বুধবার ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯

যেভাবে অপরাধ জগতে দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে তুহিন

বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২০:২৭

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: পুরো নাম সাইফুল ইসলাম তুহিন। ২০ বছর বয়সী তুহিনের নেতৃত্বে তৈরি হয় দুর্ধর্ষ এক কিশোর গ্যাং। এই গ্যাংয়ের হাতে খুন হয়েছেন একাধিক ব্যক্তি। নগরীর দেওভোগ, তাঁতিপাড়া, কাশীপুর, হাশেমবাগ, বাবুরাইল, বেপারীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় চালাতো সন্ত্রাসী তাণ্ডব। ছিল মাদক ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ততা। সম্প্রতি দেওভোগের হাশেমবাগ এলাকায় শাকিল নামে এক যুবক হত্যার ঘটনায় আলোচনায় আসে তুহিন। এই ঘটনার পর টানা দেড়মাসেরও বেশি সময় পলাতক ছিল সে। এদিকে বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ভোরে র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে তুহিন। তুহিনের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে অপরাধ জগতে ছোট থেকে বেড়ে ওঠা দুর্ধর্ষ তুহিনের গল্প।

তুহিন দেওভোগের তাতীপাড়া এলাকার অটোরিকশা চালক কাওসার হোসেনের ছেলে। খুব অল্পো বয়সে (ছয় বছর) মায়ের মৃত্যু হয়। পরে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন সংসার পাতেন। মাকে হারানোর পর বাবার সাথেও দূরত্ব তৈরি হয়। মেজো বোনই ছিলেন একমাত্র আশ্রয়স্থল। এদিকে বোনেরও বিয়ে হয়ে যাওয়াতে একা হয়ে পড়ে সে। স্কুলে ও মাদ্রাসায় ভর্তি করালেও পড়াশোনায় মন ছিল না তার। পড়াশোনা না করে ওলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়াতো সে। পারিবারিক শাসন না থাকাতে এক সময় বেপরোয়া হয়ে ওঠে তুহিন। ২০১৩ সালের দিকে তেরো বছর বয়সেই যোগ দেয় দেওভোগের শীর্ষ সন্ত্রাসী হাসানের (ইতোপূর্বে ক্রসফায়ারে নিহত) বাহিনীতে। অল্প সময়ের মধ্যেই হাসানের আস্থাভাজন হয়ে ওঠে সে। এক পর্যায়ে হাসানের সেকেন্ড ইন কমান্ডের (ঘনিষ্ঠ সহযোগী) দায়িত্ব পালন করে সে। ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ ২০ মামলার আসামি হাসান র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হওয়ার পর হাসান বাহিনীর একটি অংশের দখল পায় সেইসময়ের ১৯ বছর বয়সী তুহিন। উঠতি বয়সী কিশোর ছেলেদের দলে ভেড়াতে থাকে। তৈরি করে এক আতঙ্কের নাম ‘তুহিন গ্যাং’।

সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই রাতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাকিল নামে নিরীহ যুবককে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসী তুহিন ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। ওই ঘটনায় আরো ছয়জনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে তুহিনকে প্রধান আসামি করে ফতুল্লা থানায় একটি মামলা করে নিহত শাকিলের বড় ভাই সাঈদ হোসেন।

এর আগে গত ২৭ জানুয়ারি রাতে দেওভোগ মাদরাসা এলাকার বাসিন্দা আলমগীরকেও কুপিয়ে হত্যা করে ওই কিশোর গ্যাং। এই বাহিনীর সন্ত্রাসীদের হাতে দেওভোগ নাগবাড়ি এলাকায় নির্মমভাবে খুন হয় হৃদয় হোসেন বাবু নামে আরো এক যুবক।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ক্রসফায়ারে নিহত হাসানের হাতে তুহিনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের হাতেখড়ি হলেও তুহিনের নেতৃত্বের এই গ্যাংয়ের শেল্টারদাতা ছিল দেওভোগের শীর্ষ সন্ত্রাসী তাসলিম। এছাড়া তুহিনের সাথে শহরের আরেক সন্ত্রাসী দারুনের সাথেও ছিল বেশ সখ্যতা। এছাড়া ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতারও শেল্টার ছিল।

এদিকে পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বছর সদর উপজেলার সৈয়দপুর এলাকার অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ফাতেমাকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে সে। ফাতেমা নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

তুহিনের বাবা কাওসার হোসেন জানান, ছোটবেলা থেকেই অবাধ্য ছিল তুহিন। কথা না শোনায় তারে বেশ কয়েকবার ঘর থেকে বের করেও দেওয়া হয়। পরে যখন এইসব (সন্ত্রাসী) কাজে জড়িয়ে পড়ে তখন আর তাকে বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া হয়নি। তারে এক প্রকার ত্যাজ্য করে দেন তিনি। তিনি বলেন, পায়ে শিকল পর্যন্ত দিয়া রাখছি। হাসানের লগে গিয়াই শ্যাষ হইলো।

তুহিনের বোন স্বর্ণা বলেন, ভাইয়ের লাইগা স্বামী ছাইড়া দিছি। দুই ভাইরে কতো আদর কইরা পালছি। আহারে ভাই! কেন যে তুই এই লাইনে গেলি? হাসাইন্নায় সব কইরা গেছে। আমার ভাইয়ের হাতে তো আর কলম তুইল্লা দেয় নাই, কলম তুইল্লা দিলে তো আর এমনটা হইতো না।

জীবিত থাকা অবস্থায় দুর্ধর্ষ তুহিনের বিরুদ্ধে কেউ মুখ না খুললেও মারা যাওয়ার পর উল্লাসে ফেটে পড়ে দেওভোগ, তাঁতিপাড়া, কাশীপুর, হাশেমবাগ, বাবুরাইল, বেপারীপাড়া এলাকাবাসী। এলাকায় এলাকায় মিষ্টি বিতরণসহ র‍্যাব সদস্যদের ফুল দিতে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে।

সব খবর
নগর বিভাগের সর্বশেষ