবসময় সোচ্চার। শ্রমিকদের নিরাপদ কর্ম পরিবেশের দিকে খেয়াল করে স্বাস্থ্যঝুকির দিকে খেয়াল রেখে ডাক্তার ও নার্স রয়েছে। অন্যদিকে যারা নিরক্ষর তাদের বেতন তোলার সময় যেন কোন ঝামেলা না হয় সেই দিকেও খেয়াল রাখা হয়। কোন রকম কারচুপির সুযোগ নেই। তারপর কোন কারণে যদি ফ্যাক্টরিতে কেউ মারা যায় তার জন্য ৫ লক্ষ টাকা ও ফ্যাক্টরির বাইরে মারা গেলে তার জন্য ২ লক্ষ টাকা দেয়া হয়।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: তারপরও কিন্তু শ্রমিকরা প্রায় সময়ই কিছু অভিযোগ করে থাকেন। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কি?

মনসুর আহমেদ: শ্রমিকরা আসলে খুবই ভালো। আমার যে ফ্যাক্টরি রয়েছে পঞ্চবটির দিকে সেখানে এ পর্যন্ত শ্রমিকদের সঙ্গে কোন প্রকার গন্ডগোল হয় নি, কোন রকম ঝামেলা হয় নি। কারণ আমার ওখানে শ্রমিকরা অলওয়েজ একটি কেয়ারের মধ্যে থাকে। কিছু কিছু শ্রমিক আছে যারা আবার উস্কানি দিয়ে শ্রমিকদের বিপথে নিয়ে যায়। যারা উস্কানি দিচ্ছে তারা দেখা যায় শিক্ষিত কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী চাকরি পায় নাই। ইন্টার পাস কিংবা বিএ পাস করে গার্মেন্টে চাকরি নেয় কিন্তু শ্রমিকদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পাওয়াতে সবসময় হতাশ থাকে। তারপর তারা অন্যান্য শ্রমিকদের উস্কানি দেয়। এই হলো ওদের কাজ। তারপরেও বলবো, কিছু কিছু মালিক আছে তারা সঠিকভাবে পারিশ্রমিক দেয় না। কিছু মালিক আছে যারা গার্মেন্ট খাতে লাভের কথা চিন্তা করে ফ্যাক্টরি চালু করে কিন্তু শ্রমিকদের যে মাসে মাসে বেতন দিতে হয় সেটা খেয়াল রাখে না। ঐসব মালিকগুলি এক প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যারা প্রফেশনাল নয়। নতুন আসা মালিকরা এরকম পরিবেশের সৃষ্টি করে। তারা মনে করে গার্মেন্ট খাতে অনেক লাভ। তাপর যখন এসে লাভ পায় না তখন এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হয়।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: ১ মে ‘বিশ্ব মে’ দিবস। মে দিবসে আপনার প্রত্যাশা কি?

মনসুর আহমেদ: মে দিবসে আমার প্রত্যাশা, যে শ্রমিকরা আমার প্রডাকশন দিচ্ছে তাদের নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করতে হবে। যে শ্রমিকরা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি সেই শ্রমিকদের কোনভাবেই অবহেলা করা যাবে না। শ্রমিকরা আমার ভবিষ্যত। আমি সবসময় সবাইকে বলি, শ্রমিকের বেতন ২ হাজার টাকা বাড়লে চিন্তিত হবার কিছু নেই। আয় হলে শ্রমিকের বেতন বাড়বেই। অর্থের, রিজিকের মালিক আল্লাহ।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মনসুর আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সব খবর
সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বশেষ