সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পুলিশি নির্যাতনে ধর্ষণ ও হত্যার স্বীকারোক্তি: অভিযোগ স্বজনদের

সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২০, ১৬:৫৭

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: পুলিশের নির্যাতনের মুখে ধর্ষণ ও হত্যার স্বীকারোক্তি দিয়েছে বলে অভিযোগ স্কুল ছাত্রী জিসা মনি নিখোঁজের ঘটনায় গ্রেফতার তিন আসামির স্বজনরা। তারা বলছেন, জিসা মনি হত্যা হয়নি। কিংবা তাকে নির্যাতনও করা হয়নি। সে অন্য এক ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছিল। অথচ তাকে অপহরণের দায়ে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে পুলিশি নির্যাতনের মুখে তাদের দিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ মডেল থানার সামনে জিসা মনিকে অপহরণের মামলায় গ্রেফতার যুবক আব্দুল্লাহ, তার বন্ধু রকিব ও নৌকার মাঝি খলিলের স্বজনদের সাথে কথা হয়। এ সময় তারা এই অভিযোগ করেন।

নগরীর দেওভোগ পাক্কা রোড এলাকার পঞ্চম শ্রেণির স্কুল ছাত্রী জিসা মনি (১৫) গত ৪ জুলাই নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুজির পর ১৭ জুলাই সদর মডেল থানায় একটি জিডি করেন জিসার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন। এক মাস পর ৬ আগস্ট একই থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় বন্দর উপজেলার বুরুন্ডি খলিলনগর এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আব্দুল্লাহ (২২) ও তার বন্ধু বুরুন্ডি পশ্চিমপাড়া এলাকার সামসুদ্দিনের ছেলে রকিবকে (১৯)। ওইদিনই তাদের গ্রেফতার করা হয়। একই ঘটনায় দুই দিন পর গ্রেফতার করা হয় বন্দরের একরামপুর ইস্পাহানি এলাকার বাসিন্দা নৌকার মাঝি খলিলকে (৩৬)।

গত ৯ আগস্ট পুলিশ জানায়, জিসা মনিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয় আসামিরা। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় এই ঘটনা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে বলেও জানায় পুলিশ। অথচ গত ২৩ আগস্ট দুপুরে বন্দরের নবীগঞ্জ রেললাইন এলাকায় সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় পাওয়া যায় নিখোঁজ জিসা মনিকে। এ ঘটনায় চারদিকে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পুলিশের তদন্ত ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এদিকে আসামিদের স্বজনরা বলছেন, পুলিশি হেফাজতে অমানুষিক নির্যাতনের মুখে তারা ধর্ষণ ও হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। পুলিশ এই ঘটনা সাজিয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আল মামুন আসামির স্বজনদের কাছ থেকে অবৈধ উপায়ে কয়েক হাজার টাকা নিয়েছেন বলেও রয়েছে অভিযোগ।

গ্রেফতার আব্দুল্লাহ’র মা শিউলী আক্তার বলেন, আব্দুল্লাহ ওয়ার্কশপে কাজ করতো। আমার ছেলের একটি স্টেটমেন্ট ছিলো যে, আমি ওর সাথে ঘুরসি একসাথে। আর কিছু করি নাই। বিনা কারণে আমার ছেলেরে এত কিছু সহ্য করা লাগছে। যদি আমার ছেলে কিছু করতো তাহলে মেয়েটা জীবিত ফিরে আসলো কেমনে? আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শামীমকে দুই দফায় দশ হাজার টাকা দিয়েছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রথমে যখন ধইরা আনে তখন টর্চার যাতে না করে সেজন্য ৭ হাজার টাকা দিছি। পরে আরও ৩ হাজার টাকা দিছি। টাকা না দিলে তারে মাইরা ফালানোরও হুমকি দিছে। টাকা দেওয়ার পর সে (এসআই শামীম) কইছে আমার ছেলেরে মারবো না। কিন্তু তারে মাইরা মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেওয়াইছে। এই বলে কাঁদতে থাকেন তিনি।

নৌকার মাঝি খলিলের স্ত্রী শারমিন আক্তার বলেন, সন্দেহ কইরা আমার স্বামীরে ধইরা আনছে। পরে পুলিশ বলছে, ওই মেয়েরে নাকি আমার স্বামী মাইরা ফেলছে। এখন তো দেখতাছি এই মাইয়া বাঁইচা আছে। আমার স্বামীরে কেন পুলিশ ফাঁসাইলো সেইটা আমি জানতে চাই।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ছোটবেলা মা-বাপরে হারাইয়া আমি এতিম। স্বামী কামাইয়া না আনলে না খাইয়া থাকি। এই কয়টা দিন আমার তিনটা মাইয়া নিয়ে আমি মাইনষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছি। পোলাপান থুইয়া কাম কইরা যে খামু হেইডাও পারতাছি না।
এসআই শামীমের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন শারমিনও। তিনি বলেন, ‘টাকা না দিলে জেলে ভইরা দেওয়ার হুমকি দিছিল শামীম স্যার। টাকা না দেওয়ায় আমার স্বামীরে সারা রাইত ঝুলাইয়া পিডাইছে। এই কথা শোনার পর আমি অনেক কষ্ট কইরা সাত হাজার টাকা দিছি। আমার স্বামীরে যেন না মারে। কিন্তু তারা আমার স্বামীরে ফাঁসাইয়া দিল। এখন তো মাইয়া বাঁইচা আছে। তাইলে তারা মাইরা নদীতে কেমনে ফেললো?’

শারমিন আরও বলেন, ‘আমার স্বামী নির্দোষ, তারে ছাইড়া দেন। এই কথা বারবার পুলিশরে বলছি। তখন আমারে কইলো, বেশি কথা বইলো না। বেশি কথা বললে সবাইরে জেলে ঢুকাইয়া দিমু।’

একই অভিযোগ আরেক আসামি রকিবের ভাই সজিবেরও। তিনি বলেন, আমার ভাই ওইদিন ঘাটে মেয়েরে নামাইয়া দিয়া আসছে বলে জানাইছে। এরপর কিছু জানে না। কিন্তু পুলিশ তারে মার্ডার মামলার আসামি বানাইয়া দিল। তার জেল খাটতে হইতাছে। এর বিচার আমি চাই।

সব খবর
নগর বিভাগের সর্বশেষ