সোমবার ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

মশক নিধনে সিটি কর্পোরেশনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ২১:০১

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: নগরীতে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। নগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় এ রোগ নিয়ে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিটিতে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে দুইজন নিহত এবং প্রায় আড়াইশ’ জন আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর তথ্যমতে আক্রান্তের সংখ্যা আরো বেশি। সম্প্রতি দুই সাংবাদিক ও এর আগে আরো তিন সাংবাদিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রাজধানীর লাগোয়া শহর হওয়াতে ডেঙ্গু যেকোন সময় মহামারী আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মশার উৎপাতে সারা বছরই অতিষ্ঠ থাকে নগরবাসী। মশক নিয়ন্ত্রণে কর্পোরেশনের ভূমিকা নিয়ে বছরজুড়ে অভিযোগ শোনা যায় নগরবাসীর মুখে। সাম্প্রতিক সময়ে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় ওই অভিযোগ আরো জোরালো হয়েছে। অনেক এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ফগার মেশিনসহ সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দেখাও পাওয়া যায় না বছরের পর বছর।

আলামিন নগর এলাকার গৃহিণী সুলতানা আক্তার বলেন, ‘আমাদের এলাকায় একটি খাল রয়েছে। এ খালে প্রচুর পরিমাণ ময়লা পানি আর আবর্জনা জমে আছে। সেখানে মশার কারখানা। কিন্তু গত ছয়-সাত বছরের মধ্যে এক দিনের জন্যও মশা নিধনের মেশিন নিয়ে কাউকে এলাকায় আসতে দেখিনি। এমনকি খাল পরিষ্কারের জন্যও কেউ আসে না।’

সিদ্ধিরগঞ্জের আবুল হোসেন বলেন, ‘মশার যন্ত্রণায় দিনের বেলায়ও নিস্তার নেই। ৫ দিন ধরে ডেঙ্গুতে ভুগছি। মশার অত্যাচার দেখে মনে হয় মশা মারার জন্য কেউ কাজ করে না।’

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের তথ্যমতে, মশক নিধনের জন্য ৬০ জন কর্মী ও ৬০টি স্প্রে মেশিন রয়েছে। ১৬টি ফগার মেশিনের ৪টি ছাড়া বাকিগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে। যদিও বেশির ভাগ এলাকাতেই এ কার্যক্রম চালানো হয় না।

এদিকে সিটি কর্পোরেশনে মশক নিধনে যে বাজেট রাখা হয় তা অপ্রতুল। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আয়তন ৭২.৪৩ বর্গ কিলোমিটার। বাণিজ্যিক শহর হওয়ার কারণে এখানে মানুষের আনাগোনাও অনেক বেশি। সিটির ২৭টি ওয়ার্ডে বসবাস করেন প্রায় ২০ লাখ মানুষ। কিন্তু নগরীতে মশা নিধনের পেছনে সীমিত বরাদ্দের কারণে মশার উপদ্রব কমছে না। বরং দিন দিন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। আবদ্ধ ডোবানালা ও ড্রেনগুলোয় মশার বিস্তার বেড়েই চলেছে। মূলত বদ্ধ ড্রেনের দুর্গন্ধময় পানি, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় এবং ডোবায় কচুরিপানা থাকার কারণে মশা বৃদ্ধি পেয়েছে। নগরীর নিত্যদিনের আবর্জনা অপসারণে সিটি কর্পোরেশনের উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বাজেট বই পর্যালোচনা ও কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, গত ১ জুলাই শুরু হওয়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে নাসিকের মশক নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ রেখেছে ৪০ লাখ টাকা। দেড় মাসেই খরচ হয়ে গেছে ২০ লাখ টাকা। সিটি কর্পোরেশনের তথ্যানুযায়ী, এই অর্থবছরের বাজেটের পর মশক নিধনের জন্য ৪০টি নতুন মেশিন ক্রয় করা হয়েছে। এলডিও ওষুধ কেনা হয়েছে ১০ লাখ টাকার।

এদিকে বিদায়ী অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণ খাতে বরাদ্দই ছিল মাত্র ১০ লাখ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সম্পূর্ণ ব্যয় ছিল ১২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে নাসিক ওই খাতে ব্যয় করে ২৬ লাখ ৯৩ হাজার ৩২০ টাকা। আগের অর্থবছরে ব্যয় ১৬ লাখ ৩ হাজার ৮২০ টাকা। মশক নিয়ন্ত্রণে সীমিত অর্থ বরাদ্দে সুফল পাচ্ছে না নগরবাসী।

এদিকে বর্ষাকালে মশার প্রজননের সময় হলেও শীতকালে মশার উপদ্রব আরো বেড়ে যায়। মশক নিধনে বরাদ্দের অর্ধেক বর্ষাকালেই শেষ হওয়াতে আগামী শীতকালে মশার সমস্যা মোকাবেলায় সংকটে পড়তে হবে বলে মনে করেন অনেকে।

মশক নিধনে নাসিকের সক্ষমতা আরো বাড়ানো উচিত বলে মন্তব্য করে নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান প্রেস নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘আমি মনে করি মশক নিধনে সিটির বাজেট আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল। মশক নিধনে লোকবলও বাড়াতে হবে সিটি কর্পোরেশনকে। নগরবাসীকে শান্তিতে রাখা সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব। আমরা চাইবো মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন বলে মনে করি।’

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, মশক নিয়ন্ত্রণে তাঁদের আন্তরিকতার অভাব নেই। নগরের বাইরের বেশ কিছু এলাকার খাল, ডোবা ও নালায় জমে থাকা ময়লা পানিতে ব্যাপক মশা জন্ম নেয়। সেখান থেকেই মশা নগরীতে ছড়িয়ে পড়ছে।

এদিকে ফগার মেশিন সংকট ও অপ্রতুল কর্মী থাকার কথা স্বীকার করে মশক নিধনে সিটি কর্পোরেশনের আন্তরিকতার কোন কমতি নেই বলে জানান মেডিকেল অফিসার ডা. শেখ মোস্তফা আলী। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিটি ওয়ার্ডে-ওয়ার্ডে কাজ করছি। এখন মশার প্রজননের সময়। মশার লার্ভা যাতে জন্ম নিতে না পারে এবং কোন পানিতে মশা এসে বসে যাতে ডিম পারতে না পারে সেজন্য লার্ভিসাইড ও এলডিও ওষুধ প্রয়োগ করছি। আমাদের সক্ষমতার দিকে নজর রেখে কাউন্সিলরদের আহ্বান করেছি সহযোগিতা করার জন্য এবং তারাও আমাদের সহযোগিতা করছেন। আমাদের বরাদ্দের প্রায় অর্ধেকই ইতিমধ্যে খরচ হয়ে গেছে। প্রয়োজনে বরাদ্দ আরো বাড়ানো হবে।’

এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এএফএম এহতেশামুল হক প্রেস নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য মশক নিধনে আমাদের ব্যাপক কার্যক্রম রয়েছে। কি পরিমাণ খরচ হয়েছে এই মুহুর্তে বলতে পারছি না। কিন্তু প্রয়োজনে এই খাতে আমাদের বরাদ্দ আরো বৃদ্ধি করা হবে।’

সব খবর
নগর বিভাগের সর্বশেষ