বুধবার ১৪ নভেম্বর, ২০১৮

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রথম প্রতিবাদী সংকলনে না.গঞ্জের ২ সাহিত্যিক

মঙ্গলবার, ১৪ আগস্ট ২০১৮, ২১:২০

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ভয়াবহ একটা গুমট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো সারাদেশে। সেই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড এতোটাই নৃশংস ছিলো যে হতবিহবল বিমূঢ় মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক শোক প্রকাশও ছিলো তখন রীতিমতো দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। ঘাতক সেনানিয়ন্ত্রিত সরকারের দুঃশাসন এবং পরবর্তীতে সামরিক শাসকের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কর্মকাণ্ডে সৃষ্টি হয়েছিলো নৈরাশ্যের দমবন্ধ এক গুমট পরিস্থিতির। সামরিক শাসকের লিখিত ও অলিখিত ভীতি আর বাধ্য-বাধকতার ভেতরে বাংলাদেশের মানুষ পার করছিল এক পাথারচাপা সময়। সে পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার তো দুরের কথা এই হত্যান্ড নিয়ে একটি কথা বলার লোকও ছিল না। কারণ সারা দেশে ছিল সামরিক জান্তা।এক অলিখিত অধ্যাদেশ জারি ছিল বাংলাদেশে। দেশে বিরাজ করছিল কবরের হিমশীতল নিরবতা। সেই হিমশীতল নিরবতা পাশ কাটিয়ে কথা বলাটা তখন কেবল দুঃসাহসের বিষয়েই ছিল না ছিল মৃত্যুর পরোয়ানা।

সে সময় কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে গুটিকয়েক কবি-সাহিত্যিক-ছড়াকার একটি দুঃসাহসিক কাজ করে ফেললেন। সমগ্র ভয়-ভীতিকে সঙ্গে করে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধুকে বিষয় করে রচিত একগুচ্ছ ছড়া আর কবিতার অনন্য সাধারণ সংকলন ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ প্রকাশ করলেন। ঐতিহাসিক এই সংকলনটির প্রকাশক হিশেবে ‘সূর্যতরুণ গোষ্ঠী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’-এর নাম মুদ্রিত হয়েছিলো। এই নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন কোনো সংগঠন না থাকলেও প্রকাশক পরিচয়টি আংশিক সত্য ছিলো। কারণ এই সংকলনটির যাবতীয় কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের ১০২ নম্বর কক্ষ থেকে। কক্ষটি বরাদ্দ ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল আজীজের নামে। কেন্দ্রীয় খেলাঘরের মেধাবী ও উদ্যমী তরুণ-সংগঠক আবদুল আজীজ। এককভাবে সংকলনটির কোনো সম্পাদক না থাকলেও এই সংকলনের নেপথ্য কর্মী বা কলাকূশলীদের নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল আজীজ। সংকলনটি প্রকাশের পরিকল্পনা, লেখা সংগ্রহ, ছাপাখানা নির্ধারণ, মুদ্রণ ব্যয় যোগাড়, প্রচ্ছদ নির্মাণ, প্রচ্ছদ প্রসেস, ছাপা, বাঁধাই এবং বিতরণের ব্যাপারে আবদুল আজীজের সতর্ক পরিকল্পনায় ছিলো দুর্দান্ত রকমের ছক। কারণ প্রতিটি ক্ষেত্রেই গোপনীয়তা রক্ষাই ছিলো সাফল্যের প্রধান শর্ত।

সংকলনের লেখা সংগ্রহের আগে বঙ্গবন্ধুপ্রেমী লেখক-কবিদের নামের একটি তালিকা প্রনয়ন করেন তাঁরা। সিদ্ধান্ত হয় কোনো লেখক ছদ্মনাম ব্যবহার করতে পারবেন না। হয় স্বনামে লিখবেন নইলে লিখবেন না। লেখা সংগ্রহে দায়িত্ব পালন করেন মূলত দু’জন—আলতাফ আলী হাসু এবং সিরাজুল ফরিদ।

এই সংকলনে তাঁদের লেখাই নেয়া হয়েছিলো প্রতিকূল সময়েও যাঁরা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিলেন। লেখা চাইতে গিয়ে বা সংগ্রহ করতে গিয়ে বিদ্রুপের সম্মুখিনও হতে হয়েছে উদ্যোগতাদের। প্রতিষ্ঠিত অনেক লেখক সরাসরি অসম্মতিও জানিয়েছেন। কিন্তু পরর্তীতে তাঁরা বাতাস বুঝে নৌকায় উঠেছেন। সংকলনের অন্যতম নেপথ্য কর্মী ভীষ্মদেব চৌধুরী ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’ শিরোনামের স্মৃতিকথায় জানাচ্ছেন—‘...অনেক প্রতিষ্ঠিত কবিই সেদিন বঙ্গবন্ধু স্মরণে কবিতা লিখতে অপারগতা বা উন্নাসিকতা প্রদর্শন করেন—যাঁদের প্রায় প্রত্যেকেই পরবর্তীকালে রাজনৈতিক হাওয়া বদলের আনুকূল্যে বঙ্গবন্ধু স্মরণে কবিতা লিখে দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছেন।...কথাসাহিত্যিক রাহাত খান ও মাহমুদুল হক সম্ভবত এ লাশ আমরা রাখবো কোথায় সংকলনে জীবনের প্রথম কবিতাটি লিখেছেন। অন্তর্গত তাগিদ ও দায়িত্ববোধ না থাকলে একজন অবিমিশ্র কথাসাহিত্যিকের পক্ষে কবিতা রচনা বিরল এমন কি তুলনারহিত ঘটনা।

কারা কারা লিখেছিলেন সেই ঐতিহাসিক সংকলনে? মুদ্রিত প্রকাশনার পৃষ্ঠাক্রম অনুসারে লেখক তালিকাটা ছিলো এরকম—অন্নদাশঙ্কর রায়, দিলওয়ার, হায়াৎ মামুদ, রাহাত খান, মাশুক চৌধুরী, ফরিদুর রহমান বাবুল, সুকুমার বড়ুয়া, মোহাম্মদ মোস্তফা, মাহমুদুল হক, আমিনুল ইসলাম বেদু, নির্মলেন্দু গুণ, তুষার কর, আলতাফ আলী হাসু, মোহাম্মদ রফিক, আবদুল আজীজ, শান্তিময় বিশ্বাস, আখতার হুসেন, ভীষ্মদেব চৌধুরী, জিয়াউদ্দীন আহমদ, জাহিদুল হক, ইউসুফ আলী এটম, সিরাজুল ফরিদ, ফজলুল হক সরকার, মহাদেব সাহা, জাফর ওয়াজেদ, লুৎফর রহমান রিটন, নূর-উদ-দীন শেখ, ওয়াহিদ রেজা, কামাল চৌধুরী এবং খালেক বিন জয়েনউদ্দীন।

কবি শামসুর রাহমানের একটি কবিতার শিরোনামকেই বেছে নেয়া হয়েছিলো সংকলনের নাম হিশেবে। বঙ্গবন্ধুকে বিষয় করে রচিত একগুচ্ছ ছড়া আর কবিতার অনন্য সাধারণ সংকলন ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়’।এই সংকলনের সাথে যুক্ত ছিলেন নারায়ণগঞ্জের ২জন লেখক। একজন হলেন দৈনিক দেশের আলোর নির্বাহী সম্পাদক ছড়াকার ইউসুফ আলী এটম, আরেক জন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব রফিউর রাব্বির ভাই কবি ওয়াহিদ রেজা। ‍কবি ওয়াহিদ রেজা ২০১৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি হৃদ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

সূত্রঃ বঙ্গবন্ধু সমগ্র/লুৎফর রহমান রিটন, প্রচ্ছদ ধ্রুব এষ, প্রকাশক কথা প্রকাশ, প্রকাশকাল ২০১৭।

এ বিষয়ে ইউসুফ আলী এটম বলেন, ‘আমরা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন ওয়াহিদ রেজা, হালিম আজাদ, আমরা একটা গ্রুপ ছিলাম। ৭৮ সালে আব্দুল আজিজের নেতৃত্বেই মূলত এই সংকলনটি বের হয়। তখন তো খুব গোপনীয়তার সাথে এটা নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। তখন অনেকেই আবার লেখা দিতেও সম্মতি দেননি। মনে ভয় তো আমাদেরও কাজ করতো। তবুও একটা উত্তেজনা কাজ করতো আমাদের মধ্যে। সেই উত্তেজনা থেকেই সংকলনে লেখা দিয়েছিলাম। সংকলন বের করার পর বিক্রি করার সময় আমাদের মধ্য থেকে একজনকে এক গোয়েন্দার লোক ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর যদিও তাকে ছাড়িয়ে আনা হয়। আসলে এমন অনেক প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করেই আমরা ওই সংকলনটি বের করেছিলাম।’

কবি ওয়াহিদ রেজার ভাই রফিউর রাব্বি বলেন, তখন নারায়ণগঞ্জে অনেক লেখকদের আসা যাওয়া ছিল। তাদের মাধ্যমেই ওয়াহিদ রেজা তার কবিতাটি সংকলনে দিয়েছিল। তখন পরিস্থিতি অতোটা অনুকূল ছিল না। আমরা রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। আমাদের বাবা রাজনীতি করতেন। যার ফলে পরিবারের সবারই বঙ্গবন্ধুর প্রতি অন্য রকম অনুভূতি কাজ করতো। তাই সাহসের কোনো কমতি ছিল না।’

সব খবর
শিল্প ও সাহিত্য বিভাগের সর্বশেষ