মঙ্গলবার ২০ আগস্ট, ২০১৯

নাজমা বেগম, মাটিই যার জীবিকা!

শনিবার, ১১ আগস্ট ২০১৮, ২০:৪১

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

আসিফ হোসাইন (প্রেস নারায়ণগঞ্জ): আমরা চারপাশে যা কিছু দেখি সবই আমাদের স্বাভাবিক মনে হয়। মুচি থেকে শুরু করে প্রাডো গাড়ির কালো গ্লাসের ভিতরে বসে থাকা লোকটিকেও আমাদের স্বাভাবিক মনে হয়।মনে হয় এটা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু লোকটির মুচি হওয়ার নেপথ্যের ঘটনা আমরা কেউ জানতে চাই না। কিংবা প্রাডো গাড়ির কালো গ্লাসের ভিতরে বসে থাকা লোকটি কিভাবে উচ্চবিত্ত হলো সেটাও জানার আগ্রহ আমাদের তেমন নেই। কিন্তু তাদের এই জীবিকা নির্বাহের নেপথ্যের ঘটনা শুনলে লোমহর্ষক গল্পও মনে হতে পারে।

মোছাঃ নাজমা বেগম। ২১ বছর ধরে যার জীবিকা চলে মাটির চুলো বানিয়ে। মাটিই তার জীবন।

নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া রেল স্টেশনের বস্তিতে তার সংসার। জামালপুর জেলার মেলান্দর গ্রামের এক জেলে পরিবারে তার জন্ম। ১০ ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। যুদ্ধের দুই বছর পরে তার জন্ম হয়।

তিনি বলেন, আমারে বলে সবাই অপয়া কইতো। আমার যখন জন্ম হয় তখন চাইল ডাইলের মেলা দাম। আমার পরিবার আটার জাউ খাইতো। বাপে অসুস্থ হইয়া ঘরে পইড়াছিল। আর মায় মাছ ধরার জাল বানাইতো। কিন্তু ১০ ভাই-বইনরে লালন পালন করার মতো সামর্থ্য হের ছিল না। পড়ালেহা করতে পারি নাই টেকার লেইগা।

৬ বছর বয়সে হঠাত কইরাই আমার জবান বন্ধ হইয়া যায়। জবান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারন জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, শীতের সকালে দাদা কেশের আলু লইয়া আহে। ওই আলু খাওনের পর থেইকাই আমি কথা কইতে পারি না। মা-বাপে আমারে অবহেলা করতে থাকে। জবান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ছয় মাস পরের ঘটনা।

রোজার মাস। মা কোরআন শরীফ পড়তাছিল। আমাগো মুরগি আছিলো অনেকটি। আমি মুরগিরে আদাড় খাওয়াইতেছিলাম। হঠাত ওয়াব (এক ধরনের বিড়াল) আইসা দুইডা মুরগি ধইরা লইয়া যায়। আমি দৌড়াইয়া মা’র কাছে আইয়া কই, ‘মা, মা ওয়াব মুরগি ধইরা লইয়া গেছে’।

আমার জবান ফিরনে মা মেলা খুশি হয়। কিন্তু মা’য় মনে করতো, আমারে জ্বীনে আছোর কইরা জবান বন্ধ কইরা দিছে। গ্রামের ময়-মুরুব্বিরা কইতো বিয়া দিলে ঠিক হইয়া যাইবো। হের লাইগা আমারে নয় বছর বয়সে এক ল্যাংড়া বেডার কাছে বিয়া দিয়া দেয়। শশুড় বাড়ি আইসা দেহি আমার স্বামীর আগের ঘরের তিন পোলাপাইন আছে। পরথম (প্রথম) বউ আরেক বেডার লগে পলায় গেছে। ওই তিন পোলাপাইনরে আমি পাইল্যা বড় করি। একটু বড় হওনের পরেই অর মায় আইসা ওগো লইয়া যায়। একটা পোলাপাইনও যাইতে চায় নাই। আমার কোমর জড়ায় ধইরা কানতে থায়ে। কষ্টে আমার বুকটা ফাইট্টা যায়। কিন্তু ওগো বাপে তিনডা পোলাপাইনরেই দিয়া দেয় ওগো মার কাছে।

আমার বিয়ার বিশ বছর পরে পরথম সন্তান হয়। কিন্তু দুঃখের কথা হইলো, পোলাডা জন্মের লগেই মইরা যায়। হের এক বছরের মাথায় সবুজ চান হইলো। সবুজ চান আমার বড় পোলার নাম। ওরে পেটে লইয়া আমরা নারায়ণগঞ্জে আহি। চাষাড়া রেল স্টেশনের বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া লই, আর দশ হাজার টেকা দিয়া একটা টং দোকান কিন্যা চাষাড়া রেল স্টেশনে চা পানের দোকান দেই। সবুজ চান হওনের পর আমি টানা একমাস ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে অজ্ঞান থাহি। জ্ঞান ফিরার পরে বাইত ফিরা দেহি টং দোকান বেইচ্যা আমার স্বামী খাইয়া লাইছে। এর কিছুদিন পরেই হের যক্ষা ধরা পড়ে। এই যক্ষা লইয়াই হেয় ভিক্ষা করা শুরু করে। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম হেয় আর বেশি দিন বাঁচবো না। এর পরেই আমার মাটির চুলা বানানোর বুদ্ধি আহে। আমি চুলা বানাইয়া বিক্রি শুরু করি। এদিকে আমার স্বামীর শরীর খারাপ হইতে থায়ে। আর আমাগো সংসারে আস্তে আস্তে আরো দুইজন সন্তান আহে। মাইজ্জাডা শুক্কুর আলী আর ছোটডার নাম কোরবান আলী.........।

এ পর্যায়ে এসে নাজমা বেগম কিছুক্ষণ চুপ হয়ে থাকেন। আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে কাঁপা স্বরে বলেন, পোলাডায় বাপের আদরও পাইলো না। কোরবানের জন্মের নয় দিনের মাথায় ওর বাপটা মইরা গেল।

এই ছোট ছোট পোলা তিনডারে লইয়া নিজেরে অনেক একলা লাগতাছিল। এক মাসের মতো চূলা বানাইতে পারি নাই। রাইখা গেলেই কানতো। অনেক অভাবে দিন কাটাইতাম। পোলা দুইডায় যহন একটু বড় হইলো তহন রাইতদিন চুলা বানানো শুরু হইলো। চুলা বানাইতে বানাইতে হাত ফুইল্যা যাইতো, মাটিয়ে হাত খাইয়া লাইতো। তবুও আমি থাইমা থাকি নাই। পোলাপাইনগুলারে ঘরে বাইন্ধা রাখতাম। ক্ষুধার যন্ত্রনায় কানতো। টিকতে না পাইরা দোকান থেইকা রুটি কিন্না দিতাম।

হঠাত কইরাই আমার বিক্রি বাট্টা ভাল হইতে শুরু করলো। অনেক চুলা বানাইছি। ছোটগুলা ১৫০-২০০ টেকা বিক্রি করি আর মাঝারী আর বড়গুলা ৩০০-৫০০ টেকা বিক্রি করি। এমনও মাস গেছে আমি ৪০-৫০ হাজার টাকার চুলা বিক্রি করছি।

আমার স্বামীর বড় ভাই আইসা আমাগো খোজ-খবর নিতো। একদিন আমারে কইলো, ‘সবুজের মা, টাকা পয়সা জমাইয়া আমার কাছে দিও। সম্পদ কইরা দিমু নে’। আমি সরল মনে চাইরবারে উনারে আড়াই লাখ টাকা দেই। এর পরে ছয় বছর হইয়া গেছে টাকা দেয় না। টাকা চাইলে কয়, ব্যাংকে রাখছিলাম ব্যাংকের লোক পলায় গেছে। বাবাগো আপনার কাছে আমার অনুরোধ, আমার টাকাটা উদ্ধার কইরা দিবেন।

আমার তিনডা পোলা। ওগো লেইগা যা সঞ্চয় করছিলাম সব নিয়া গেছে। এখন আগের মতো বিক্রি বাট্টা নাই। তবুও তিনডা পোলারেই পড়ালেহা করাইতাছি। বড় পোলাডা ক্লাস ফাইভে পড়ে। পাশাপাশি কামও করে। সামনেই হাইস্কুলে উডবো। বাবারে আমি এহন বইয়া চুলা বানাইতে পারি না। বয়স বাড়তাছে। আমার কোমড় ব্যথা করে। হার্টে সমস্যা। নিঃশ্বাস নিতে পারি না ঠিকমতো। সবুজ চানের বাপে একবার বাম চোখে ঘুষি দিছিলো। ওই চোখে এহনো ঝাপসা দেহি। একবার হাতে শক্ত কাঠ দিয়া বাড়ি দিছিলো। এহনো এই হাত অবশ হইয়া রইছে। এহন খাইতেও পারি না ভাল মতো। অনেক অভাবে আছি বাজান। আপনাগো কাছে অনুরোধ আপনারা আমারে দেখবেন। আমার মানিকগো টেকা উদ্ধার কইরা দিবেন।

হতে পারতো নাজমা বেগম আজকে তার ছোট ছেলে কোরবানকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে, সবুজ চান হোসিয়ারী শ্রমিক আর শুক্কুর হোটেলে প্লেট ধোয়া-মোছার কাজ করে। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুন্দর আগামী উপহার দেয়ার প্রত্যয় নিয়ে তিনি দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে সন্তানদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলছেন। তিনি চান, পৃথিবীর প্রতিটি শিশু সুন্দর ভবিষ্যৎ এর নিশ্চয়তা পাবে। থাকবে না কোন বৈষম্য, কোন ভেদাভেদ। আমাদের পরিচয় হবে একটি “মানুষ”।

প্রতিনিয়তই নাজমা বেগমের মতো এমন জীবন সংগ্রামী হাজারো মানুষ আমাদের চারপাশে ঘিরে থাকে। সকলের হাসির অন্তরালেই লুকিয়ে থাকে অজানা কিছু বেদনা। এসব বেদনাকে হার মানিয়ে তারা এগিয়ে যেতে চায় বহুদূর। তবুও এই চলার পথে কিছু সুযোগ সন্ধানী মানুষ তাদের পথ রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তারা যে অদম্য, হার না মানা যোদ্ধা, সকল অসুর তাদের সামনে পরাজিত হয়, মাথা নত করে।

সব খবর
পজিটিভ নারায়ণগঞ্জ বিভাগের সর্বশেষ