বুধবার ১৪ নভেম্বর, ২০১৮

ত্বকী হত্যা

ভয়ের শহরে মুখোমুখি গডফাদার ও দেসপ্যারাদো

মঙ্গলবার, ৬ মার্চ ২০১৮, ১৪:০০

ফারুক ওয়াসিফ

আজ ৬ মার্চ মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের ৫ম বার্ষিকী। বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের  পাঁচ বছর পেরুলেও এখনও এই হত্যা মামলাটির তেমন কোনও অগ্রগতি হয়নি। ত্বকী হত্যার পর প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয় সাংবাদিক ও লেখক ফারুক ওয়াসিফ এর এই লেখাটি। পাঠকের জন্য প্রেস নারায়ণগঞ্জে পুনরায় প্রকাশ করা হল। 

ত্বকী হত্যা

ভয়ের শহরে মুখোমুখি গডফাদার ও দেসপ্যারাদো

নারায়ণগঞ্জে একটি বিপন্ন পরিবার আর একটি প্রভাবশালী পরিবার মুখোমুখি। কে জিতবে কে হারবে, তা সরকার জানে।

হলিউডি ছবি দেসপ্যারাদো দেখে কত মানুষ রোমাঞ্চিত হয়। নায়ক আন্তোনিও বানদারাসাকে হিরো ভাবে কত যুবক-যুবতী। কিন্তু ঘরের কাছে আরও বড় লড়াই লড়ে চলেছেন এ রকমই এক ‘ডেসপ্যারাট’ মানুষ। দেসপ্যারাদোর নায়ক তার প্রেমিকা হত্যার প্রতিশোধ নিতে এক খুনি গডফাদারের দর্প চূর্ণ করে। নারায়ণগঞ্জের রফিউর রাব্বি কিশোরপুত্র হত্যার বিচারের দাবিতে পথে নেমেছেন। সৃষ্টি করে চলেছেন সাহস, প্রতিবাদ আর কান্নার জাগরণ। স্প্যানিশ ভাষায় দেসপ্যারাদোর একটা অর্থ আশাহীন বা বেপরোয়া। নারায়ণগঞ্জের রফিউর রাব্বির আশার প্রদীপ নিভে গেছে; তাই তিনি বেপরোয়া। সতেরো বছরের সোনার টুকরা ছেলেটির ক্ষতবিক্ষত লাশ পড়ে ছিল শীতলক্ষ্যার পানি আর কাদায়। মাতৃমুখী ত্বকী সেই থেকে নারায়ণগঞ্জের সব মায়ের শোক, সব বাবার ক্রোধের হুতাশন, প্রতিবাদের প্রেরণা অনেক ভাইয়ের।

গত দুই বছরে ত্বকীর মতো করে আরও তিনজনকে হত্যা করা হয়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আশিক ও ভুলু সাহা ব্যবসায়ী এবং দিদারুল আলম চঞ্চল ছিলেন পুরস্কৃত তরুণ নাট্যকার। তাঁদের সবার সঙ্গেই নারায়ণগঞ্জের ওই বিশেষ পরিবারের বিরোধ হয়েছিল। এবং তাঁদের সবাই-ই লাশ হয়ে ভেসে উঠেছিল শীতলক্ষ্যার একটি বিশেষ জায়গায়। বলা হয়, লাশগুলো পাওয়ার জায়গাটির পাশেই রয়েছে ওই পরিবারের ‘নির্যাতনকেন্দ্র’। সবাইকেই মারা হয় শ্বাসরোধে। হত্যার আগে সবারই অণ্ডকোষ থেঁতলানো হয় চরম যন্ত্রণা দিতে। স্থানীয় লোকজন ফিসফাস করে বলে থাকেন, এটাই নাকি ওই বিশেষ পরিবারের দ্বারা সংঘটিত হত্যার ‘ট্রেডমার্ক’। নৃশংসতা দিয়ে শহরবাসীকে বার্তা দেওয়া হয়; প্রতিবাদ করলেই এই পরিণতি হবে। কিন্তু কত দিন?

ত্বকীকে দেখেছিলাম এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। এমন গুণের ছেলে, এমন শান্ত ও মেধাবী ছাত্র, এমন কিশোর কবি, এমন স্নেহ-ভালোবাসার পাত্র খুবই বিরল। মৃত্যুর পরপরই এ লেভেল পরীক্ষার ফল বের হয়। পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। ভালো ফল করার চেয়ে ও চেয়েছিল মহত্ হূদয়ের মানুষ হওয়ার। সে কথা বলেওছিল বাবাকে। ওর বিশুদ্ধ হূদয়, অনুভূতিশীল মন আর ভাবুক বুদ্ধিমত্তা বিস্ময়কর। ওর শেষ জীবিত শয়ানের বিছানার পাশে ছিল টলস্টয়ের উপন্যাস। পাঠাগার থেকে বই আনার পথেই ওকে অপহরণ করা হয়। এমন মাসুমের মৃত্যুতে কারবালার মাতম উঠবেই। রফিউর রাব্বির বুকচেরা ফরিয়াদ ফিরিয়ে দেয় এমন সাধ্য কার? তাই নারায়ণগঞ্জের অজস্র মা-বাবা-ভাই-বোনের ফিসফাস হাহাকার প্রতিবাদের চিত্কার হয়ে উঠেছে। সেখানে চলছে অভূতপূর্ব সামাজিক জাগরণ।

এ কোন সম্ভাবনাকে ধ্বংস করল ওরা? এমন সোনার টুকরা ছেলে বহু ভাগ্যে জন্মায়। দুর্ভাগা দেশে তুমি বাঁচতে পারবে না, ত্বকী। কিন্তু তোমার খুনিদের আমরা বাঁচিয়ে দেব, তাদের আমরা ধনে-প্রাণে-দাপটে ঠিকই বাঁচিয়ে রাখব। সব সরকারই গডফাদারদের চায়, এই সরকারও চাইবে, ওই সরকারও তাদের রাখবে। কেবল ত্বকীরা বাঁচবে না। সরকার চাইলেই বিচারটা হবে; নয়তো আরও অনেক মাসুমকে খুন করার জন্য রয়ে যাবে ঘাতকেরা। দায়মুক্তি পেয়ে আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে তারা। সরকার চাইলে সব পারে। অনেক ফাঁসির আসামি রাষ্ট্রপতির মহার্ঘ্য ক্ষমা পেয়েছে। অজস্র খুনের আসামি রাজনৈতিক বিবেচনায় রেহাই পেয়েছে। জীবনের দাবির চাইতে দুর্বৃত্তের পৃষ্ঠপোষকতা বড় হলে ক্ষমতাবানদের মন থেকে রহম উবে যায়। তখন ত্বকীরা হয়ে যায় অপচয়ের খাতার একটি মামুলি দাগ।

এই পোড়ার দেশে ত্বকীরা বাঁচতে পারে না। তাই ত্বকী অপহরণের পরপরই রফিউর রাব্বি পুলিশ-র্যাবের কাছে কাকুতি-মিনতি করলেও ওই বিশেষ পরিবারের বিশেষ ‘নির্যাতনকেন্দ্রে’ তল্লাশি চালাতে রাজি হয় না কেউ। হলে হয়তো ত্বকী লাশ হতো না। এমনকি লাশ পাওয়ার পরও হত্যার কোনো আলামত পুলিশ খুঁজে পায় না। হত্যাকাণ্ডের এক মাস আট দিন পার হয়ে গেলেও আসল অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কেউই গ্রেপ্তার হয় না। রফিউর রাব্বির অভিযোগ ওসমান পরিবারই ত্বকী হত্যার মূল হোতা। অন্যদিকে তাদের বাঁচাতে আরেক ‘জজ মিয়া’ কাহিনি সাজানোর আশঙ্কা করছেন ত্বকীর বাবা। গডফাদারদের সাত খুন মাফ।

কারা এই গডফাদার? যাঁরা প্রতিটি জেলায় সরকারদলীয় ক্ষমতার খুঁটি। অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের জালের দড়িটা তাঁদের হাতে, রাজনৈতিক দাপট বজায় রাখা, চাঁদাবাজিকে সিস্টেমের অংশে পরিণত করা, দুর্নীতি-টেন্ডারবাজিকে সুরক্ষিত রাখাসহ বহু ‘অতীব গুরুত্বপূর্ণ’ কাজে তাঁদের সেবা সবারই দরকার হয়। তাঁরা রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র। তাঁরা দেশটাকে নিজ নিজ জমিদারিতে ভাগ করে নব্য বারো ভুঁইয়ার একেকজন ভুঁইয়া হয়ে আছেন। তাঁদের বাংলাদেশ আর সাধারণের বাংলাদেশ এক নয়।

নারায়ণগঞ্জের মায়েদের আতঙ্ক অন্য রকম চেহারা পেয়েছে। রাতে অনেকেই চমকে ঘুম ভেঙে নিঃশ্বাস আটকে পাশ ফিরে সন্তানকে খোঁজেন। দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠে দেখেন, কেউ তুলে নিয়ে যায়নি তো বুকের ধনকে? নারায়ণগঞ্জ এখন ভয়ের শহর। ভয়টা শিরায় শিরায় ঢুকে গেছে। ঠিক এ রকম একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৫৫ সাল। এক কৃষ্ণাঙ্গ বালক ইম্মেটকে মধ্যরাতে ঘুমন্ত অবস্থায় মায়ের পাশ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। নিয়ে যায় দুজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। বালকটি নাকি কোনো এক শ্বেতাঙ্গিনীকে শিস দিয়েছিল। তারা ইম্মেটকে ত্বকীর মতোই নৃশংস কায়দায় খুন করে। কৃষ্ণাঙ্গরা সে সময় দারুণ উপেক্ষিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। স্বামীহীনা সন্তানহারা মা মামি কার্থান তো আরও সহায়হীন। কিন্তু তাঁর অসহায়ত্বই তাঁকে নির্ভীক করে তুলল। তাঁর প্রথম পদক্ষেপ ছিল সন্তানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কফিনের ঢাকনা খুলে রেখে সবাইকে মাসুম বাচ্চাটির খণ্ড-বিখণ্ড দেহটি দেখতে ডাক দেওয়া। সেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এক লাখেরও বেশি মানুষ সমবেত হয়। ঘটনাটি এতই সাড়া ফেলে যে, যুক্তরাষ্ট্রে বিরাট নাগরিক আন্দোলন দাঁড়িয়ে যায়। এর ধাক্কায় অনেকটা বদলায় সে দেশের বর্ণবাদী সংস্কৃতি। আইন ও রাজনীতি এই আন্দোলনের চাপে সংবিধান সংশোধনের বিল আনতে বাধ্য হয়। এক মা তাঁর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে এভাবে জাতীয় জাগরণে পরিণত করেন।

ত্বকীর জানাজাতেও লাখো মানুষ সমবেত হয়েছিল। সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল সন্তানহারা রফিউর রাব্বির অন্য রকম এই জিহাদ। হুমকি ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে, নতুন নতুন মানুষ উঠে দাঁড়াচ্ছেন। সর্বশেষ, গতকাল বুধবার নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি হালিম আজাদকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন নাসিম ওসমান। হালিম আজাদের মতো অনেক নাগরিকই সেখানে আজ রাব্বির সহযোদ্ধা। নারায়ণগঞ্জের মায়েরা আর সন্তানেরাও একজোট। এমনকি পুলিশ পরিবারের মায়েরাও তাঁদের সন্তানদের বাবাদের চাপ দিচ্ছেন: ত্বকীর খুনিদের ছেড়ো না। সবাই বুঝে নিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জকে গডফাদার-সন্ত্রাসী-খুনিমুক্ত করা না গেলে আইনের শাসন মানবিকতার রোদন সব বৃথা যাবে। এখন সরকারের বোধোদয়ই ভরসা।

ত্বকী আমাদের সময়ের নিষ্পাপের মৃত্যুর প্রতীক। নারায়ণগঞ্জের এ আন্দোলন জীবনের দাবি প্রতিষ্ঠার প্রতীক। এই প্রতীক বৃথা গেলে, এই মাসুম সুবিচার না পেলে নিজেদের জিন্দা লাশ ছাড়া আর কী ভাবতে পারব আমরা? একদিকে জিন্দা লাশের সমাজ, অন্যদিকে দানবের মতো অতিকায় গডফাদারতন্ত্র। সাধারণ মানুষ তাদের চোখে পোকামাকড়ের সমান। পোকা থেকে এখনই যদি মানুষ হতে না শিখি, তাহলে পোকামাকড়ের মতোই পদদলিত হবে ন্যায়বিচারের আর্তনাদ। আর রাব্বিদের সরে দাঁড়ানোর উপায় নেই। একদিকে হুমকি, অন্যদিকে ত্বকীর শপথ। রাব্বি বলেছিলেন, ‘ত্বকী আমার সন্তান, ত্বকীর বয়সের যারা নারায়ণগঞ্জে আছে, সকলে আমার সন্তান। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব, তাদের খুনি-জল্লাদের হাত থেকে রক্ষার দায়িত্ব ত্বকী আমার কাঁধে তুলে দিয়ে গেছে। আমি সেই দায়িত্ব অবশ্যই অবশ্যই পালন করব।’ ত্বকীও তো বলেই গেছে মৃত্যুর আগে লেখা এক কবিতায়: ‘আমি প্রস্তর হয়ে মরলাম উদ্ভিদ হতে/ উদ্ভিদ হয়ে মরি, তো উত্থিত প্রাণে/ মানুষ হয়ে উঠলাম পরে, যখন সত্য উদ্ভাসিত হল/ ভয় কিসের? দ্বিধা কেন মৃত্যুতে?’

ত্বকীর দ্বিধা ছিল না, ওর বাবাও দ্বিধাহীন। তিনি নিরুপায় ‘দেসপ্যারাদো’। দ্বিধা কেবল সরকারের। দেসপ্যারাদোদের তাঁরা চিনতে পারেন না।

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।

সব খবর
মতামত বিভাগের সর্বশেষ