শনিবার ২০ জুলাই, ২০১৯

শুভ জন্মদিন নারায়ণগঞ্জ

শুক্রবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১:৪৫

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৪ সালের আজকের এই দিনে গঠিত হয়েছিল রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যত এই নারায়ণগঞ্জ জেলার। শুভ জন্মদিন নারায়ণগঞ্জ।

নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় যে, ১৩০২ পূর্ব পর্যন্ত এই নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ-ই ছিল বাংলার রাজধানী। পরবর্তীতে, বাংলায় সুলতানি শাসনামলেও স্বাধীন রাজ্যের রাজধানী এবং প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবেও সোনারগাঁয়ের গর্ব কিংবদন্তিতুল্য। সোনারগাঁকে কেন্দ্র করে সে সময় খিজিরপুর (বর্তমান নারায়ণগঞ্জ শহর), কদমরসুল ও মদনগঞ্জে গড়ে ওঠে বাণিজ্যিক অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক নদীবন্দর।

যে কারনে বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা (১৩৪৬) সোনারগাঁওকে প্রসিদ্ধ বন্দর-নগরী রূপে বর্ণনা করেছিলেন। আর সমুদ্র পথে বিভিন্ন দেশ থেকে বাণিজ্য-তরী সহজেই এই বন্দরে পৌঁছতে পারত বিধায় চীনের পরিব্রাজক হৌ-হিয়েন (১৪১৫) সোনারগাঁওকে বর্ণনা করেন বহু পুকুর, পাকা সড়ক ও বাজার সমৃদ্ধ প্রাচীর বেষ্টিত, সুরক্ষিত নগর এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে।

বাংলার প্রখ্যাত মসলিন কাপড়ের প্রধান উৎপাদনকেন্দ্র ছিল সোনারগাঁ। ইংরেজ আমলে এটি থান কাপড়ের ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত হয়। যার ফলে গড়ে উঠে পানাম নগরী। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান হস্ত-শিল্প জামদানি শাড়ির উৎপাদন এখনও এই নারায়ণগঞ্জ ভিত্তিক।

পরবর্তীতে কালের পরিক্রমায় ঢাকায় মুঘল রাজধানী স্থাপনের পর দীর্ঘ অবহেলায় সোনারগাঁ পরিণত হয় ‘গভীর জঙ্গলে ঘেরা গন্ড গ্রামে।’

এরপর, নারায়ণগঞ্জ পুনরায় জীবন ফিরে পায় ব্রিটিশদের আগমনের পর। পলাশী যুদ্ধের সময় এ অঞ্চলের ইংরেজ ব্যবসায়ীদের সাহায্য করার সুবাদে তাদের সুপারিশে ঢাকার নবাব রেজা খান এই এলাকার ভোগস্বত্ব ১৭৬৬ সালে ভীখন লাল ঠাকুরকে (যিনি বেনু ঠাকুর বা লক্ষী নারায়ণ ঠাকুর পান্ডে নামে পরিচিত ছিলেন) দান করেন। তখন নিজ দেবতার নামে তিনি এই জায়গার নাম পাল্টে রাখেন ‘নারায়ণগঞ্জ’ ।

সেসময় রাজধানী ঢাকা ও সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের মাধ্যে যোগাযোগ বিভক্ত থাকায় এবং বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকার কারনে ইংরেজরা এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।

১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ সরকার নারায়ণগঞ্জকে আধুনিক শিল্প নগরীতে পরিনত করার লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা গঠন করে। ১৮৬৬ সালে ডাক, ১৮৭৭ সালে টেলিগ্রাফ এবং ১৮৮২ সালে টেলিফোন সার্ভিস চালু হয়। ১৮৮৫ সালে চালু হয় নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-ময়মনসিংহ ট্রেন সার্ভিস।১৯০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে নারায়ণগঞ্জ শহরে পৌরসভার তত্ত্বাবধানে প্রথম বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হয়।

১৯০৮ সালের মধ্যে, ১৮টি ইউরোপীয় এবং ২টি ভারতীয় কোম্পানির কল্যানে পাট ব্যবসার প্রাণকেন্দ্রে পরিনত হয় নারায়ণগঞ্জ। খ্যাতি পায় ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ হিসেবে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী জুট মিল গড়ে তোলা হয় নারায়ণগঞ্জে। দেশের প্রথম টেক্সটাইল মিল ঢাকেশ্বরী কটন মিল, ১৯২৭ সালে গড়ে তোলা হয়েছিল এই নারায়ণগঞ্জেই । ১৯৩১ সালের দিকে প্রথম নারায়ণগঞ্জ শহরের রাস্তায় পৌর বাতির ব্যবস্থা করা হয়। তখন এ বাতিকে মানুষজন দবিজলী বাতিদ বলতো। এর পূর্বে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোতে হারিকেন জ্বালিয়ে রাখা হতো।

১৯৪৯-৫০ সালের দিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র সাপ্তাহিক বার্তাবহ’। এর প্রকাশক ও সম্পাদক ছিলেন মনীন্দ্র দত্ত।

১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ জেলা গঠিত হয়। ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে উন্নিত হয়।
১৮৭৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে প্রথম স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অর্থাৎ পৌরসভা চালুর মধ্য দিয়েই পৌর নাগরিক হিসেবে আমাদের পথ চলা শুরু হয়েছিল।

বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ দেশের ৭ম সিটি কর্পোরেশন। ২০১১ সালের ০৫ মে তিনটি পৌরসভা যথাক্রমে নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও কদমরসুল কে একীভুত করে সরকার প্রায় ৭২.৪৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন।

ঢাকার পার্শ্ববর্তী ঘনবসতিপূর্ণ শিল্প সমৃদ্ধ এ বন্দর নগরী এখনো বাণিজ্যিক বন্দর নগরী হিসেবেই দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। নিট গার্মেন্টস, সুতার ব্যবসা, হোসিয়ারী শিল্প, জাহাজ নির্মান প্রভৃতির জন্য সুপরিচিত নারায়ণগঞ্জ। এছাড়া, নিটওয়্যার রপ্তানিকারকদের সংগঠন “বিকেএমইএ”, বাংলাদেশ ইয়ার্ন মার্চেন্ট এসোসিয়েশন, হোসিয়ারী মালিক সমিতিসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত। সারা নারায়ণগঞ্জ শহরে রয়েছে প্রায় ১ হাজার রপ্তানীমুখী গার্মেন্টস। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ৩টি পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানার ২টিই রেমি হোল্ডিংস ও প্লামি ফ্যাশনস এ জেলাতেই অবস্থিত।

দেশের সিমেন্ট, ইস্পাত তথা নির্মান শিল্পের সিংহভাগ উৎপাদন ও সরবরাহ এখান থেকেই হয়। এখানেই আছে বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি মেরিন পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট। বাংলাদেশের প্রথম রপ্তানিকৃত বাণিজ্যিক জাহাজ ‘স্টেলা মেরিস’ তৈরী হয়েছিল এই নারায়ণগঞ্জেই।

শুধু তাই নয়, রাজধানী ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সহ ২টি বিমান ঘাঁটির জ্বালানী সরবরাহ হয় এই জেলা থেকে। সিদ্ধিরগঞ্জ, মঘনাঘাট, মদনগঞ্জ, হরিপুর, পাগলা, কাশিপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো জাতীয় গ্রিডের বৃহত অংশের যোগানদাতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর আয় ও ব্যয় নির্ধারন জরিপ (২০১৬) অনুসারে, দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম দরিদ্রতার হার (২.৬)% নারায়ণগঞ্জ জেলায়।

ঐতিহাসিক চিত্তাকর্ষক স্থানের নাম নারায়ণগঞ্জ। ইতিহাসের প্রতিটা পাতায় পাওয়া যায় নারায়ণগঞ্জ। এখানে আছে লোকশিল্প জাদুঘর, পানাম নগর, সোনারগাঁও, সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের সমাধি, বারদী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম, সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহের এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ, বাবা সালেহ মসজিদ, বন্দর শাহী মসজিদ, কদমরসুল দরগাহ, গোয়ালদি মসজিদ, সোনাকান্দা দূর্গ, হাজীগঞ্জ দূর্গ, বিবি মরিয়মের সমাধিসহ ঐতিহাসিক আরও অনেক স্থান।

বহু কৃতি ব্যাক্তির জন্মস্থান এই নারায়ণগঞ্জ। এক কথায়, গৌরবময় ইতিহাসের এক ভান্ডার নারায়ণগঞ্জ।

 

সব খবর
পজিটিভ নারায়ণগঞ্জ বিভাগের সর্বশেষ