শনিবার ১৭ আগস্ট, ২০১৯

থেমে নেই সিটি কর্পোরেশনের নামে অবৈধ টোল আদায়

সোমবার, ৩ জুন ২০১৯, ২১:২২

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

টোল আদায়ের রশিদ, ইজারাদার ডিউক, টোল আদায়কারী বাবু ও পাপড়ি

টোল আদায়ের রশিদ, ইজারাদার ডিউক, টোল আদায়কারী বাবু ও পাপড়ি

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) নামে অবৈধ টোল আদায় থামছেই না। বিভিন্ন সময় জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে একাধিকবার এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি কার্যকরী কোন উদ্যোগ। যার ফলে প্রকাশ্যে বিনা বাধায় বন্দরের সড়কে চলাচলকারী যানবাহন থেকে চাঁদাবাজি চলছে। পকেট ভারী হচ্ছে কিছু অসাধু মানুষের।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় পরিবহন স্ট্যান্ডে টোল নেয়ার জন্য ইজারা দেওয়া হয়। নির্ধারণ করে দেওয়া হয় টোল আদায়ের পরিমানও। কিন্তু অসাধু ইজারাদাররা মানেন না সেসব নিয়মকানুন। নাসিকের নাম ভাঙ্গিয়ে চালকদের কাছ থেকে অবৈধ টোলের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা। এমনই চিত্র দেখা যায় নাসিক ২২ নম্বর ওয়ার্ডের সিরাজউদ্দোল্লাহ মাঠ সংলগ্ন ইটালি বিল্ডিং মোড় এলাকায়। সিটি কর্পোরেশনের নাম উল্লেখ করে ভুয়া রশিদ দেখিয়ে বিভিন্ন যানবাহন বাবদ নেওয়া হচ্ছে ২০০ থেকে সর্বনিম্ন ৩০ টাকা।

এদিকে সিটি কর্পোরেশন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিএনজি চালিত অটো রিকশা, বেবি ট্যাক্সি এবং টেম্পুর জন্য শুধুমাত্র স্ট্যান্ডে পার্কিং বাবদ প্রতিদিন একবার ১৫ টাকা করে নেওয়ার নিয়ম। কিন্তু ইজারাদার বাড়তি সুবিধার জন্য সিটি কর্পোরেশনের নামে ভুয়া রশিদ তৈরি করে এই রাস্তায় চলাচলকারী সব ধরণের যানবাহন থেকে টোল আদায় করেন। ৩০ থেকে শুরু করে যার পরিমাণ দুইশত টাকা।

জানা গেছে, বন্দর ঘাট সংলগ্ন সিএনজি ও বেবি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের ইজারাদারের নাম মাহবুব হাসান ডিউক। নিয়ম অনুযায়ী ঘাট সংলগ্ন স্ট্যান্ডের পরিবহনগুলো টোল আদায়ের কথা। কিন্তু স্ট্যান্ড থেকে টোল নেওয়া ছাড়াও স্ট্যান্ডের অদূরে সড়কে দাড়িয়ে সকল পরিবহন থেকে অবৈধ টোল আদায় করেন ইজারাদার ডিউকের লোকজন।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের মাধ্যমে জানা যায়, এই সড়কে টোল আদায় করেন বাবু ও পাপড়ি নামে দুই ব্যক্তি। এই দু’জন ইজারাদার মাহবুব হাসান ডিউকের লোক বলেই পরিচিত। এই সড়কে চলাচলকারী সকল পরিবহণ থেকে অবৈধ টোল আদায় করেন তারা। টাকা না দিলে হয়রানির শিকার হতে হয় চালকদের।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক চালক বলেন, ‘টাকা না দিলে গাড়ি আটকে রাখে। মালামাল নামিয়ে নিয়ে যায়। ঝামেলায় পড়তে চাই না বলেই টাকা দিয়ে চলে যাই।’

সাদেকুর নামে আরেক চালক বলেন, ‘এই টোল যে অবৈধভাবে নিচ্ছে তা তো আমরা জানি না। সিটি কর্পোরেশনের নামে রশিদ দেয়, টাকা দিয়ে দেই। আমরা তো আর জানি না এই রশিদ ভুয়া। জানলে তো অভিযোগ জানাবো।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, বন্দর ২২ নং ওয়ার্ডের ইটালির মোড় দিয়ে যাতায়াতকারী সকল পরিবহণ থেকে আদায় করা হচ্ছে টোল। আর টোল নেয়া বাবদ দেয়া হচ্ছে রশিদ। যেখানে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নাম থাকলেও নেই ইজারাদারের নাম। রশিদ মোতাবেক বড় ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান থেকে ২০০ টাকা, মাঝারি ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ১০০ টাকা, ছোট ট্রাক থেকে ৭০ টাকা, মাইক্রো বাস থেকে ৫০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এভাবে মাসে কয়েক লক্ষ টাকা আদায় করা হয়। যার কোন বৈধতাই নেই। এই টাকা না দিলে গুন্ডা দিয়ে ট্রাক আটকে রেখে মালামাল রেখে দেয়া হয় বলেও অভিযোগ ট্রাক চালকদের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইজারাদার মাহবুব হাসান ডিউক প্রথমে সকল পরিবহন থেকে টোল আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করলেও পরবর্তীতে তা এড়িয়ে যান। প্রেস নারায়ণগঞ্জকে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তিনি দাবি করেন, তার এলাকায় বড় কোনো ট্রাক প্রবেশই করে না। ফলে তার ট্রাক থেকে টোল আদায়ের প্রয়োজনই হয় না।

তবে সিটি কর্পোরেশনের নামে রশিদের কথা উল্লেখ করলে বিএনপির কর্মী ডিউক বলেন, ‘আমি নিয়ম অনুযায়ী টোল নেই কিন্তু রাতের আধারে কিছু মানুষ নাসিকের রশিদ ব্যবহারে অবৈধভাবে টোল আদায় করে। এরা শ্রমিকলীগের সঙ্গে জড়িত।’

এদিকে এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, টোল আদায়কারী করে তারা সকলেই ইজারাদার ডিউকের লোক। এবং তার হয়েই টোল আদায় করে।

সিটি কর্পোরেশনের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুলতান আহমেদ ভূইয়ার বাড়ির অদূরের সড়ক থেকেই তোলা হয় এই অবৈধ টোল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় এই কাউন্সিলর বলেন, ‘এরা এদিক-সেদিক গাড়ি নামিয়ে যানজট করে। এদের পকেটে তিন পদের স্লিপ আছে। পনেরো টাকার স্লিপ ছাড়াও একশো-দুইশো টাকার স্লিপও তাদের কাছে আছে। এ ব্যাপারে সিটি কর্পোরেশনকেও জানিয়েছি। আমি এই অবৈধ টোল আদায়ের পক্ষে না। আপনারা নিউজ করেন। আমিও চাই এগুলো বন্ধ হোক।’

এদিকে সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান রয়েছে বলে বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ। গত ৩১ মে সিদ্ধিরগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিভিন্ন পরিবহনে চাঁদাবাজির সময় ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১১ এর একটি দল। গত ২ জুন আরেক অভিযানে আরো ১৯ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। তবে সড়কে চাঁদাবাজির বিষয়ে বন্দরে র‌্যাবের কোন অভিযান এখনো চোখে পড়েনি।

এ বিষয়ে র্যাব-১১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আলেপ উদ্দিন প্রেস নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে কোন অভিযোগ পাইনি। যেসব চালক ভুক্তভোগী হচ্ছেন তারাও কখনো আমাদের জানায়নি। তবে যেহেতু এ বিষয়ে তথ্য পেয়েছি। আমরা খোঁজ নিয়ে এ অভিযোগের সত্যতা পেলে অতি দ্রুত অভিযান পরিচালনা করবো।’

বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। কোনো অভিযোগ আসলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবো।’

এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) বাজার পরিদর্শক মো. জহিরুল আলম বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশন থেকে ইজারাদারকে ছোট পরিবহন যেমন- বেবি ট্যাক্সি, সিএনজি থেকে টোল নেয়ার অথরিটি দেয়া হয়েছে। এর বাইরে নয়। গণমাধ্যমে প্রতিবেদন আসার পর আমরা মাসিক মিটিং এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। সকল ইজারাদারদের সতর্ক করা হয়েছে। কিছু স্থানে লিখিত সতর্কতা দেয়া হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সকল তথ্য পেয়েছি বন্দর ২২নং ওয়ার্ডের এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সব খবর
নগর বিভাগের সর্বশেষ