সোমবার ০৩ আগস্ট, ২০২০

লকডাউনের নামে পাড়া মহল্লায় ব্যারিকেড সরান

শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২০, ১৯:০৫

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জে লকডাউনের নামে পাড়া-মহল্লায় বসানো ব্যারিকেডে জরুরি সেবা গ্রহণ, বিশেষ প্রয়োজনে চলাচলে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দিন সবুজ। পাড়া মহল্লায় বসানো ব্যারিকেড সরানোর দাবিও জানান তিনি।

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এই দাবি জানান তিনি। পাঠকদের জন্য ফেসবুক স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো-

‘জামতলা হায়দার আলী রোড থেকে একজন হকার পরশু দিন আমাকে ফোন দিলো। তার বাসায় খাবার নেই। আমি বললাম ইউএনও’র নাম্বারে ফোন দাও। সে বললো, ‘না ভাই। সরকারের লোকজন এসে আমাকে দিয়ে যাবে। সবাই দেখবে। বাচ্চারা লজ্জায় পড়বে। আপনি কিছু ব্যবস্থা করে দেন।’ আমি তাকে আসতে বললাম। কয়েকদিন আগে তার পা মচকে গেছে। হাঁটতে প্রচন্ড অসুবিধা হয়। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড। রিকশা চলতে পারে না। তবু সে বাধ্য হয়ে এই মচকানো পা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আল্লামা ইকবাল রোডে (তোলারাম কলেজের পাশে) আমার বাসায় এলো। প্রেস ক্লাব থেকে আমাকে কিছু খাদ্য দ্রব্য দেয়া হয়েছিল বিতরনের জন্য। আমি সেখান থেকে তাকে একটি প্যাকেট দিলাম। সে প্যাকেটের ওজন কম না। আট কেজি চাল, তিন কেজি আলু, এক কেজি ডাল, দুই কেজি আটা, এক লিটার তেল, এক কেজি লবন, একটা সাবান। হকার ছেলেটিকে বললাম, ‘তুমি আজ অর্ধেক নিয়ে যাও, কাল আবার নিও।’ প্যাকেটটির দিকে তাকিয়ে সে বললো, ‘না ভাই, আমারো কিছু লাগবে। আমার বোনকেও দিতে হবে। একবারেই নিয়ে যাই।’ সে আবার তার মচকানো পায়ে ভরসা করেই রাস্তায় নামলো। মাথায় সেই খাবারের বস্তা বয়ে চললো। পরে ফোনে জানালো, কিছুক্ষণ যাওয়ার পর বিশ্রাম নিয়ে আবার হেটে এভাবে সে এই খাবার নিয়ে গেছে। কিন্তু পা গেছে ফুলে। আজ এ লেখা লেখার সময়ও তার পায়ের ফুলা কমেনি। চেয়ারে বসেই নামাজ পড়তে হয়।

এই হকার ছেলেটির মতো অনেকের ঘরেই খাবারের সংকট যারা হয়তো আত্মীয় বা পরিচিতের বাসা থেকে খাবার নিতো। কিন্তু রিকশা না চলায় নিতে পারছে না। এরা কারো কাছ থেকে চাইতেও পারে না। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড এই শ্রেণীর মানুষকে খাদ্য সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। পা ভাঙ্গা হলেও এই হকার ছেলেটা আসতে পেরেছে। কিন্তু যার বাসা নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে বেশ দূরে? যে বাসায় শুধু মেয়েরা আছে? কিংবা যে বাসায় শুধু বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা রয়েছেন তারা কিভাবে বাজারে যাবে? ওষুধ কিনতে যাবে? ব্যারিকেডের কারণে শহরে যে ত্রাণ বিতরন হচ্ছে তা শহরের লোকজনই পাচ্ছে। একটু দূরের লোকজন পাচ্ছে না।

গত ৮ এপ্রিল দিবাগত রাত দুইটায় কমিউনিষ্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা এডভোকেট মন্টু ঘোষের স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। গভীর রাতে নগরীর মিন্নত আলী শাহ্ সাহেবের মাজার পর্যন্ত এম্বুলেন্স গেলেও আর যেতে পারছিলো না। এরপর তার পরিবারের লোকজন রাস্তয় নেমে বাঁশের দড়ি কেটে, অল্প অল্প করে ইট পাথর সড়িয়ে এম্বুলেন্স নেয়ার ব্যবস্থা করেন। আল্লাহর রহমত যে মন্টু ঘোষের স্ত্রী ঐ দিন রাতে মারা যাননি। কিন্তু এমন হলে তো ব্যারিকেড সড়াতে সড়াতে মানুষ মারা যাবে। আর কারো যদি ব্যারিকেড সরানোর মতো লোক না থাকে ? কিংবা বাসার পুরুষ ব্যারিকেড সরিয়ে এম্বুলেন্স আনতে গিয়েছে এ ফাঁকে যদি বাসায় ডাকাতি হয়? এর দায় দায়িত্ব কে নেবে?

সবচেয়ে মজার ঘটনা হলো মহল্লার নেশাখোর, ইয়াবা ব্যবসায়ী, ইভটিজার, চাঁদাবাজ ছেলেগুলি এই ব্যারিকেড দিতে সবচেয়ে উৎসাহী। এর পেছনে কারণও আছে। এলাকায় এলাকায় এখন এসব ছেলেদের অভয়ারণ্য। সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ নিয়ম ভাঙ্গতে রাস্তায় নামছে না। রাস্তয় নামছে এই শ্রেণিটাই। ব্যারিকেড থাকলে কোনো অভিযোগ পেলে পুলিশ র‌্যাব আসতে আসতে তারা দ্রুত পালাতে পারবে, যা এদের জন্য ভালোই।

গলাচিপায় সুগন্ধা বেকারির সামনে আমি দেখি কিছু ছেলে লাঠি, রড হাতে পাহাড়া দিচ্ছে। রিকশা আটকাচ্ছে। আবার তাদের সেবায় এখানে একটি চায়ের দোকান খোলা থাকে। তারা এখানে আড্ডা দেয়। যেনো ঈদের ছুটি।

শহীদ নগরের আমার এক ছোট ভাই বললো, সেখানে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে একটি ইয়াবা চক্র বেপরোয়া।

প্রতিদিন প্রচুর মানুষকে বাজার থেকে দীর্ঘ পথ হেটে জিনিসপত্র আনতে দেখা যায়। এটা জরুরি প্রয়োজন। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে মানুষের বাজার করতে যাওয়া আটকানো যায়নি। যাবেও না। বরং লাভের মধ্যে লাভ এটা হয়েছে মানুষকে চৈত্রের রোদে ঘামে ভিজতে ভিজতে বাজার করতে হয়। এতে অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আরো বাড়ে।

করোনা প্রতিরোধে লকডাউন প্রয়োজন। কিন্তু এমন পরিস্থিতি কারো জন্যই ভালো নয় যে মানুষ অতি প্রয়োজনীয় চলাচল করতে না পারে। যার অনুমতি সরকার দিয়েছে। তাই আমি দাবী করবো পাড়া-মহল্লার এই ব্যারিকেডগুলি দ্রুত সড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’

সব খবর
মতামত বিভাগের সর্বশেষ