বুধবার ২১ এপ্রিল, ২০২১

লঞ্চডুবি: কান্নাচোখে স্বজনরা ফিরেছেন লাশ নিয়ে

বুধবার, ৭ এপ্রিল ২০২১, ১২:২৭

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

সৌরভ হোসেন সিয়াম (প্রেস নারায়ণগঞ্জ): বৃদ্ধ আবদুল খালেক শেখ যাচ্ছিলেন মেয়ের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ সদরে। ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী লাবণী জিবু ছিলেন সেজো বোন ও দুলাভাইয়ের সঙ্গে। স্ত্রী ও আট মাসের শিশু কন্যাকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন আনোয়ার শেখ। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া থেকে চিকিৎসা নিয়ে একাই ফিরছিলেন খাদিজা বেগম। স্ত্রী রেহেনার ভাঙা হাতের চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরছিলেন শামসুদ্দিন মুন্সীও। তাদের নাম ও ঠিকানা ভিন্ন ভিন্ন হলেও এমন ত্রিশ জনের নিয়তি যেন লেখা হয়েছিল একই বলপেনে। গত রোববার নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রী ছিলেন তারা। বেঁচে ফিরতে পারেননি এই ত্রিশ জনের কেউই। গতকাল যখন তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় তখন স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে উঠে শীতলক্ষ্যার দুই তীরের বাতাস।

গত রোববার সন্ধ্যা পাঁচটা ৫৬ মিনিটে মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশে নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল ছেড়ে যায় এমএল সাবিত আল হাসান নামে যাত্রীবাহী লঞ্চটি। তখনও কালবৈশাখীর ঝড় শুরু হয়নি। লঞ্চটির ধারণ ক্ষমতা ৬৮ জন হলেও সেদিন তারও কম যাত্রী নিয়ে রওনা হয়েছিল বলে জানান লঞ্চ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান রাজা। অনুমানিক সোয়া ছয়টার দিকে মদনগঞ্জ-সৈয়দপুর এলাকায় তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর অদূরে এসকেএল-৩ (এম : ০১২৬৪৩) নামে একটি কার্গো জাহাজ পেছন থেকে ধাক্কা দেয় যাত্রীবাহী লঞ্চটিকে। সে সময় প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, লঞ্চটিকে ঠেলে অন্তত ২০০ মিটার দূরে নিয়ে গিয়ে ডুবিয়ে দেয় কার্গো জাহাজটি। এর মধ্যেই নদীতে ঝাপিয়ে পড়েন কয়েকজন। ওইদিন সন্ধ্যা সাতটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্যমতে, রাতেই ২৯ জন যাত্রী সাঁতরে জীবিত অবস্থায় নদী পার হতে সক্ষম হন। পাওয়া যায় পাঁচ নারীর লাশ। নিখোঁজ ছিলেন আরও ৩০ জন। লঞ্চডুবির ঘটনার ১৮ ঘণ্টা পর গতকাল দুপুর বারোটার দিকে লঞ্চটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হলে তার ভেতর পাওয়া যায় আরও ২২ জনের লাশ। বিকেলে মেলে আরও ৩ জনের লাশ। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৫ যাত্রী।

কান্নাচোখে স্বজনরা ফিরেছেন লাশ নিয়ে

লঞ্চডুবির এই ঘটনায় বাবা আনোয়ার শেখ (৩৫), মা মাকসুদা (৩০) ও আট মাস বয়সী ছোট বোন মানসুরাকে হারিয়েছে মাহিন। সপ্তম শ্রেণীপড়–য়া মাহিন থাকতেন রাজধানীর শনির আখড়ায়। আনোয়ার শেখ ছিলেন ক্ষুদ্র কাঁচামাল ব্যবসায়ী। লঞ্চ উদ্ধারের পর বাবা ও মায়ের লাশ পেলেও ছোট বোনটির লাশ তখনও পাওয়া যায়নি। কাঁদতে কাঁদতে মাহিন বলছিল, নানা বাড়ি যাচ্ছিলেন তারা। একদিন পরই ফেরার কথা ছিল বাবা-মায়ের। তারা ফিরলেন ঠিকই কিন্তু লাশ হয়ে।

লাশ উদ্ধার হয়েছে জানতে পেরে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন মধ্যবয়সী ট্রলার চালক সেলিম। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তার বাবা শামসুদ্দিন মুন্সী (৯০) ও মা রেহেনা (৭০)। মায়ের ভাঙা হাতের চিকিৎসা করানোর জন্য নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগে অবস্থিত হাড়ভাঙা চিকিৎসালয়ে এসেছিলেন। চিকিৎসা নেয়ার পর মুন্সীগঞ্জের চরকিশোরগঞ্জ মোল্লাপাড়া এলাকায় বাড়িতে ফিরছিলেন। সেলিম বলেন, ‘আমার বাবার মতো ভালো মানুষ দ্বিতীয় কেউ ছিল না। সবাইরে জিগাইলেই এই কথা কইবো। আমারে কইছিল, ঘর কইরা দিবো। এহোন আমি ঘর দিয়া কি করমু? আমি তো এতিম হইয়া গেলাম।’ এই বলেই ট্রলারের মধ্যেই গড়াগড়ি করে কাঁদছিলেন তিনি।

মারা গেছে দেড় বছরের শিশু সন্তান ওমর ফারুক। তার শোকে পাগলপ্রায় মা আলী নূর। লঞ্চ উদ্ধারের খবর পেয়ে নদীর পশ্চিম পাশ থেকে পূর্ব পাশে যাওয়ার সময় ট্রলারে গড়াগড়ি করে কাঁদছিলেন তিনি। তাকে সামলানো মুশকিল হয়ে দাঁড়ায় স্বজনদের জন্য। ছেলের লাশ পাওয়া গেছে শুনে ট্রলার থেকে ঝাপিয়ে পড়ে নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন আলী নূর। কোনমতে মেয়েকে সামলে রাখেন শিউলি বেগম। তিনি বলেন, দাদার সঙ্গে লঞ্চে উঠেছিল। দাদা বেঁচে ফিরলেও নিখোঁজ ছিল আদরের নাতি। দাদাও বাড়িতে বসে কাঁদছেন বলে জানান শিউলি বেগম।

রাক্ষুসে জাহাজ মায়রে ডুবাইয়া মারলো

গলার টনসিলের চিকিৎসা করাতে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় মেয়ের বাড়িতে এসেছিলেন খাদিজা বেগম (৫০)। চিকিৎসা শেষে নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জ হয়ে গ্রামের বাড়ি বরিশালের স্বরূপকাঠিতে ফেরার উদ্দেশে সাবিত আল হাসান লঞ্চটিতে উঠেন তিনি। তার মরদেহ সামনে রেখে কাঁদছিলেন মেয়ে নাজনীন। বলছিলেন, মায়ের পরনে বোরকা থাকলেও লাশের শরীরে বোরকা ছিল না। বাঁচার জন্যই হয়তো গায়ের বোরকা খুলে ফেলেছিলেন তিনি। ‘আমার মায় সাঁতার জানে তারপরও বাঁচতে পারল না। রাক্ষুসে জাহাজ আমার মায়রে ডুবাইয়া মারলো।’

পরিবহন সংকটে পড়েন নিহতের স্বজনরা

গতকাল ছিল লকডাউনের প্রথম দিন। সরকারি নির্দেশনার কারণে সড়কে যানবাহন ছিল সীমিত। এতে শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবির ঘটনায় হতাহতের স্বজনরা পড়েন পরিবহন সংকটে। নদী থেকে লাশ উদ্ধার এবং হস্তান্তর কার্যক্রম শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরও পরিবহনের অপেক্ষায় লাশ নিয়ে অপেক্ষমান দেখা যায় তাদের। বেলা দেড়টার দিকে মহারানী পাতরের (৪২) মরদেহ বুঝে পান তার স্বজনরা। আধঘণ্টা এদিক-ওদিক ছোটাছুটির পর একটি পিকআপ ভ্যান জোগারের জন্য যান তারা। মুন্সীগঞ্জে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ইজিবাইকও পাচ্ছিলেন না।

বেলা দেড়টার দিকে লাশ বুঝে পেলেও পরিবহন না পাওয়াতে তিনটা পর্যন্ত আবদুল খালেক শেখের (৮০) লাশ নিয়ে অপেক্ষমান দেখা যায় স্বজনদের। ছেলে পিন্টু শেখ জানান, শরীয়তপুর তাদের গ্রামের বাড়ি। সেখানে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করেছেন। লকডাউনের কারণে পরিবহন সংকট থাকায় পড়েছেন মুশকিলে। পরিবহন পেলেও মহাসড়কে আটকা পড়েন কিনা তা নিয়েও চিন্তিত পিন্টু। তবে পাশে থাকা এক স্বজন অভয় দিয়ে বলেন, লকডাউন হলেও জরুরি যাতায়াতে বাধা পড়বে না।

শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীরে ছোট বোন লাবনী জিবুর (১৩) লাশ নিয়ে কাঁদছিলেন লিপি। খবরে লঞ্চডুবির কথা শুনেই সেজো বোন তামান্না ও দুলাভাই খায়রুলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। পরে জানতে পারেন বোন-দুলাভাই আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আর নিখোঁজ রয়েছেন লাবনী। দুপুরে লাশ পাওয়ার পর গাড়ির অপেক্ষায় ছিলেন তারা। নিয়ে যাবেন গ্রামের বাড়িতে ঝালকাঠির ভা-ারিয়ায়। কিন্তু যানবাহন জোগার করতে পারছেন না। অন্তত সাত-আট ঘণ্টার যাত্রাপথে লাশ পচেগলে যেতে পারে ভেবে চেষ্টা করছিলেন একটা ফ্রিজিং ভ্যান জোগারের। তাদের সঙ্গে কথা শেষ হতে না হতেই তাহমিনার (২০) লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হতে দেখা যায় স্বজনদের। পরিবহন সংকটে পড়বেন আঁচ করতে পেরে মুন্সীগঞ্জ থেকেই ট্রলার ভাড়া করে নিয়ে আসেন সেলিম। ট্রলারেই বাবা-মায়ের লাশ নিয়ে ফেরেন।

সব খবর
নগর বিভাগের সর্বশেষ