শুক্রবার ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

দুই আঙ্গুলের গল্প

বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ২২:৫৩

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

আনোয়ার হাসান: সব আঙ্গুল মুঠো করে অনামিকা ও মধ্যমা উঁচিয়ে ধরলে ইংরেজি ‘ভি’ অক্ষরের মতো হয়। গোটা বিশ্বে এভাবে বিজয় চিহ্ন প্রকাশের রেওয়াজ রয়েছে। তবে আমাদের দেশে কারণে অকারণে এভাবে আঙ্গুল উঠানো অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার গুজবে কান দিয়ে অযথা বেশী লবন কিনেও কেউ কেউ দুই আঙ্গুল উঠিয়েছেন। ভাবখানা এমন যেন তিনি বিশাল জয় পেয়েছেন!

এক সময় নারায়ণগঞ্জ থেকে ফতুল্লা হয়ে গুলিস্তান যেতে অসংখ্য লোকাল বাস ছিলো। যাত্রিদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে হেলপার, কন্ট্রাক্টর মিলে ‘ঢাকা আগে-ঢাকা আগে’ বলে ডাকাডাকি করতেন। অনেক সময় চালকও তাদের সাথে যোগ দিতেন। ওই সময়ে শোনা যেতো, বাসে দুই আঙ্গুলের খেলা হয়। পকেটমাররা বিশেষ কায়দায় দুই আঙ্গুল দিয়ে আলতো করে যাত্রিদের পকেট থেকে টাকা নিয়ে নিতো। পকেটমারদের বিভিন্ন গ্রুপ ছিলো, ছিলো সর্দার। এ সর্দাররা সব নিয়ন্ত্রন করতো। দলের পকেটমার পুলিশে ধরা পড়লে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করতো। পকেটমারদের নির্ধারিত রুট ছিলো। নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় কাজ শেষ করতে না পারলে অন্য পকেটমারের কাছে যাত্রিকে ‘বিক্রি’ করা হতো। ওই পকেটমার যদি যাত্রির পকেটের টাকা হাত সাফাই করে নিতো পারতো তবে আগের রুটের পকেটমারকেও ভাগ দিতে হতো। চোখের ইশারায় এসব কাজ সারতো ওরা।

মুড়ির টিন, কোচ, মিনি বাস হয়ে পরবর্তীতে সিটিং সার্ভিস, কাউন্টার যাত্রিবাহী বাস চালু হওয়ায় দুই আঙ্গুলের এ খেলা এখন প্রায় বন্ধ। এছাড়া মানুষের অধিক সতর্কতার কারনে পকেটমার পেশা বিলুপ্ত প্রায়। অনেকেই বলেন, পকেটমারের পরবর্তী বংশধর হলো ‘অজ্ঞান পার্টি’। কোন রাজনৈতিক দল না হলেও নেশা জাতীয় দ্রব্য দিয়ে জ্ঞান রোধ করে মানুষের সর্বস্ব কেঁড়ে নেয়া এই অপরাধীদের নামের শেষে ‘পার্টি’ যোগ হয়ে গেছে। বোদ্ধাদের মতে, কতিপয় রাজনীতিক এ অজ্ঞান পার্টির সদস্যদেরও চেয়েও ভয়ংকর। পার্থক্য হলো, ওরা অজ্ঞান করে লুটে নেয় আর ওই সমস্ত নেতা নামধারীরা প্রভাব খাটিয়ে জোর করে অন্যের হিস্যা নিজের পকেটে নিয়ে নেয়। তাদের ক্ষমতার কাছে মানুষ ঔষধ ছাড়াই অজ্ঞান (অসাড়) হয়ে যায়। অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা ‘বিজয়’ চিহ্ন না দেখালেও ওই নেতা নামধারীরা কিন্তু সময়ে অসময়ে দুই আঙ্গুল দেখান।

নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন সময়ে অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে সমাজের ‘মাথা’ নামক জনপ্রতিনিধি, তথাকথিত সমাজ সেবকরা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাদকদ্রব্য সহ গ্রেপ্তার, চাঁদাবাজির মামলায় কিংবা অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছে। নারী কেলেংকারীতে জড়িয়ে পড়ে জীবননাশ হয়েছে এ শহরের কতিপয় নামী লোকের। একটি খ্যাত ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ পদে ছিলেন, পরবর্তীতে সফল ব্যবসায়ী এমন এক ব্যক্তির নামের সাথে এখন ‘পেরেক’ যোগ হয়ে গেছে। মৃত্যুর অনেক দিন বাদেও মানুষ তার নামের আগে ওই লৌহ বস্তুর নাম উচ্চারণ করেন। প্রসঙ্গ হলো, অপরাধে যুক্ত থেকে গ্রেপ্তার হওয়া কতিপয় ব্যক্তি আঙ্গুল তুলে বিজয় চিহ্ন দেখান। এমনকি হ্যান্ডকাপ পরিহিত অবস্থায় কেও কেউ এমনটা করেছেন। আর জামিন হলেতো কথাই নেই। দলবল নিয়ে দুই আঙ্গুল দেখিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করেন, ‘আমি-আমিই’। অনেকেই তখন প্রশ্ন করেন, বিজয় চিহ্ন কি অপরাধীর জন্য না-কি একটি সুন্দর বিজয়ের জন্য।

উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে শতবর্ষী যুদ্ধে ১৪১৫ সালে ‘ভি-চিহ্ন’র ব্যবহার শুরু হয়। ওই সময় ফ্রান্সের সৈন্যরা ইংরেজদের ধরে তাদের মধ্যমা ও তর্জনি আঙ্গুল কেটে দিতো। এতে সৈন্যরা যেন ভেঙ্গে না পড়ে তাই ইংরেজরা নিজেদের শক্তিমত্তা দেখাতে ওই দু’টি আঙ্গুল উপরে তুলে ধরে ‘ভি-চিহ্ন’ দেখাতে শুরু করে। তারা ‘ভি-চিহ্ন’ দেখানোর মধ্য দিয়ে ফ্রান্সকে বোঝানোর চেষ্টা করতো, এখনো তাদের আঙ্গুল রয়েছে, যা দিয়ে তারা যুদ্ধে জয়ী হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনী বিজয়ের প্রতীক হিসেবে এ চিহ্নটি ব্যবহার করে। ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে (কাউন্টার কালচার মুভমেন্ট) ‘ভি-চিহ্ন’কে শান্তির প্রতীক হিসেবে দেখানো হতো। দেশের সাবেক এক মন্ত্রী অবশ্য বিজয় চিহ্ন দেখাতো পাঁচ আঙ্গুল উঁচিয়ে। তার মতে, আমাদের সুখ ও আনন্দ অন্যের ভাষায় বা অন্যের চিহ্নে কেন প্রকাশ করব?

মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জেও লবন নিয়ে গুজব ছড়ানো হয়। লবন নেই, লবনের দাম অনেক বেড়ে যাবে এমন গুজবে কান দিয়ে পাড়া মহল্লায় লবন কেনার ধুম পড়ে যায়। কোন কোন মহল্লায় লবন কিনতে লাইন ধরে এক শ্রেনীর মানুষ। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে ঝগড়া পর্যন্ত হয়েছে। সারা মাসে ১ কেজি লবন লাগবে এমন পরিবারের এক সদস্য ৫ কেজি লবন কিনে ফেলে। মহল্লার অতি মুনাফালোভী দোকানদাররা পাইকারী দোকানে গিয়ে বেশী লবন কিনে ভ্যান গাড়ি, রিকশা এমনকি মোটরসাইকেলে করে নিয়ে যায়। এমন এক স্থির চিত্রে দেখা যায়, মোটর সাইকেল চালক দাঁত বের করে হাসছেন আর পেছনের লোকটি হাসি মুখে দুই আঙ্গুল দিয়ে বিজয় চিহ্ন দেখাচ্ছেন। দুইজনের মাঝে প্রায় অনেকগুলো লবনের প্যাকেট। তাদের এ হাসি আর বিজয় চিহ্ন দেখলে মনে হয় ‘তারা খুব জিতে গেছেন’। তবে লবন মিলন মালিক, সংশ্লিষ্ট দফতর বিসিক, প্রশাসন সহ সরকারের ঘোষণা মতে, দেশে লবনের কোন ঘাঁটতি নেই। বরং যথেষ্ট মজুদ রয়েছে। তাদের এ কথায় বুঝা যায়, গুজবে কান দিয়ে কিছু মানুষ কতটা বেকুব হয়েছে। আর যারা এমন গুজব ছড়ায় তারাও হয়তো আনন্দিত এই ভেবে, যে তারা কিছু মানুষকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, এই ধরনের মানুষ মানসিক রোগী। আর তাই মানুষকে ঠকিয়েই মজা পায় তারা।

দুই আঙ্গুল নিয়ে কৌতুক

এক রাজা রাজ্যে রাজ পন্ডিত রাখতেন। প্রতি বছর অন্য রাজ্যের পন্ডিতদের নিমন্ত্রণ করে নিজ রাজ্যের পন্ডিতদের সাথে প্রতিযাগীতা দিতেন। একবার অন্য রাজ্যের এক পন্ডিত প্রতিযোগীতায় এসে কোন কথা না বলে এক আঙ্গুল তুললেন। এর উত্তর ওই রাজার কোন পন্ডিত দিতে পারেনি। ৩ দিন চেষ্টা করেও তারা এক আঙ্গুলের জবাব দিতে না পারায় চিন্তিত ছিলো রাজা। চুল কাটতে গিয়ে রাজার মলিন মুখ দেখে রাজ নাপিত রাজার কাছে বিনীত সুরে বলে, ‘রাজা মশাই আমাকে সুযোগ দিন। আমি পারবো’। রাজা প্রথমে ক্ষেপে যান। পরে তিনি ভেবে দেখেন, ভিন দেশী পন্ডিততো নাপিতকে চিনবে না। অন্য পন্ডিতদের সঙ্গে সেজেগুজে বসিয়ে দিলে এ রাজ্যের লোকও চিনবে না। যথা সময়ে নাপিত পন্ডিত সেজে প্রতিযোগীতায় হাজির হয়। ওই দিনও ভিন্ন রাজ্যের ওই পন্ডিত এক আঙ্গুল তুলেন। জবাবে অন্য পন্ডিতরা আগের মতোই চুপ থাকলেও ওই নাপিত জবাবে দুই আঙ্গুল তুলেন। তখন ভিন রাজ্যের পন্ডিত মাথা নেড়ে বুঝান ‘উত্তর সঠিক হয়েছে’।

প্রতিযোগীতা শেষে তিনি ভিনদেশী পন্ডিতের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেন, আপনি কি বললেন আর আমার পন্ডিত (নাপিত) কি উত্তর দিলো। জবাবে পন্ডিত বললেন, আপনার রাজ্যের এ পন্ডিত খুব জ্ঞানী। আমি এক আঙ্গুল দেখিয়ে বুঝিয়েছিলাম ইশ্বর এক। আপনার পন্ডিত এর উত্তরে ২ আঙ্গুল দেখিয়েছে, যার মানে ইশ্বর এক ও আখেরী নবী এক।

এরপর রাজা পন্ডিত সাজা নাপিতের কাছে গিয়ে জানতে চান, ওই পন্ডিত ইশারায় কি বললো আর তুমি কি বললে।

ভিনদেশী পন্ডিতের ইশারা আর নিজের জবাব সম্বন্ধে নাপিত রাজাকে বললো, “ রাজা মশাই ও ব্যাটা এক আঙ্গুল দেখিয়ে বলে আমার এক চোখ খুলে ফেলবে। আমি ২ আঙ্গুল দেখিয়ে বলেছি, তোর দুই চোখ খুলে ফেলবো ব্যটা। আমাকে চিনিস।”

নাপিতের উত্তর শুনে রাজা থ’ বনে যান। আমরা সাধারণ মানুষও দেশের কিছু চালাক প্রাণীর কান্ডে মাঝে মধ্যে এভাবে ‘থ’ বনে যাই। তবে সংশ্লিষ্ট দফতর কেন চুপ থাকেন তা বুঝতে পারি না।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক সংবাদচর্চা।

সব খবর
মতামত বিভাগের সর্বশেষ