সোমবার ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

বক্তাবলী গণহত্যা ও প্রতিরোধ দিবস

বুধবার, ২৯ নভেম্বর ২০১৭, ১৩:১৪

রফিউর রাব্বি

১৯৭১-এর ২৯ নভেম্বরের রাত। ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে আছে নারায়ণগঞ্জের পশ্চিমাঞ্চল ধলেশ্বরীর পাড় ধরে বক্তাবলীর বাইশটি গ্রাম। বক্তাবলী ও আলীরটেক দুটি ইউনিয়নের সমন্বয়ে বক্তাবলী পরগনা। তখন ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সিগঞ্জের দিকে সরে যাওয়ার নিরাপদ যাত্রাপথটিও ছিল এই বক্তাবলী। বক্তাবলীর পূর্বে ও দক্ষিণে ধলেশ্বরী আর উত্তরে বুড়িগঙ্গা নদী। দক্ষিণ আমেরিকার আটলান্টিকের পাড়ে লম্বা সরু দেশ চিলির মতো এ বক্তাবলী। দুই নদীর মাঝখানে বক্তাবলীর বাইশটি গ্রাম যেন দুপুরের ঘাসের ওপর বিছিয়ে রাখা মায়ের ভেজা কাপড়।

নারায়ণগঞ্জ শহরের কয়েকজন রাজাকারের সহযোগিতায় এই ২৯ নভেম্বর রাত প্রায় সাড়ে তিনটায় পাকবাহিনী তিনদিন থেকে ঘিরে ফেলে গোটা বক্তাবলীকে। গানবোট নিয়ে ধলেশ্বরীর বুকে তারা অবস্থান নেয়। সুবেহসাদেকের সময় বক্তাবলীর চরে গানবোট ভিড়িয়ে নদীর পাড়ে নামতে থাকে পাকসেনারা। কিন্তু ঘন কুয়াশার ফলে তারা গ্রামে অগ্রসর হতে সাহস করে না। তখন মুক্তারকান্দি প্রাইমারি স্কুল ও কানাইনগর হাই স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি ক্যাম্প ছিল। নদীর পাড়ে অবস্থিত ডিক্রির চর মসজিদ ও বিভিন্ন বাড়িতে রাত কাটাতেন মুক্তিযোদ্ধারা। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের উপস্থিতি সাথে সাথেই টের পেয়ে যান এবং প্রতিরোধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। কুয়াশা একটু কাটতে থাকলে কুঁড়ের পাড় অঞ্চলের নদীর কাছ থেকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে প্রথমে গ্রামের দিকে অগ্রসর হতে থাকে পাকবাহিনী। তখন মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ শুরু করে। সকাল তখন প্রায় সাড়ে সাতটা। এখানে উল্লেখ্য মাহফুজুর রহমান পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের প্রথম চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। প্রতিরোধের শুরুতেই পাঁচজন পাকসেনাকে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধারা এবং আহত হয় বেশ কিছু পাকসেনা। পাকসেনারা পাঁচটি লাশ ও আহত দুই জনকে কাঁধে নিয়ে পিছু হটে যায়। এখানে প্রায় দুই ঘণ্টা প্রতিরোধ যুদ্ধ চলে। এ দুই ঘণ্টা প্রতিরোধের কারণে বক্তাবলীর গ্রামগুলো থেকে পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষ মুন্সিগঞ্জ ও বিভিন্ন অঞ্চলে সরে যেতে সক্ষম হয়। এর পরপরই পাকবাহিনী ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্রামগুলোর ওপর। পাকবাহিনীর আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের মুখে মুক্তিবাহিনী বাধ্য হয়ে পিছু হটে। আর তখনই শুরু হয় পাকবাহিনীর তান্ডব। তারা ডিক্রির চর নদীর পাড়ে সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে একসাথে হত্যা করে চল্লিশ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে। লক্ষ্মিনগর কবরস্থানের কাছে খড়ের পাড়ার ভেতরে আশ্রয় নেয়া দলবদ্ধ নিরীহ গ্রামবাসীদের আগুনে জ্বালিয়ে হত্যা করে। শীতের সকালে রাজাপুরের হলুদ সরিষা ক্ষেত লাল হয়ে ওঠে, পড়ে থাকে লাশের পর লাশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র শহীদুল্লাহ্, মুনীরুজ্জামানসহ বহু ছাত্র আর সাধারণ কৃষককে হত্যা করে তারা। বক্তাবলীতে ১৩৯ জনকে হত্যা করে পাকবাহিনী। বক্তাবলী পরগনার বাইশটি গ্রামই গানপাউডার দিয়ে বিকেলের মধ্যেই জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দেয় পাকসেনারা।

দেশে যে কয়টি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে বক্তাবলী তার মধ্যে অন্যতম। এখানে প্রতিরোধ হয়েছে, পাকসেনাদের হত্যা করা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ হয়েছেন। অথচ কি নির্মম আমাদের বাস্তবতা, আজ চল্লিশ বছর পরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ছাত্রদের তালিকায় যেমন এ বক্তাবলীর শহীদদের নাম নেই, স্থানীয় জেলা প্রশাসনের শহীদদের তালিকাতেও এ ১৩৯ জনের একজনেরও নাম নেই। অথচ এ একটি মাত্র অঞ্চল যেখানে কোনো একজনও রাজাকার বা স্বাধীনতা-বিরোধী ছিল না। এ বাইশটি গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাস নিজেরা খেয়ে না খেয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও আশ্রয় নেয়া মানুষদের খাইয়েছেন, আশ্রয় দিয়েছেন। এ গ্রামগুলোর ছাত্র, শিক্ষক, চাষাভূষা- প্রতিটি মানুষই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা।

সন্তানহারা, পিতাহারা, স্বজনহারা সে শহীদ পরিবারগুলোতে এখনও আহাজারি, বুকফাটা আর্তনাদ। আজ বেঁচে থাকার জন্যে, টিকে থাকার জন্যে প্রাণপণ লড়াই করেও মানবেতর জীবনযাপন করছে শহীদ পরিবারগুলো। একথা সত্য যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কোন ভূমিকা নেই। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদগুলোতে আমরা দেখে আসছি বিএনপি’র শাসনামলে সংসদ কার্যালয়ে জিয়াউর রহমানের ছবি তুলে তাদের জিন্দাবাদ ধ্বনি দিতে, স্বৈরশাসক এরশাদের সময় এরশাদের ছবি তুলে তার গুণগান করতে, আজ বঙ্গবন্ধুর ছবি তুলে জয়বাংলা ধ্বনি তুলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন। ছবি ওঠানো আর নামানোর রাজনীতি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তত বেরিয়ে আসতে হবে। ইতিহাস বিকৃতির দায় বিএনপি, জামায়াত আর স্বাধীনতা বিরোধীরাই শুধু নেবে না- এ দায় তারাও এড়াতে পারেন না। কোনো একজন বলেছিলেন, ’৭১-এ যারা একবার রাজাকার-আলবদরে নাম লিখিয়েছেন তারা সারা জীবনই রাজাকার আর স্বাধীনতা বিরোধী। কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন বা ক্যাম্পে যেয়ে নাম লিখিয়েছেন তারা সারাজীবনই মুক্তিযোদ্ধা নন। দেশের ক্রান্তিলগ্নে পদে পদে তাদের দেশপ্রেমের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মুক্তিযোদ্ধা থাকতে হয়। মুক্তিযুদ্ধ করেও যারা পরবর্তীতে জামায়াতের রাজনীতিতে নাম লেখান তারা মুক্তিযোদ্ধা থাকেন কি করে?

প্রতিদিন মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারগুলোর জন্য সরকারের এত প্রতিশ্রুতির জোয়ার ওঠলেও জোয়ারের সে ঢেউ আজো বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরীর পাড়ে শহীদদের গ্রাম বক্তাবলীতে এসে আঘাত করেনি। এ এক নিদারুন দুঃখ ধলেশ্বরী পাড়ের শহীদ পরিবার গুলোর শুধু নয়, গোটা বক্তাবলী পরগনার।

 
সব খবর
ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ বিভাগের সর্বশেষ