বুধবার ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯

নারায়ণগঞ্জে ভাষা সৈনিক বিতর্ক ও ইতিহাসের বিচ্যুতি

শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৬:২৯

রফিউর রাব্বি

প্রেস নারায়ণগঞ্জ ডটকম: ২১শে ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় এক দৈনিকে নারায়ণগঞ্জের ভাষাসৈনিক উল্লেখ করে একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। লক্ষ্য করা যাচ্ছে কারো কারো নামের পূর্বে ভাষাসৈনিক বিশেষণ ব্যবহার করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজনও করা হচ্ছে। উল্লেখ্য ১৯৪৮ বা ১৯৫২ দুই পর্বের কোন ভাষা আন্দোলনেই যাদের কোন ভূমিকা নেই তাদেরকেও আজকে ভাষাসৈনিক হিসাবে অভিহিত করা হচ্ছে। এ সমস্যটি শুধু নারায়ণগঞ্জেই নয় সারাদেশেই তা হচ্ছে।

আমাদের মুক্তিযোদ্ধা নিয়েও বিতর্কেরও সম্পূর্ণ অবসান ঘটেনি। ১৯৭১ সালে কি ভূমিকা রাখলে তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা বলা যাবে এ প্রশ্নে কতগুলো মিমাংসায় আসা গেলেও বিতর্কের পূর্ণ অবসান ঘটেনি। ১৯৭১ এ যাঁরা অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছেন তাঁদের পাশাপাশি যাঁরা গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে থেকে ভূমিকা রেখেছেন বা কূটনৈতিক কাজে অবদান রেখেছেন তাঁদেরকেও মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গ্রহণ করার বিষকে সিদ্ধান্তে আসা গেছে। আবার শহীদ বুদ্ধিজীবী যাঁরা- তাঁদের পরিবার আজো পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের স্বীকৃতি পাননি। বিভিন্ন জেলায় মুক্তিযুদ্ধে বিরোধীতাকারী বা ১৯৭১ সালে যাদের বয়স ১০/১২ বছর হয়নি এমন ব্যক্তিদেরকেও অর্থের বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ঘোষণা দেয়ার নজির আমরা সংবাদ মাধ্যমে অহরহ পাচ্ছি। ১৯৭২ সালে আমাদের নারায়ণগঞ্জে বঙ্গবন্ধু সড়কে লাইনে দাঁড়িয়েই এম.এ.জি ওসমানির স্বাক্ষর যুক্ত মুক্তিযুদ্ধের সনদ গ্রহণ করতে আমি আমার পরিচিতজনকে দেখেছি। যদিও মুক্তিযুদ্ধে তার কোন অংশগ্রহণ ছিলনা। এসব ঘটনা ঘটেছে এবং এখনও ঘটছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। যার ফলে এখানে এ সব অনিয়ম চলছে। কিন্তু ভাষাসৈনিকদের প্রশ্ন আলাদা। এখানে আর্থিক সুযোগ-সুবিধার বালাই নেই। কিন্তু ভাষাসৈনিকের বিতর্কটা অন্য জায়গায়। ভাষা আন্দোলনে কি ভূমিকা রাখলে তাঁকে ভাষাসৈনিক বলা যাবে তার সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা দীর্ঘদিন ছিলনা। ভাষা সংগ্রামে কোন ভূমিকা পালন করলে একজনকে ভাষাসৈনিক বলা যাবে তা স্পষ্ট ছিলনা। যেমন- তখন অসংখ্য সভা-সমাবেশ হয়েছে, মিছিল হয়েছে, পিকেটিং হয়েছে। যদি সমাবেশে অংশগ্রহণকে মানদন্ডে ধরা হয় তবে নারায়ণগঞ্জে ভাষাসৈনিকের সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি। কারণ ১৯৫২ এর ২৩ ফেব্রুয়ারি  তোলারাম কলেজের অধিগ্রহণ করা মাঠে যে সমাবেশটি হয়েছিল সরকারি সংস্থার হিসাবে তার জমায়েত ১৫ হাজার। আর দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ও বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী তা ২০ হাজারেরও বেশি। তখন আদমজী জুট মিল, ঢাকেশ্বরী ও চিত্তরঞ্জণ কটন মীলের আট-দশ হাজার শ্রমিক ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িহ হয়েছিলেন। তাহলে নারায়ণগঞ্জে ভাষাসৈনিকের সংখ্যা ২০ হাজারেরও অনেক বেশি।

৫/৬ বছর আগে সরকারিভাবে সারাদেশে ভাষাসৈনিকের তালিকা প্রণয়নের জন্য ভাষাসৈনিক আহম্মদ রফিক-কে আহ্বায়ক এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান ও ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন-কে সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। সে কমিটি ভাষাসৈনিক প্রশ্নের ৩টি মানদণ্ড তৈরী করেন। ১। ১৯৪৮ বা ১৯৫২ এর যে কোন পর্বের সংগ্রামে কারাবরণ, ২। ভাষা আন্দোলনের সংগঠক বা আন্দোলন সংগঠনে সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রেখেছেন, ৩। দেশ বিভাগ পূর্ব ১৯৪৭ এর মে থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত তাত্ত্বিক বিতর্ক পর্বে বাংলা ভাষার পক্ষে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন। এখানে ৩টি মানদন্ডের তৃতীয়টিতে নারায়ণগঞ্জের কোন ভাষাসৈনিকের উল্লেখ পাওয়া যাবে না। কারণ বাংলাকে কেন রাষ্ট্রভাষা করা হবে; লেখা-লেখির মাধ্যমে সে বিতর্ক পর্বে নারায়ণগঞ্জের কেউ জড়িত ছিলেন বলে জানা যায় না। যদিও ১৯৪৭ এর ডিসেম্বরে বিজলী প্রেস থেকে ‘স্ফুলিঙ্গ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল, যাতে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা কেন’ শিরোনামে ড. মুহম্মদ এনামুল হকের একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সে প্রবন্ধটির প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হয়েছিল এবং পরবর্তী দুই কিস্তিতে তা শেষ হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার স্ফুলিঙ্গ পত্রিকার সে সংখ্যাটি বাজেয়াপ্ত করে এবং বিজলী প্রেসটিকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নদীতে ফেলে দেয়। ড. মুহম্মদ এনামুল হক নারায়ণগঞ্জের অধিবাসী ছিলেন না। কমিটি প্রণিত প্রথম মানদন্ড যাঁরা কারাবরণ করেছেন। ১৯৫২এর ফেব্রুয়ারিতেই মূলত এখানে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে দৈনিক আজাদ ও দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা মতে ২৯ ফেব্রুয়ারি  ও ১ মার্চ নারায়ণগঞ্জে ১১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। যদিও কেউ কেউ এ সময় প্রায় দেড়’শ জনকে গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করেন। সে সময় যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাঁদের প্রায় সবার নামই সংবাদপত্র ও বিভিন্ন ভাষাসৈনিক ও গবেষকের লেখায় এসেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের তালিকা ইতিমধ্যেই উল্লেখিত। দ্বিতীয় মানদন্ডে যাঁরা সংগঠক হিসাবে নারায়ণগঞ্জে ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের নামও সংবাদপত্র ও বিভিন্ন ভাষাসৈনিক ও গবেষকের লেখায়, গ্রন্থে উল্লেখিত।

১৯৫২ সালে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মফিজউদ্দিন আহাম্মদকে আহ্বায়ক ও আজগর হোসেন ভূইয়াকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে নারায়ণগঞ্জে সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। এ মফিজউদ্দিন আহাম্মদ দেওভোগ পাক্কা রোডের বাসিন্দা, আহাম্মদ জুটেক্স এর স্বত্বাধিকারী এবং তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের নারায়ণগঞ্জ শহর কমিটির সম্পাদক। আজগর হোসেন ভূইয়া নারায়ণগঞ্জ শহরের ডনচেম্বার নিবাসী। যদিও এই কমিটি ভাষা সংগ্রামে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। তবে নারায়ণগঞ্জে ভাষা আন্দোলন অগ্রসর করে নিয়েছেন যাঁরা তাঁরা অনেকেই এই কমিটিতে ছিলেন না।

নারায়ণগঞ্জে ভাষা সৈনিক হিসাবে এমন অনেকের নামই এখন উচ্চারিত হয় প্রকৃত চিত্রে ভাষা সংগ্রামে যাদের কোন ভূমিকাই ছিলনা। কয়েক বছর আগে জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জের ভাষাসৈনিকদের একটি তালিকা তৈরী করা হয়েছিল। যেখানে প্রকৃত ভাষাসৈনিকের সাথে এমন অনেকেরই নাম রয়েছে যাদের ভাষা সংগ্রামে কোন ভূমিকাই ছিলনা। জেলায় ভাষা সংগ্রামী কারা; তা জেলা প্রশাসকের জানার কথা নয়। তাঁর চারপাশে যারা রয়েছেন তারা তাকে এ তালিকাটি প্রণয়নে উদ্বুদ্ধ করেছেন বা ভূমিকা রেখেছেন। যার ফলে এ ত্রুটিপূর্ণ তালিকা তৈরী হয়েছে। সরকারের কোন ব্যক্তি, আমলা বা কর্মকর্তার নোটে বা নির্দেশে ইতিহাসের সত্য তৈরী হয় না বা এর পরিবর্তনও ঘটেনা। ভাষাসৈনিক প্রশ্নে উপরের তিনটি মানদন্ড দিয়েই আমরা আমাদের ভাষাসৈনিকদের সনাক্ত করে নিতে পারি, এ নিয়ে বিতর্ক তুলে ইতিহাসে পরিবর্তন আনা যাবে না।

সব খবর
মতামত বিভাগের সর্বশেষ