শনিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাঁচালি

শনিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:৪৩

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

রফিউর রাব্বি: ভাষা আন্দোলনের সূচনা ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগেরও আগে। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য চৌধুরী খালেকুজ্জামান হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত ‘ইত্তেহাদুল মুসলেমিন’ এর এক উর্দু সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে ‘উর্দুই পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হইবে’ বলে দাবি করার পর পরই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়ে যায়। পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য ও লেখালেখি আরম্ভ হয়, যা ‘ভাষা আন্দোলন পূর্ব তাত্ত্বিক লড়াই’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু দেশ বিভাগের পর সে তাত্ত্বিক লড়াই ভাষা আন্দোলনে রূপ নেয়। এই তাত্ত্বিক লড়াই পর্ব থেকেই নারায়ণগঞ্জ এর সাথে জড়িয়ে পড়ে। শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে অবস্থিত বিজলী প্রেস থেকে ‘কৃষ্টি’ নামে একটি সাময়িকী প্রকাশিত হত। সিতাংশু হালদার সহ চারজন এ সাময়িকীটি সম্পাদনা করতেন। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর (কার্তিক) সংখ্যায় ড. মুহম্মদ এনামুল হক-এর ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা কেন?’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি অসমাপ্ত ছিল এবং পরবর্তী দুই সংখ্যায় এটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মুসলিম লীগ সরকার এ প্রবন্ধ প্রকাশের দায়ে প্রেসটি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়। নারায়ণগঞ্জের এই ছোট্ট প্রেসের ছোট্ট কাগজটিকে অনেকেই ভাষা আন্দোলন বিষয়ে প্রথম পুস্তিকা বলে মনে করেন।

নারায়ণগঞ্জ ভাষা আন্দোলনে অগ্রগামী হলেও দীর্ঘদিন এখানে কেন্দ্রীয় কোন শহীদ মিনার গড়ে ওঠেনি। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার না থাকাতে তখন তোলারাম কলেজের শহীদ মিনারেই শহীদ দিবস ও বিভিন্ন দিবসে নারায়ণগঞ্জবাসীকে শহীদদের উদ্দেশ্যে পুষ্পস্তবক অর্পণের জন্য সমবেত হতে হতো।

১৯৮৩-র ফেব্রুয়ারির শুরুতে এরশাদের কিছু সাম্প্রদায়িক বক্তব্য ছাত্র-জনতা ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের উত্তেজিত করে তোলে। তিনি বলেন, ‘শহীদ মিনারে ফুল দেয়া মুসলিম সংস্কৃতি বিরুদ্ধ। এতে ফুল দেয়া যাবে না। কোরআন-খানি হবে’ ইত্যাদি। বিভিন্ন সংগঠন এর প্রতিবাদে কর্মসূচি গ্রহণ করে। ঢাকার প্রায় সবক’টি সাংস্কৃতিক, সাহিত্য ও নাট্য সংগঠন সম্মিলিতভাবে ‘একুশ উদযাপন কমিটি’ গঠন করে। যা এর পরের বছর এসে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটে রূপলাভ করে। নারায়ণগঞ্জে আমরা তখন সম্মিলিত ভাবে কর্মসূচি গ্রহণ করি। সরকার তখন শিক্ষা সংকোচনের উদ্দেশ্যে মজিদ খান শিক্ষা কমিশনের আলোকে একটি বিতর্কিত শিক্ষানীতি চালু করার উদ্যোগ নিলে ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্র অভ্যুত্থান ঘটে। শিক্ষাভবন ঘেরাও করতে গেলে সামরিক বাহিনীর গুলিতে বহু ছাত্র-ছাত্রী হতাহত হয়। জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দিপালী সাহা সহ ছয়জন মৃত্যুবরণ করেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ সংঘর্ষ চলে। ১৯৮৩-র একুশে হয়ে ওঠে তাৎপর্যপূর্ণ এবং একে কেন্দ্র করে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে গোটা জাতি। আমরা নারায়ণগঞ্জে তখন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের শূন্যতা তীব্রভাবে অনুভব করি। নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট থেকে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে ১৮ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচদিনব্যাপী অনুষ্ঠানে আমরা নারায়ণগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দাবীটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করি। ১৯৮৪ সালে একুশের অনুষ্ঠানের ঘোষণাতেও আমরা শহীদ মিনারের দাবীটি সামনে নিয়ে আসি এবং পরবর্তীতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক আহমদ মাহমুদুর রাজা চৌধুরীর সাথে দেখা করে আমরা শহীদ মিনারের দাবীটি জানালে তিনি জায়গা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন এবং কোথায় করতে চাই সে জায়গাটি প্রস্তাব করতে বলেন। আমরা তখন বিভিন্ন বিবেচনা থেকে চাষাড়ার মোড়ে অবস্থিত নার্সারিটিতে শহীদ মিনারের পরিকল্পনা গ্রহণ করি। এ জায়গাটি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার। আমরা নবনির্বাচিত পৌর চেয়ারম্যান নাজিমউদ্দিন মাহমুদের সাথে দেখা করে এ জায়গাটির অবস্থা জানতে চাই এবং সেখানে শহীদ মিনার গড়ার প্রস্তাব করি। এ জায়গাটিতে তখন উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড পৌরসভার কাছ থেকে ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে নার্সারি উদ্যান গড়ে তুলেছিল। পৌরসভা নোটিশ দেয়ামাত্র উঠে যাওয়ার ভিত্তিতে উদ্যান উন্নয়ন বোর্ডকে জায়গাটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে বলে পৌর কর্তৃপক্ষ আমাদের অবহিত করেন এবং তাদেরকে উঠে যাওয়ার জন্য অচিরেই চিঠি দেয়া হবে বলেও জানান। আমরা জেলা প্রশাসককেও এ জায়গাটি সম্পর্কে অবহিত করলে তিনি প্রথমে এ জায়গাতে শহীদ মিনার করার বিষয়ে রাজি হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সাথে আলাপ করে তিনি এ জায়গাটির ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেন। পরে শহীদ মিনারের জায়গা নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি সভা হয়। সে সভায় তিনি এবং তাঁর সাথে নারায়ণগঞ্জের কেউ কেউ চাঁদমারীর ওখানে শহীদ মিনার করার বিষয়ে খুব জোরালো বক্তব্য রাখেন। আমরাও চাষাড়াতে শহীদ মিনার করার বিষয়ে অনড় থাকি। কারণ তখন চাষাড়ার এ জায়গাটি ছাড়া অন্য কোথাও শহীদ মিনার গড়ে তোলার দাবীটি যতটা ছিল আবেগ ও কল্পনাপ্রসূত ততটাই ছিল অবাস্তব। আমরা বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে নার্সারি উদ্যানের পক্ষেই আমাদের প্রস্তাবে দৃঢ় থাকি এবং কিছু ব্যক্তি এর বিরোধীতা করতে থাকেন। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা জায়গাটি খালি করার জন্যউদ্যান উন্নয়ন বোর্ডকে পর পর কয়েকটি চিঠি প্রদান করে। কিন্তু উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড সে জায়গাটি যথারীতি তাদের দখলে রেখে দেয়। আমরা চুরাশির বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে পুনরায় শহীদ মিনার স্থাপনের প্রস্তাব গ্রহণ করি। প্রস্তাবে বলা হয়, ‘আজকের এ সভা বহুবার সাংস্কৃতিক জোট থেকে বলার পরও স্থানীয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রসঙ্গে প্রশাসনের ঔদাসীন্যের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছে এবং অবিলম্বে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার স্থাপনের জোর দাবী জানাচ্ছে।’ সে সময়ে সাংস্কৃতিক জোটের নিয়ম অনুযায়ী এর স্থায়ী কোন কমিটি ছিল না। আমরা প্রতিটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আলাদা আলাদা কমিটি গঠন করে নিতাম। এর একজন আহ্বায়ক, একজন সদস্য সচিব ও জোটে অন্তর্ভুক্ত সংগঠনের একজন করে প্রতিনিধি আহ্বায়ক কমিটিতে যুক্ত থাকতেন। যেমন, শহীদ দিবসকে কেন্দ্র করে একুশ উদ্যাপন কমিটি করা হতো। শহীদ দিবসের অনুষ্ঠান সমাপ্ত হলে এ কমিটির আহ্বায়ক বা সদস্য সচিব স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের জন্য সভা আহ্বান করতেন। সে সভায় স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন কমিটি গঠিত হতো। এমনিভাবে স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন শেষ হলে সে কমিটির পক্ষ থেকে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের জন্য সভা আহ্বান করতো এবং নববর্ষ উদ্যাপন কমিটি গঠিত হতো। এমনিভাবে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। ১৯৮৪-এর বিজয় দিবস উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন অধ্যাপক বুলবুল চৌধুরী এবং আমি ছিলাম সদস্য সচিব। বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের পরদিন অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর বুলবুল চৌধুরীর স্বাক্ষরিত প্রস্তাবটি আমরা জেলা প্রশাসক ও পৌর চেয়ারম্যানকে প্রদান করি। এরপরে পৌরসভা থেকে উদ্যান উন্নয়ন বোর্ডকে চাষাড়া মোড় থেকে নার্সারি তুলে নেয়ার জন্য আবার একটি চিঠি প্রদান করে। আমরা একুশ উদ্যাপনের জন্য পৌর পাঠাগারের অফিস কক্ষে সভা করি ১৯৮৫-এর ২৪ জানুয়ারি সকালে। সে সভায় একুশ উদ্যাপন কমিটি গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক কাশেম হুমায়ূন ও আমি সদস্য সচিব। সে সভা শেষ করেই আমরা দুপুরে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় যাই। পৌরসভা ও নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের মধ্যে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সভাতে আমরা চেয়ারম্যান নাজিমউদ্দিন মাহমুদের কাছে একুশের আগেই শহীদ মিনার গড়ে তোলার বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানাই। আমরা ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সে জায়গাটিতে ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্ধারিত স্থান’ লেখা একটি সাইনবোর্ড স্থাপনের দাবী জানাই। আমরা বলি, পৌরসভাই জনপ্রতিনিধি হিসেবে এ কাজটি করবে বলে আশা করি। কিন্তু পৌরসভা এ কাজে অপারগ হলে নারায়ণগঞ্জবাসীকে সাথে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটই শহীদ মিনার স্থাপনের কাজকে বাস্তবায়ন করবে। সাইনবোর্ডটি নির্দিষ্ট সময়ে লাগানো হবে বলে পৌর চেয়ারম্যান আমাদেরকে আশ্বস্ত করেন। আমরা ৩ ফেব্রুয়ারি পৌর চেয়ারম্যানকে জোটের পক্ষ থেকে মফিজুল ইসলাম সারু সাক্ষরিত একটি চিঠি প্রদান করি। তাতে বলা হয়, ‘গত ২৪শে জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ প্রসঙ্গে পৌর কর্তৃপক্ষ ও নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আগামী ৫ই ফেব্রুয়ারিতে চাষাড়াস্থ উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড নার্সারি স্থানে শহীদ মিনারের নির্ধারিত স্থানের নামফলক স্থাপন করার জন্য আপনি আশ্বাস প্রদান করেন। আমরা আশা করি নির্ধারিত দিন উক্ত কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাজ শুরু করে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নারায়ণগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের চাহিদা পূরণে সফল হবে।’ কিন্তু পরিতাপের বিষয় পৌরসভা ৫ ফেব্রুয়ারি সাইনবোর্ডটি লাগাতে পারেনি। অবশেষে ১০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পৌর পাঠাগারে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে আমি নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের জনতার একটি প্রতিনিধি সভার আহ্বান করি। সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, ছাত্র, যুবক, মহিলা, শ্রমিক, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের জনতার প্রতিনিধি উপস্থিত হন। সে সভায় ভাষাসৈনিক শফি হোসেন খান সভাপতিত্ব করেন। সভায় পরবর্তী দিন অর্থাৎ ১১ ফেব্রুয়ারি সকালে নার্সারি উদ্যানে ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্ধারিত স্থান’ লেখা নামফলক স্থাপনের এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় ‘কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীনতার সপক্ষীয় প্রগতিশীল, রাজনৈতিক, ছাত্র-যুবক, কৃষক, শ্রমিক, মহিলা, শিক্ষক সংগঠন ও সর্বসাধারণের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট নেতৃত্ব দেবে।’ এর দু’বছর আগে যেহেতু ১৪ ফেব্রুয়ারি দেশে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে একটি ছাত্র অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছিল সেহেতু আমরা ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের জন্য ঐ দিনটিকেই বেছে নিলাম। ১১ ফেব্রুয়ারি আমরা পৌর পাঠাগার থেকে মিছিল করে চাষাড়া নার্সারি উদ্যানে যেয়ে ‘শহীদ মিনারের নির্ধারিত স্থান’ লেখা নামফলকটি স্থাপন করি এবং উদ্যান কর্তৃপক্ষকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জায়গাটি ছেড়ে দেয়ার দাবী জানাই। সেদিন সন্ধ্যার পূর্বেই উদ্যান কর্তৃপক্ষ চাষাড়ার জায়গাটি ছেড়ে চলে যায়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের বিষয়ে শহরে ব্যাপক মাইকিং করা হয় এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় পৌর পাঠাগারে সর্বস্তরের প্রতিনিধিদের জোটের পক্ষ থেকে আমি আরেকটি সভায় মিলিত হওয়ার অনুরোধ জানাই। সে সভায় জোটের পক্ষ থেকে আমি সভাপতিত্ব করার জন্য ভাষা সৈনিক একেএম শামসুজ্জোহার নাম প্রস্তাব করি এবং দেলোয়ার হোসেন চুন্নু এটি সমর্থন করেন। সে সভাতে একেএম শামসুজ্জোহা ও শফি হোসেন খান যৌথভাবে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন বলে আমরা ঐকমত্য হই। পরদিন ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে পৌর পাঠাগারের সামনে সর্বস্তরের জনতার সমাবেশ ঘটে। জোট থেকে ‘একটি শহীদ মিনারের জন্ম লগ্নে’ শিরোনামে একটি লিফলেট প্রকাশিত হয়। লিফলেটটি ছিল-

একটি শহীদ মিনারের জন্ম লগ্নে

একুশে ফেব্রুয়ারী বাংলা ভাষা ও বাঙ্গালীর সংস্কৃতির সকল জীর্ণতা ছিন্ন করে মুক্ত ধারা প্রবাহের এক উজ্জ্বল নির্দেশিকা। যা আমাদের স্বাধীনতার মতো বিজয়কেও সম্ভব করেছিল। তাই বাঙ্গালীর রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে শহীদ মিনার এক বিশাল অবয়ব। যার ব্যাপ্তি সমগ্র বাংলাদেশ, যার অস্তিত্ব প্রতিটি বাঙ্গালীর হৃদয়ে।

’৫২ থেকে ’৮৫, দীর্ঘ তেত্রিশ বছর পর বাঙ্গালী আজ যখন গণতন্ত্রের জন্যে সোচ্চার তখন নারায়ণগঞ্জে আমাদের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের জন্ম। নারায়ণগঞ্জের ছাত্র, শিক্ষক, যুবক, শ্রমিক, কৃষক, মহিলাসহ আমাদের সর্বসাধারণের দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা আজ আমরাই বাস্তবায়িত করলাম। এই শহীদমিনার আমাদের আজ সর্ব শোষণ থেকে মুক্তির প্রেরণা যোগাবে।

নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট

১৪ই ফেব্রুয়ারী ’৮৫

সকাল ১১টার দিকে ‘শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট’ লেখা ব্যানার নিয়ে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটি গাইতে গাইতে আমরা চাষাড়া নার্সারি উদ্যানে যাই। একেএম শামসুজ্জোহা ও শফি হোসেন খান যৌথভাবে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রর স্থাপন করেন। দুপুরে আমাদের এ শহীদ মিনারের সমর্থনে তোলারাম কলেজের ছাত্রদের একটি মিছিল কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন ভিপি শামীম ওসমানের নেতৃত্বে চাষাড়া গোল চত্বরে এসে অবস্থান গ্রহণ করে। আগে থেকে শহীদ মিনারের কোন মডেল তৈরি না থাকাতে তখন আমরা নিজেরাই সেখানে একটি মডেল ঠিক করে নেই। সোনারগাঁয়ের সাংসদ মোবারক হোসেন একটি মডেলের কথা বললে আমরা তাঁর মডেলটি গ্রহণ করি। একই সাথে সারাদিনে এইটির একটি কাঠামো তৈরি করা হয়। দুই দিকে কালো ও মাঝখানে লাল রঙ লাগিয়ে দেয়া হয়। রাতে এই শহীদ মিনারটি কে বা কারা ভেঙে ফেলতে পারে এরকম একটি সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা রাতে এটিকে পাহারা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। রাত ১১টা পর্যন্ত সেখানে দেলোয়ার হোসেন চুন্নু, আনোয়ার হোসেন, মফিজুল ইসলাম সারু, মোবারক হোসেন, আবদুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। পরে আমি ও মীর ওয়াহিদ সিদ্দিক সারা রাত পাহারায় ছিলাম। তখন শহীদ মিনারের এ কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন আনোয়ার হোসেন, মোহাম্মদ আলী মন্টু, মফিজুল ইসলাম সারু, কাশেম হুমায়ূন, বুলবুল চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন চুন্নু, মাহবুব কামরান, আবদুর রহমান, সুশান্ত সাহা, আসাদুজ্জামান, বিমান ভট্টাচার্য, মীর ওয়াহিদ সিদ্দিক, মোবারক হোসেন, সবুর খান সেন্টুসহ অনেকেই। এরপর এ শহীদ মিনারটিকে পূর্ণাঙ্গ করার জন্য আমরা পৌরসভাকে একটি চিঠি দেই এবং বিটিভির তৎকালীন চিফ ডিজাইনার শিল্পী আনোয়ার হোসেনকে দিয়ে শহীদ মিনারের একটি ডিজাইন তৈরি করে পৌরসভায় জমা দেই। তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে শহীদ মিনারের ব্যাপারটি চাপা পড়ে যায়। এরপর ৮৮ সালে পৌর নির্বাচনের নতুন তফসিল ঘোষিত হলে ওয়ার্ড বিভক্তিকে কেন্দ্র করে কতিপয় ব্যক্তিবর্গের মামলা দায়েরের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন স্থগিত হয়ে গেলে সরকার পৌর প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে পৌর কার্য পরিচালনা করতে থাকে। প্রশাসক নিয়োগের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বহুবার যত প্রশাসক এসেছেন আমরা তাদের কাছে শহীদ মিনারটি পূর্ণাঙ্গ করার দাবী জানিয়ে এসেছি। অনেকেই আমাদের আশ্বাস দিলেও কেউই এ কাজে আন্তরিক হননি। অবশেষে ২০০৩ এ পৌরসভায় বহুদিন পর নির্বাচিত প্রতিনিধি এলে পৌর চেয়ারম্যান ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে আমরা নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে এ শহীদ মিনারটি পূর্ণাঙ্গ করার দাবী জানাই এবং আমাদের দিক থেকে সার্বিকভাবে তাঁকে সহযোগিতার আশ্বাস দেই। তিনি আন্তরিকতার সাথে আমাদের এ দাবীর প্রতি তাঁর সমর্থন ব্যক্ত করেন। পৌরসভায় জমা দেয়া পূর্বের ডিজাইনটি ইতিমধ্যে হারিয়ে যাওয়ায় নতুন একটি ডিজাইন করিয়ে পৌরসভা শহীদ মিনারের কাজটি শুরু করে। পৌর সভায় তখন শহীদ মিনার করার মত তহবিল ছিল না। পৌর চেয়ারম্যান নারায়ণগঞ্জে বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে শহীদ মিনারের জন্য আর্থিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে চিঠি দেন, কিন্তু কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সে আহ্বানে এগিয়ে আসেনি। সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকে আমরা এ বিষয়ে তাঁর আহ্বানে সাড়া দেই। যার পরিমাণ উল্লেখ করার মতো নয়। তবে এটি ছিলো পৌর চেয়ারম্যানের আন্তরিক আহ্বানের প্রতি আমাদের সম্মান প্রদর্শন।

শহীদ মিনারের কাজটি পৌরসভা শুরু করতে গেলে আবারও বিপত্তি ঘটে। সে সময়ে জেলা প্রশাসক হারুন-অর-রশিদ ও তাঁর সাথে স্থানীয় কিছু ব্যক্তিবর্গ দুইটি বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। প্রথমত, শহীদ মিনারের জায়গা নিয়ে। শহীদ মিনারটি চাষাড়ায় না হয়ে চাঁদমারীতে হোক।- যে প্রশ্নটি ভিত্তিপ্রস্তরের সময়েও উত্থাপন করা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি বাস্তবায়নের অধিকার কে সংরক্ষণ করেন- জেলা প্রশাসক না পৌর কর্তৃপক্ষ? পৌর চেয়ারম্যান তখন আমাদেরকে শহীদ মিনার বাস্তবায়নে এ জটিলতার কথা বলেন। আমরা তখন বলি, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও তার নিজস্ব জায়গায় শহীদ মিনার গড়ে তুলতে পারে এবং বিভিন্ন পাড়ামহল্লায়ও জনগণ স্বউদ্যোগে তাদের নিজেদের জায়গায় শহীদ মিনার গড়ে তুলতে পারেন। এ শহীদ মিনার তৈরি করার জন্য কোনও সরকার বা প্রশাসনের অনুমতির প্রয়োজন পড়ে না। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার যদি জেলা প্রশাসক চাঁদমারীতে বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি করতে চান, তা করুন, সে ভালো কথা, আমরা তাঁর সাথে আছি। কিন্তু পৌরসভাও তো তার নিজস্ব জায়গায় শহীদ মিনার গড়ে তোলার অধিকার রাখে। পৌরসভা যদি কোন পৌর শহীদ মিনার গড়ে তুলতে চায় তাহলে অবশ্যই জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন পড়বে না। শহীদ মিনার কোনও সরকার, শাসক বা প্রশাসনের অনুমতি বা আদেশ-নির্দেশে গড়ে ওঠে না বা নিয়ন্ত্রিতও হয় না। এইটিই একুশের আদর্শ ও চৈতন্যের সাজুয্য। অবশেষে শহীদ মিনারটি গড়ে উঠলো। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারটি পৌরসভার নিজস্ব অর্থায়নে একটি পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনারে রূপ লাভ করে। ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও পৌরসভা উদ্যোগ না নিলে এ শহীদ মিনারটি এখনও পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করতো না এ বিষয়টি নিশ্চিত। হয়তো হতো কোন এক সময়ে তবে এখনি নয়।

ইতিহাস কোন জড় বস্তু নয়। এটি চলমান গতিশীল এক প্রক্রিয়া। ইতিহাস বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গকে দিয়ে তার প্রয়োজনের কাজটুকু করিয়ে নেয়। মানুষ তার ক্রীড়নকমাত্র। যারা সফলভাবে তা সম্পন্ন করেন ইতিহাস তাদেরকে বুকে ধারণ করে। এভাবেই ইতিহাস গড়ায়। শহীদ মিনার তো ইট-পাথর আর রড-সিমেন্টের কোনও স্থাপনা নয়। এইটি বাঙালির বাঙালি হয়ে ওঠা ও মানুষ হয়ে ওঠার প্রেরণা। এ শহীদ মিনার আমাদের চিন্তার দীনতা থেকে মুক্তি দিক, প্রাণিত করুক। এ শহীদ মিনার বাস্তবায়নে যাঁরা যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাঁদের অনেকেই আজ নেই, অনেকেই আছেন। তাঁদের সকলকেই প্রণতি।

(বি.দ্র: ২০১০ সালে শহীদ মিনারের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট “শহীদ মিনারের ২৫ বছর” শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। তাতে ১৯৮৪-৮৫ সালের এ সংক্রান্ত সভার সকল কাগজ ও নথি-পত্রের ছবির সাথে এ লেখাটি প্রকাশিত হয়)।

সব খবর
মতামত বিভাগের সর্বশেষ