শুক্রবার ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮

বাংলা বর্ষবরণ উৎসব: নারায়ণগঞ্জ পর্ব

শুক্রবার, ১৩ এপ্রিল ২০১৮, ১৭:০৮

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: রাত পোহালেই পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। বাঙালির প্রাণের এ উৎসব উদযাপনে প্রস্তুত গোটা জাতি। জেনে নেয়া যাক, কীভাবে এলো বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ? আর আজকে যে পহেলা বৈশাখ পালনের এত আনুষ্ঠানিকতা, এর শুরুটা হয়েছিল কীভাবে?

সম্রাট আকবর প্রজাদের চাষাবাদে চন্দ্রবছর হিজরী সন অনুসরনের সমস্যাকে সহজ করে দেওয়ার জন্য এক নতুন বছর ও মাস গণনাক্রম প্রবর্তন করেন। এর নাম হলো ‌’ইলাহি সন’। সম্রাট আকবরের এই ‘ইলাহি অব্দ’ হলো সাধারণ কৃষকদের মাঝে চাষাবাদের সুবিধার্থে প্রচলিত দিন-মাস গণনার একটি সমন্বিত রূপ। ভারতবর্ষের সিংহাসনে সম্রাট আকবর আরোহন করেন ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে। তখন হিজরি সন ছিল ৯৬৩। বর্তমানে প্রচলতি বাংলা সনের হিসেবেও সেটি ছিল ৯৬৩ বঙ্গাব্দ। তার সিংহাসনে বসার বছরটি থেকেই চন্দ্রবর্ষ হিজরির পরিবর্তে সৌরবর্ষ ‌‌’ইলাহি সন’ গণনা শুরু হয়। যার পরিমার্জিত ও পরিবর্তিত রূপই হলো বাংলা সন।

পহেলা বৈশাখ উদযাপন যেভাবে শুরু


খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার সালে প্রাচীন ব্যাবিলনে নতুন বছর শুরু হতো নতুন চাঁদ দেখা সাপেক্ষে। পহেলা বৈশাখ বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাসের প্রথম দিন, তাই এটি বাংলা নববর্ষ। আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা হলো একটি নতুন হিসাব বই। এটা বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাঠের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া।

পহেলা বৈশাখ গ্রামীণ সমাজে চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলার মাধ্যমে পালন করা হলেও একশ বছর আগে এই উৎসব ছিল নগরজীবনে অনুপস্থিত। ঢাকায় আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। এরপর বিচ্ছিন্নভাবে পহেলা বৈশাখ পালন করা হলেও তা নগরজীবনে কিছুটা ব্যাপকতা পায় ষাটের দশকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি বিমাতসুলভ আচরণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে। তারই প্রতিবাদে ঢাকায় সংস্কৃতিকর্মীর সীমিত পরিসরে রমনা পার্কে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করে। ১৯৬৭ সাল ছায়ানট যুক্ত হয় এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সঙ্গে। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের পরিধিও বেড়ে যায়। স্বাধীনতার পর তা আরো ব্যাপকতা পায়। নব্বই দশকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শেষে সেনাশাসনের অবসানের পর বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়তে থাকে। এভাবেই পহেলা বৈশাখ আজকের সার্বজনীন রূপ লাভ করেছে।

রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা


রাজধানীতে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহ্বান। ১৯৬৭ সাল থেকে পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহ্বান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃতপক্ষে যে গাছের নিচে মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ।


ঢাকায় বৈশাখী উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ সকালে এই শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রায় সব শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় রং-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ।

নারায়ণগঞ্জে বর্ষবরণ

নারায়ণগঞ্জে পহেলা বৈশাখের উৎসব উদযাপনের কোন নিদিষ্ট মূল কেন্দ্র নেই। কখনও শহীদ মিনার কখনও চুনকা পাঠাগার কিংবা কখনও প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে শুরু হয় এই বর্ষবরণ উৎসব। নারায়ণগঞ্জে প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাবে ১৯৬৮ সালে বর্ষবরণ উদযাপন হয় ঢাকার সংস্কৃতিকর্মীদের সাথে মিল রেখে। সেইসময় এই আয়োজনে ছিলেন আমজাদ হোসেন, শাহেদ আলী মজনু, করুণাময় গোস্বামী, বুলবুল চৌধুরী প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধের পর সাংস্কৃতিক সংগঠন পলাশের উদ্যোগে ১৯৭৬ সাল থেকে বর্ষবরণ উৎসব হয়। পরে ১৯৮১ সালে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট গঠন হলে জোটের আয়োজনে নারায়ণগঞ্জে বর্ষবরণ উৎসব শুরু হয়। 

নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে এখানে পুরোনো বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।তখন এই আয়োজনের সামনের কাতারে ছিলেন রফিউর রাব্বি, বংশী সাহা, মফিজুল ইসলাম সারু প্রমুখরা। প্রতিবছর নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের এই উৎসবে থাকে মঙ্গল শোভাযাত্রা, গান, আবৃত্তি, আলোচনা সভা সহ বিভিন্ন আয়োজন।

পার্বত্য জেলায় আদিবাসীদের বর্ষবরণ

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে। ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিসত্ত্বা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি।

 

সব খবর