শুক্রবার ২৩ এপ্রিল, ২০২১

ত্বকী হত্যা ও বিচারহীনতার ৮ বছর

বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ ২০২১, ১২:১১

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

হালিম আজাদ: ৬ মার্চ ২০১৩। বিকেলে সুধীজন পাঠাগারে যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে মেধাবী কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে অপহরণ করা হয়েছিল। ওই রাতেই ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় বিষয়টি উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি করেন এবং র‌্যাব-১১ এর কার্যালয়ে চিঠি দেন। এর দুই দিন পর ৮ মার্চ সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর খালের পাড় থেকে পুলিশ ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে। ৮ মার্চ রাতেই ত্বকীর পিতা বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় দন্ডবিধি ৩০২/৩৪ ধারায় আসামি অজ্ঞাত উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন এবং ১৮ মার্চ জেলা পুলিশ সুপারের কাছে ত্বকী হত্যার জন্য তিনি শামীম ওসমান ও তার ছেলে অয়ন ওসমানসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে একটি অবগতিপত্র দেন। তদন্তে মামলাটির আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় ২৮ মে ২০১৩ উচ্চ আদালতের নির্দেশে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) ত্বকী হত্যা মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন।

সে বছর ২৯ জুলাই ইউসুফ হোসেন লিটন নামের এক ঘাতক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সে জবানবন্দিতে ত্বকীকে কখন, কীভাবে, কোথায়, কারা এবং কেন হত্যা করেছে তার বিশদ বর্ণনা দেয়। তার বর্ণনা অনুযায়ী অপহরণের রাতেই তারা ত্বকীকে প্রথমে গজারির লাঠি দিয়ে পিটিয়ে অজ্ঞান করে এবং পরে কালাম সিকদার নামের এক ঘাতক তার বুকের উপর উঠে গলা চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। রাত ১১টার মধ্যেই তারা ত্বকীকে হত্যা করে এবং পরে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়। ঘাতকের এই জবানবন্দির কিছুদিন পর ৭ আগস্ট র‌্যাব সে সময়ের সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের ‘উইনার ফ্যাশন’ খ্যাত টর্চারসেলে অভিযান পরিচালনা করে। সেখানে তারা দেয়ালে ও আসবাবপত্রে গুলির চিহ্ন দেখতে পান এবং সেখান থেকে রক্তমাখা প্যান্ট, দড়ি, রক্তমাখা গজারির লাঠি, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জামাদি, পিস্তলের অংশসহ বিভিন্ন বস্তু আলামত হিসেবে সংগ্রহ করেন।

সে বছর ১২ নভেম্বর সুলতান শওকত ভ্রমর নামে অপর এক ঘাতক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে সেও ত্বকীকে হত্যার বিশদ বিবরণ দেয়। সে তার বিবরণে উল্লেখ করে, আজমেরী ওসমানের নির্দেশে তার টর্চারসেলে তারই উপস্থিতিতে ত্বকীকে রাত ১২টার আগেই তারা হত্যা করেছে। পরে আজমেরীর গাড়িতে করেই তারা ত্বকীর লাশ শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে নিয়ে যায় এবং লাশ নৌকায় করে নিয়ে নদীতে ফেলে দেয়।

ত্বকী হত্যার ১ বছরের মাথায় ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হাসান র‌্যাবের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমকে ত্বকী হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি জানান। তারা উল্লেখ করেন, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করেছে। হত্যার কারণ হিসেবে তারা তিনটি বিষয়কে উল্লেখ করেন, এক: ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ, দুই: এর কিছু দিন পূর্বে গণপরিবহনে শামীম ওসমান ও তার অনুগত লোকদের ব্যাপক চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করে তার আন্দোলন, তিন: চিহ্নিত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভূমি দখলের প্রতিবাদে জনগণের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া। এ তিনটি কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা ত্বকীকে হত্যা করেছে বলে উল্লেখ করে র‌্যাব একটি অভিযোগপত্র তৈরি করেন এবং তা উপস্থিত সাংবাদিকদের সরবরাহ করেন। সংবাদ সম্মেলনের সে সংবাদ সে দিন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল প্রচার করে এবং পরদিন তা বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। র‌্যাব তখন অচিরেই এ অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করা হবে বলে জানান।
২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান মৃত্যুবরণ করলে ওই বছরের ৩ জুন জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ওসমান পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতির কথা জানান এবং এর পর থেকেই কার্যত ত্বকী হত্যার তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

ত্বকী হত্যার এক বছর পরে নারায়ণগঞ্জে সংগঠিত সাতখুন মামলার কার্যক্রম নিম্ন ও উচ্চ আদালতে সম্পন্ন হয়েছে। শিশু রাজন-রাকিব হত্যাসহ কিছু মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হলেও ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্রটি আদালতে পেশ করা হয় নাই। যার ফলে আদালতে ত্বকী হত্যায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া ঘাতক সুলতান শওকত ভ্রমর ও ঘাতক ইউসুফ হোসেন লিটনসহ সকলেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে কেউ বিদেশে পালিয়ে গেছে কেউবা দেশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখন একদিকে ঘাতক আজমেরী ওসমান প্রশাসনের সামনেই বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অন্যদিকে শামীম ওসমান ত্বকী হত্যার বিচার-প্রার্থীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিভৃত করতে ব্যর্থ হয়ে তাদেরকে হামলা করে, মামলা দিয়ে নির্যাতনের বিভিন্ন পথ অব্যাহত রেখেছে। বহু সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মী বিভিন্ন সময় তার হামলার শিকার হয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে, রবীন্দ্র জয়ন্তীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তারা হামলা চালিয়েছে। শামীম ওসমান নিজের স্ত্রীসহ বিভিন্ন আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজনদের দিয়ে ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বির বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করিয়েছে; তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ম-অবমাননার অভিযোগ এনে হেফাজতে ইসলামকে দিয়ে মামলা করিয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রিত মসজিদে মসজিদে মিথ্যা খুতবা দিয়ে জনতাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করেছে, হেফাজতকে দিয়ে মিছিল করিয়েছে আবার সে মামলায় যাতে আদালতে যেতে না পারেন তার জন্য হেফাজত ও তার অনুগত ছাত্রলীগ-যুবলীগ পরিচয়ধারী ক্যাডারদের দিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে লাশ চাই, কল্লা চাই বলে মহড়া দিয়েছে। হেফাজতকে নিয়ে সমাবেশ করে কতল (হত্যা) করারও হুমকি দিয়েছে।

ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে বিশ্বের ১৭টি দেশে প্রতিবাদ হয়েছে। এ বিচারের দাবিতে টানা আট বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে সমাবেশ, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, আলোক প্রজ্বালন, গোলটেবিল বৈঠক, প্রতীক অনশনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। দেশের লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীগণ প্রতিনিয়ত লেখালেখি, কবিতা, ছবি আঁকা, গান রচনা, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ, স্মারক গ্রন্থ, গান ও আবৃত্তির সিডি প্রকাশসহ বিভিন্নভাবে এ হত্যার বিচার চেয়ে আসছেন। ২০১৩ সালের ৮ মার্চ ত্বকীর লাশ পাওয়ার তারিখটিকে কেন্দ্র করে ৮ বছর ধরে টানা প্রতি মাসের ৮ তারিখ আলোক প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করে আসছে। কোনো হত্যাকান্ডের বিচারের দাবিতে এভাবে টানা আন্দোলন, সারাদেশসহ বিশ্বে কতটা নজির রয়েছে আমাদের জানা নেই।

আজকে রাষ্ট্রে সংগঠিত বিভিন্ন ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির নগ্ন বহিঃপ্রকাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাষ্ট্রে সংগঠিত বিভিন্ন ঘটনাবলির কারণে আমরা মনে করছি যে, সরকার তার রাজনৈতিক প্রয়োজনে কোনো কোনো বিচার সম্পন্ন করে থাকে এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনেই কোনো কোনো অপরাধের বিচারকার্য সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখে। সরকারের এ অবস্থানের কারণে আজকে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অবিশ^াস ও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে রাষ্ট্রের এ শক্তিশালী স্তম্ভটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। বিচার ব্যবস্থা ও সুশাসন ধ্বংস হয়ে গেলে রাষ্ট্রের আর গণতান্ত্রিক চরিত্র অবশিষ্ট থাকে না, রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে আমরা দেউলিয়া দেখতে চাই না। আর চাই না বলেই আর বিলম্ব না করে ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র দ্রুত আদালতে জমা দিয়ে সকল ঘাতকদের ও হত্যার নির্দেশদাতাদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি। দেশের প্রতিটি নাগরিকের বিচার পাওয়ার অধিকারকে সাংবিধান নিশ্চিৎ করেছে। দেশে কোন অপরাধ সংঘটিত হলে ৬০ দিনের মধ্যে তার অভিযোগপত্র আদালতে পেশ করার সংবিধান বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

অথচ ৮ বছরেও ত্বকী হত্যার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া হয় নাই। অথচ অভিযোগপত্র ৭ বছর আগে তৈরি হয়ে আছে। আজকে সরকার সে অধিকার ক্ষুন্ন করার সাথে সাথে সংবিধানকেও লঙ্ঘন করে চলেছে। বিচার প্রক্রিয়া আটকে রেখে এখন হয়তো একে বিলম্বিত করা যাচ্ছে, কিন্তু এ বিচার বন্ধ করে দেয়া কখনই সম্ভব হবে না। অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় অবশ্যই যেমনি দাঁড়াতে হবে, তেমনি ঘাতকদের পক্ষ নিয়ে বিচার বন্ধ রাখার অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকেই একদিন বিচারের কাঠগড়ায় আসতে হবে।

লেখক: হালিম আজাদ, কবি, সাংবাদিক, সদস্যসচিব, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ

সব খবর
নগর বিভাগের সর্বশেষ