সোমবার ২৭ মে, ২০১৯

ফতুল্লায় নিখোঁজ মাজেদ আলী হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা

মঙ্গলবার, ১৪ মে ২০১৯, ১৯:২৩

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: ফতুল্লায় নিখোঁজ হওয়া পাবনার বাসিন্দা মো. মাজেদ আলী হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে ব়্যাব-১১৷ মাজেদ আলীকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে স্বীকার করেছে গ্রেফতারকৃত মূল হত্যাকারীসহ ৩ আসামি৷

মঙ্গলবার (১৪ মে) দুপুরে ব়্যাব-১১ এর অধিনায়ক লে. কর্ণেল কাজী শামসের উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়৷

ব়্যাব জানায়, গত ১৩ মার্চ নাজমা বেগম (৩৫) নামের পাবনার এক মহিলা অধিনায়ক, র‌্যাব-১১ নারায়ণগঞ্জ বরাবর একটি অভিযোগনামা দেন৷ যাতে উল্লেখ ছিল, তার স্বামী মো. মাজেদ আলী গত ১০ মার্চ সন্ধ্যা ৬টার পর হতে নিখোঁজ রয়েছে। এ সংক্রান্ত তিনি ফতুল্লা থানায় একটি জিডি করেন (জিডি নং -৬৩৪)। অভিযোগে উল্লেখ্য তারা স্বামী-স্ত্রী বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্যে মহিউদ্দিন বুলু নামের এক আদম ব্যবসায়ীর কথায় পাবনা থেকে নারায়ণগঞ্জে আসে। বুলু তাদেরকে ফতুল্লার টাগারপাড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় রাখে। পাসপোর্ট, ভিসা, মেডিক্যাল ও বিভিন্ন কাজের কথা বলে বুলু তাদের কাছে থেকে ২ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেয়। বুলু তাদের বিদেশ না নিয়ে নানা ছলচাতুির করে কালক্ষেপন করতে থাকে। গত ১০ মার্চ মহিউদ্দিন বুলু বিকালে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে কৌশলে মাজেদ আলীকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। রাতে বুলু ফিরে আসলেও মাজেদ আলী আর ফিরে আসেনি। তখন থেকে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত আসলেও মাজেদ আলী বাসায় ফিরে না আসায় নাজমা বেগম স্বামীর জন্য কান্নাকাটি করলে আদম-বেপারী মহিউদ্দিন বুলু কৌশলে পালিয়ে যায় এবং নাজমা বেগমের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

অভিযোগের পর র‌্যাব-১১ এর একটি বিশেষ গোয়েন্দা দল নিখোঁজ মাজেদ আলীর সন্ধান ও সন্দেহভাজন মহিউদ্দিন বুলুকে গ্রেফতারের জন্য গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে। বেশ কয়েকটি স্থানে অভিযান চালিয়ে গত ৮ এপ্রিল তাকে আটক করা হয়৷

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত মহিউদ্দিন বুলুকে নিখোঁজ মাজেদ আলীর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করে। কিন্তু অভিযুক্ত মহিউদ্দিন বুলুর ও নিখোঁজ মাজেদ আলীর মোবাইল কল লিষ্ট ও ঘটনার দিনে তাদের গতিবিধি পর্যালোচনা করে দেখা যায় ঐ দিন তারা নারায়ণগঞ্জ থেকে বিকালে দাউদকান্দি ব্রীজ এলাকায় ও সন্ধ্যায় মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানাধীন মেঘনা নদীর তীর এলাকায় অবস্থান করে। পরবর্তীতে অভিযুক্ত মহিউদ্দিন বুলু নারায়ণগঞ্জে ফিরে আসলেও নিখোঁজ মাজেদ আলীর ব্যবহৃত মোবাইলটি ঐ এলাকা থেকে বন্ধ পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকার সোহেল নামক এক নৌকার মাঝির নাম পাওয়া যায়। সে, তার এলাকা ভাটেরার চর ও দাউদকান্দি বাজারের মধ্যে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় যাত্রী আনা-নেওয়া করে। গোপন সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন অর্থাৎ ১০ মার্চ আদম বেপারী মহিউদ্দিন বুলু নিখোঁজ মাজেদ আলী ও অজ্ঞাত এক লোককে নিয়ে সোহেল মেঘনা নদীতে নৌকা চালিয়ে ছিল৷ এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব-১১ এর একটি বিশেষ আভিযানিক দল গত ১০ মে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি বাজার ঘাট হতে নৌকার মাঝি সোহেলকে (২১) আটক করে এবং তার নৌকাটি জব্দ করা হয়। গ্রেফতারের পর র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নৌকার মাঝি সোহেল ঘটনার লোমহষর্ক বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দী প্রদান করে এবং জানা যায় আদম-বেপারী মহিউদ্দিন বুলু ও বাবু একত্রে সোহেলের নৌকায় মাজেদ আলীকে পাশবিক নির্যাতন করে, গলা টিপে ও নাক-মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে মেঘনা নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয়।

সোহেলের জবানবন্দী থেকে জানা যায়, দাউদকান্দি থানাধীন চরকাটালী এলাকায় সোহেলের বাড়ি। সে দাউদকান্দি বাজার হতে চরকাটালী এলাকায় গোমতী নদীতে নৌকা চালায়। সুলতান মাহমুদ বাবু নামক এক ব্যক্তিকে তার এলাকায় বিয়ে করার সূত্রে এলাকার জামাই হিসেবে চিনে। সুলতান মাহমুদ বাবুর বাড়ি গজারিয়া থানার গোয়াগাছিয়া এলাকায়। ঘটনার দিন সকালে বাবু ১ হাজার টাকা ভাড়ায় সারাদিনের জন্য সোহেলের নৌকাটি ভাড়া করে। আনুমানিক সকাল ১১ টায় দাউদকান্দি হতে বাবু নৌকায় গজারিয়ার কালিরবাজার এলাকায় আসে। নৌকার মাঝি সোহেল ও বাবু সেখানে দুপুরে আহার করে। দুপুরের পর বাবু সোহেলকে কালিরবাজার হতে চাষীর দিকে যেতে বলে। বিকাল ১৫৩০ ঘটিকায় তারা দাউদকান্দি ব্রীজের পশ্চিম পার্শ্বে চাষীর বালুর মাঠে নৌকা ভিড়ালে বাবুর পরিচিত আরো দুইজন ব্যক্তি নৌকায় উঠে। তাদের আলাপ কালে সোহেল জানতে পারে তাদের একজনের নাম বুলু ও অপর জনের নাম মাজেদ। নৌকায় উঠার পর বুলু সোহেলকে বেলতলী মাজারের দিকে যেতে বলে। সেখানে কিছুক্ষন থাকার পর বাবু, বুলু ও মাজেদ নৌকায় উঠে গোয়াগাছিয়া বালু মহলের দিকে নৌকা চালাতে বলে। সেখানে পৌঁছে তারা তিন জন বালু মহলে উঠে ঘুরতে থাকে। পরে সন্ধ্যায় অন্ধকার নেমে আসলে বুলু ও বাবু পাশবিক নির্যাতন করে মাজেদকে৷ মাজেদের গলা টিপে ও নাক-মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে তারা৷ হত্যার পর তার লাশ নদীতে ফেলে দেয়৷

গ্রেফতারকৃত সুলতান মাহমুদ বাবুকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ঘটনার মূল অভিযুক্ত মহিউদ্দিন বুলু ও সুলতান মাহমুদ বাবু দুই জনই গোয়াগাছিয়া এলাকার দূর সম্পকীয় আত্মীয় ও সম্পর্কে মামা-ভাগিনা। ঘটনার কয়েক দিন আগে বুলু এক লোককে মারার জন্য তার সহযোগিতা চায় এবং সহযোগিতা করলে এক লক্ষ টাকা দিবে বলে আশ্বাস দেয়। টাকার লোভে বাবু রাজি হয় এবং দুইজন মিলে ঐ লোককে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বাবু তার শ্বশুর বাড়ির এলাকা হতে তার পূর্ব পরিচিত সোহেলের নৌকা ভাড়া করে। অন্য দিকে বাবু মাজেদকে নৌকায় করে নদীতে ও চরে ঘুরতে নিয়ে যাবে বলে কৌশলে ফুসলিয়ে ফতুল্লা ভাড়া বাসা থেকে নিয়ে যায়। দুইজন মিলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠান্ডা মাথায় মাজেদ আলীকে হত্যা করে মেঘনা নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয়।

সব খবর
নগরের বাইরে বিভাগের সর্বশেষ