বুধবার ১৪ নভেম্বর, ২০১৮

না’গঞ্জে তাবলীগ জামাতের দুই পক্ষে দ্বন্দ্বের নেপথ্যে

বুধবার, ৭ নভেম্বর ২০১৮, ২০:৩১

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: বেশ কয়েকদিন যাবত নগরীর আমলাপাড়া-ডিআইটি এলাকা বেশ উত্তপ্ত তাবলীগ জামায়াতের দুইটি পক্ষকে ঘিরে। দুই পক্ষের পাল্টা পাল্টি বিবৃতি ও অবস্থান পরিস্থিতিকে সংঘাতময় করে তুলেছে। দুই দফা সংঘাতের পর বতর্মানে উত্তেজনা বিরাজ করছে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে। অন্যদিকে উভয়ের এমন কর্মকান্ডের কারণে সাধারণ মুসুল্লিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (১ নভেম্বর) আমলাপাড়ায় দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। ওইদিন মসজিদের ভেতর সাপ্তাহিক বয়ান করা নিয়ে তাবলীগ জামায়াতের মুরুব্বি মাওলানা সাদ কান্ধলবী অনুসারী ও বিরোধী মুসুল্লীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জেলা হেফাজতে ইসলামের আমির ও ডিআইটি মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে লাঞ্চিত করেছে উল্লেখ করে সদর মডেল থানায় জিডিও করা হয়। ঘটনার পরদিন শুক্রবার (২ নভেম্বর) নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল করে মাওলানা আউয়ালের অনুসারী হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দ। এদিন মাওলানা আব্দুল আউয়াল হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, সাদপন্থীরা তাঁর কাছে এসে মাফ না চাওয়া পর্যন্ত অথবা বৃহস্পতিবারের ঘটনার কোন প্রকার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আমলাপাড়া মারকাজ মসজিদে তাবলীগ জামাতের সব রকমের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। তিনি আরো বলেন, আগামী ২২ নভেম্বর আড়াইহাজারে সাদপন্থীরা যে ইজতেমার আয়োজন করেছে তা যেন বন্ধ করা হয়, নইলে রক্তের বন্যা বয়ে যাবে। এ ঘটনার পর সোমবার (৫ নভেম্বর) পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার (৬ নভেম্বর) বাদ মাগরিব অন্যান্য সময়ের মতো বৃহস্পতিবারের বয়ানের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনায় বসেন আমলাপাড়া মারকাজ কমিটির লোকেরা। এমন সময় মাওলানা আউয়াল অনুসারী কিছু লোক এসে আলোচনা বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেয় এবং এক পর্যায়ে আলোচনা বন্ধ না করলে হুমকি দিতে থাকে। কিছুক্ষনের মধ্যেই পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের ফের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে সদর থানার ওসি কামরুল ইসলাম তাঁর ফোর্সসহ পরিস্থিতি আয়ত্তে আনেন। দুই পক্ষকে বুঝিয়ে নিভৃত করেন। ওসি কামরুল ইসলাম আগামী শুক্রবার দুই পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসবেন বলে দুই পক্ষকে শান্ত করেন। অন্যদিকে মাওলানা আউয়াল অনুসারীদের এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, আগামী শুক্রবারের আগে মারকাজ মসজিদে তাবলীগের কোন প্রকারের কার্যক্রম করা হবে না।ওসি কামরুল ইসলাম মারকাজ মসজিদের সাদপন্থীদের অনুরোধ করেন, শান্তি বজায় রাখার জন্য হলেও অন্তত শুক্রবার পর্যন্ত যেন তাবলীগের কার্যক্রম বন্ধ রাখেন। সাদপন্থী মুসুল্লীরা কিছুটা দ্বিমত করলেও শান্তি বজায় রাখতে ওসির কথায় রাজি হন।

দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের নেপথ্যের কাহিনী

নারায়ণগঞ্জের তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম প্রায় ৫৫ বছর যাবত আমলাপাড়া সবগুজারী মারকাজ মসজিদে হয়ে আসছে। মসজিদটি তাবলীগের সদর অঞ্চল বলে পরিচিত। মসজিদ ছোট আর তাবলীগের অনুসারী বেড়ে যাওয়াতে আনুমানিক ১৫/১৬ বছর পূর্বে ফতুল্লায় দ্বিতীয় মারকাজ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। যেখানে তাবলীগের জেলা পর্যায়ের কার্যক্রম চলে। দুইটি মসজিদ হলেও বিগত ৫০ বছর যাবত তাবলীগ জামাতের কার্যক্রমে কোন ব্যাঘাত ঘটে না। এরই মধ্যে হঠাৎ তাবলীগ জামাতের মুরুব্বি বলে পরিচিত মাওলানা সাদ কান্ধলবীর কিছু বক্তব্য নিয়ে ভারতে বিতর্ক তৈরি হয়। এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাবলীগ জামাত দুটি ভাগ হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে নারায়ণগঞ্জেও। নারায়ণগঞ্জেও দুটি পক্ষ তৈরি হয়, একটি সাদপন্থী অন্যটি সাদ বিরোধী। ফতুল্লায় মারকাজ মসজিদটি সাদ বিরোধীদের তথা আউয়াল অনুসারীদের দখলে চলে যায়। যেখানে কেন্দ্রীয় শ্রমিকলীগের শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যান বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ্ব কাউসার আহমেদ পলাশেরও প্রভাব রয়েছে বলে জানা যায়। তবে ফতুল্লায় মারকাজটি সাদ বিরোধীদের অধীনে চলে গেলেও তেমন কোন ঝামেলা দেখা যায় না। দুই পক্ষে দুই মসজিদে তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম করে যাচ্ছিল। কিন্তু ঝামেলাটা বাঁধে গত ৩১ মে।

গত ৩১ মে বহুল বিতর্কিত তাবলীগ জামাতের মুরুব্বি হিসেবে পরিচিত মাওলানা সাদ সমর্থিত তাবলীগের মুসুল্লীরা ঢাকা থেকে আমলাপাড়া মারকাজ মসজিদে আসবেন বলে গুঞ্জন শোনা যায়। এখানে মুসুল্লীরা যাতে কোন প্রকার বিতর্কিত বক্তব্য প্রদান করতে না পারেন সেজন্য জেলা হেফাজতে ইসলামের আমির ও ডিআইটি মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুল আউয়াল অনুসারীরা কালিরবাজারে অবস্থান নিবেন বলেও শোনা যায়। এ খবর জেলা পুলিশ সুপার পর্যন্ত গেলে পুলিশ সুপার জেলা হেফাজতের আমির মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে জরুরি তলব করেন। ওইদিন দুপুর ২টার দিকে সদর থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) শামীম পুলিশের গাড়িতে করে মাওলানা আউয়ালকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যান। এসময় পুলিশের গাড়ির পেছনে মাওলানা আউয়াল সমর্থিত মোটর সাইকেলের বহর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পর্যন্ত যায়। মাওলানা আউয়ালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও গুঞ্জন ছড়াতে থাকে। এ খবর শুনে আউয়াল সমর্থিতরা ডিআইটি মসজিদের সামনে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। পরবর্তীতে জেলা পুলিশ সুপার মঈনুল হক (বদলী হয়ে যশোর আছেন) কোন রকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না করার অনুরোধ করেন মাওলানা আব্দুল আউয়ালকে। এরপর বেশ কয়েকমাস কোন প্রকার ঝামেলা সৃষ্টি হয় না। হঠাৎ করে কয়েকদিন যাবত নতুন করে সংঘাতের সৃষ্টি হয়।

সাদপন্থীদের বক্তব্য

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আমলাপাড়া মারকাজ মসজিদের সাদপন্থী একাধিক মুসুল্লী অভিযোগ করে বলেছেন, হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দ ও মাওলানা আব্দুল আউয়ালের অনুসারীরা ফতুল্লায় মারকাজ মসজিদ নিজেদের কর্তৃত্বে নিয়ে নিয়েছেন। সেখানে বড় একটি প্রভাব রয়েছে কেন্দ্রীয় শ্রমিকলীগের শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যান বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ্ব কাউসার আহমেদ পলাশের। এখন মাওলানা আউয়ালপন্থীরা আমলাপাড়া মারকাজেও নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চান। এ কারণেই তারা এসব কর্মকান্ড ঘটাচ্ছেন।

তারা আরো বলেন, আমরা তো তাদের কার্যক্রমে কোন বাধা দিচ্ছি না। তবে কেন তারা এইসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়ে ইসলামকে কলুষিত করছে? মাওলানা সাদ জ্ঞানের কথা বলেন, মুক্তির কথা বলেন বলে তাকে আমরা অনুসরণ করি। একটা সময় তো তারাও একই লোকের অনুসারী ছিল। এখন তাঁর কিছু বক্তব নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়াতে দুটো ভাগ। তাই বলে তো আর এইসব কর্মকান্ড ইসলাম সমর্থন করে না। তাও আবার মসজিদে এসে অকথ্য ভাষায় গালাগালি, জুতা পায়ে মসজিদে ঢুকে মুসুল্লীদের শাসানো এসব তো সমীচীন না। এখন যদি কোন ব্যাপার তাদের পছন্দ না হয় সেটা তারা বর্জন করতেই পারেন কিন্তু সংঘাতের মাধ্যমে নয়।

আউয়াল অনুসারীদের বক্তব্য

এদিকে সাদবিরোধী ও মাওলানা আউয়াল অনুসারীরা বলছেন, ‘মাওলানা সাদ কোরআন বিরোধী কথা বলেন। তাকে নিয়ে কেবল বাংলাদেশ নয় অন্যান্য জায়গাতেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর অনেক বক্তব্য কোরআন, হাদিস বিরোধী। নারায়ণগঞ্জে তাঁর কিছু অনুসারী রয়েছে যারা কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা অনুযায়ী কার্যক্রম চালাচ্ছে। আমরা কেবল তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করছি।

এ বিষয়ে মহানগর হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান প্রেস নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘গুটিকয়েক সাদপন্থী নারায়ণগঞ্জে রয়েছে যারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চায়। আমরা তাদের বলেছি, তোমরা আমাদের সাথী ভাই, তোমরা আমরা তো একই, আসো একত্রে দীনের প্রচার করি। কিন্তু ওনারা আমাদের কথা শোনেন না, জেলা মারকাজের কথাও শোনে না। মূল ঝামেলা এখানে।’

প্রভাব বিস্তারের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘মসজিদে প্রভাব বিস্তারের কোন ব্যাপার নেই। আমরা কেবল সাদপন্থী মনোভাব থেকে তাদের বিরত থাকতে বলেছি। আর কিছু নয়।

মাওলানা সাদ যে কারণে বিতর্কিত

প্রায় ১০০ বছর আগে ইসলামের দাওয়াতি কাজকে ত্বরান্বিত করতে মাওলানা ইলিয়াছ শাহ (রহ.) দিল্লীর নিজামুদ্দিন মসজিদ থেকে তাবলিগের কাজ শুরু করেন। মাওলানা ইলিয়াছের (রহ.) ছেলে মাওলানা হারুন (রহ.)। তারই ছেলে হলেন মাওলানা সাদ কান্ধলভী। দিল্লীর নিজামুদ্দিন মারকাজের বর্তমান মুরব্বি মাওলানা সাদ কান্ধলভী। তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় কুরআন, হাদিস, ইসলাম, নবী-রাসূল ও নবুয়ত এবং মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। যে কারণে মুসল্লীদের কাছে বিতর্কিত হয়েছেন। ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকা, কুরআন শরিফের ভুল ব্যাখ্যা, ইসলাম ও ওলামাদের বিরোধিতা, জাহেলি ফতোয়া, মোবাইলে কুরআন শরিফ পড়া এবং শোনা, তাবলিগের নতুন ধারাসহ বিভিন্ন ধরনের বিতর্কিত মন্তব্য করায় তার ওপর ক্ষিপ্ত হন তাবলিগের মুসল্লীরা।

এছাড়া ‘তাবলিগ করা ছাড়া কেউ বেহেশতে যেতে পারবে না’ বলে বক্তব্য দেয়ায় তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা। সেখান থেকে মাওলানা সাদকে এ বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু তিনি উল্টো যুক্তি দেন। এ নিয়ে মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

সব খবর
রাজনীতি বিভাগের সর্বশেষ