শুক্রবার ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮

বন্দর গণহত্যা ও একটি সিরাজদ্দৌলা ক্লাব

মঙ্গলবার, ৩ এপ্রিল ২০১৮, ১৩:১৩

রফিউর রাব্বি

শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ শহর, পূর্ব পাড়ে বন্দর। একসময় বন্দর পাটের কল, জাহাজ নির্মাণের ডকইয়ার্ড ও খাদ্য গুদামের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। বৃটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলে ইংরেজ ও আর্মেনিয়দের প্রায়ই দেখা গেলেও অবাঙালি বিহারিদের পদচারণা কখনোই ছিল না। কিন্তু সাতচল্লিশে দেশ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টির পর রেডক্রসের উদ্যোগে বন্দরের বিভিন্ন স্থানে অবাঙালি বিহারিদের রিফিউজি ক্যাম্প স্থাপিত হয়। পরে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পেতে এমন দাঁড়ায় যে কিছু কিছু পাড়া-মহল্লা ও এলাকা তারা দখলে নিয়ে নেয়।

একাত্তরের ২৫ মার্চ ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ শুরু হলে এর দুইদিন পর ২৭ মার্চ পাক-হানাদার বাহিনী নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রবেশ করতে চাইলে শহরে প্রবেশের পথে মাসদাইর কবরস্থানের কাছে তারা প্রথম প্রতিরোধের মুখে পড়ে। সেখানে একজন পাক সেনা নিহত হলে হানাদার বাহিনী সেখানে বিভিন্ন বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করে, মসজিদের ভিতর থেকে ধরে এনে ও বিভিন্ন বাড়িতে হামলা চালিয়ে প্রায় ৪০ জন নিরীহ সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। পরদিন সকালে তারা ভারি অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে শহরে প্রবেশ করে।

৪ এপ্রিল পাক-হানাদার বাহিনী শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড়ে বন্দর প্রবেশ করে। তারা ভোররাতে বিহারিদের সহায়তায় নবীগঞ্জঘাট ও কেরাসিনঘাট- দুই দিক দিয়ে একসঙ্গে বন্দরে প্রবেশ করে। নবীগঞ্জ দিয়ে পাড় হওয়া গ্র“পটি ইস্পাহানী ও জেলেপাড়ার বহু বাড়ি-ঘর গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় এবং এ এলাকা থেকে বহু লোককে ধরে বন্দর সিরাজদ্দৌলা ক্লাব মাঠে এনে হাজির করে। ক্লাব মাঠে আসতে তারা আরো বহু বাড়ি-ঘর গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। কেরাসিনঘাট দিয়ে পাড় হওয়া গ্র“পটি ডকইয়ার্ডে উঠে সামনে অগ্রসর হয়ে হিন্দুঅধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়। তারা লালজির আখড়া ও বৃন্দাবন আখড়া গানপাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে বহু লোককে ধরে সিরাজদ্দৌলা ক্লাব মাঠে এনে হাজির করে। উভয় গ্র“পই সকাল ন’টার মধ্যে ক্লাব মাঠে এসে পৌঁছায়। হানাদার বাহিনী সে সময় মাঠের ক্লাব ঘরে আশ্রয় নেয়া সাধারণ মানুষ ও ধরে আনা বন্দিদের মোট ৫৮ জনকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে প্রথমে গুলি করে হত্যা করে। পরে আশপাশের বাড়িঘর থেকে মূলিবাঁশের বেড়া ও কাপড়-চোপড় এনে লাশের উপরে ফেলে গানপাউডার দিয়ে তা জ্বালিয়ে দেয়। বিকেলে হানাদার বাহিনী শীতলক্ষ্যা পাড় হয়ে শহরে চলে আসে। বন্দর বিরাণভূমিতে পরিণত হয়। বাড়ি-ঘর ফেলে অধিকাংশ মানুষ দিগি¦দিক পালাতে থাকে। লাশের স্তূপ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসে বেঁচে যাওয়া মুজিবুর রহমান কচি। পোড়া বাড়ি-ঘর ও মৃত মানুষের গন্ধে বন্দরের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। রাতে ক্লাব মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে এলাকাবাসী ৫৪ জন হিন্দু-মুসলমান শহীদদের একসাথে গণ-কবর দেয়।

১৯৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি আইয়ূব খানের পতন হলে সে বছর একুশে ফেব্র“য়ারির দিন সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের সদস্যরা বন্দরে বিভিন্ন বাড়ি-ঘর ও দোকান-পাটে কালো পতাকা উড়িয়ে দেয়। বন্দরে বসবাসরত বিহারিদের নেতা আইয়ূব মাষ্টারের আইয়ূব রেস্টুরেন্টেও ক্লাব সদস্যরা কালো পতাকা উত্তোলন করে। কিছুক্ষণ পর আইয়ূব মাষ্টার কালো পতাকা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলে ক্লাব সদস্যদের নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ জনতা আইয়ূব রেস্টুরেন্ট ও কনভেনশন মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সচিব মোহাম্মদ আলীর বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। (মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আইয়ূব মাষ্টার ও মোহাম্মদ আলীর বাড়ি বন্দরে হানাদারদের কনসালট্রেশন ক্যাম্প হিসেবে পরিচালিত হয়।) একাত্তরে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে মার্চের ১৭-১৮ তারিখ সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের নেতৃত্বে বন্দরে প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। এ প্রতিরোধ কমিটি বিহারিদের কাছ থেকে প্রায় চল্লিশটি রাইফেল-বন্দুক ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একটি অস্ত্রভান্ডার গড়ে তোলে। ২৫ তারিখ যখন ঢাকায় অপারেশন সার্চ লাইট চলে বন্দরে তখন সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের মাঠে মঞ্চস্থ হয় সাত্তার ভূইয়া রচিত ও এস এম ফারুক পরিচালিত ‘অমর বাঙালি’ নাটক। এসব কারণে বিহারিদের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল সিরাজদ্দৌলা ক্লাব।
১৭৫৭ সালে সিরাজদ্দৌলাকে হত্যা করা হলেও বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে যিশুর মতো সিরাজের পুনরুত্থান ঘটেছে। বন্দরে পুনরুত্থান ঘটেছে ’৬৯ ও ’৭১-এ। হয়তো আবারো পুনরুত্থান ঘটবে এদেশের কোথাও। দীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারিত হবে,

‘পূর্ণ স্বাধীনতা মিললো কই?
কই মিললো ক্ষুধা থেকে মুক্তি,
দারিদ্র থেকে মুক্তি
মুক্তি রূঢ় শোষণ থেকে।’

সব খবর