শনিবার ০৪ এপ্রিল, ২০২০

ত্বকীর চিরশয্যা: আমাদের লড়াই

বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২০, ২১:২৮

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

হায়াৎ মামুদ: আমাদের বাংলাদেশের সমাজে অমানবিকীকরণ কোন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে প্রতিদিন দৈনিক সংবাদপত্রে চোখ রাখলে তা স্পটভাবে ধরা পড়ে। কিন্তু ডাক্তার যেমন মুমূর্ষু রোগী ও মৃতদেহ দেখতে-দেখতে মৃত্যু বিষয়ে নিস্পৃহ ও কৌতূহলহীন হয়ে যান, আমরা সাধারণ মানুষজনও তেমনি আমাদের সামাজিক পরিমন্ডলে অমানবিক ঘটনা চাক্ষুষ করেও ক্রমাগত শুনতে থাকার কারণে অনুভূতির নিঃসাড়তা অর্জন করে ফেলি। পরিচিত পরিম-লে অবশ্য তেমন পরিস্থিতি ঘটলে আমাদের অসাড়ত্ব মুহূর্তে ঘুচে গিয়ে আমরা বিপন্ন ও নিরাশ্রয় হয়ে উঠি। তখন শিহরিত হয়ে ভাবি, আমার নিজের পরিবারে যদি এমনটা ঘটত, ভাগ্যিস ঘটেনি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে হাঁফ ছাড়ি হয়ত, কিন্তু স্থির থাকতে তো পারি না। সাত বছর আগে এমন একটি কান্ড নারায়ণগঞ্জ শহরে ঘটে গেল যার নিষ্ঠুরতা ও মর্মান্তিকতা আমাদের শুধু নির্বাকই করেনি, আমাদের চূড়ান্ত অসহায়ত্বও বুঝিয়ে দিয়ে গেল।

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী নামটি তার মৃত্যুর পূর্বে আমার অচেনা ছিল। তার বাবা রফিউর রাব্বি আমাদের অনুজপ্রতিম বন্ধু, নারায়ণগঞ্জে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় সুপরিচিত প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ছত্রছায়ায় যারা নারায়ণগঞ্জবাসীকে জিম্মি করে রেখেছে সেই একটি বিশেষ পরিবারের বিরুদ্ধে রফিউর রাব্বির কণ্ঠ সর্বদাই সোচ্চার ছিল, এখনও আছে, তাঁর পুত্রহত্যার কারণে আরো তীক্ষè ও গগনবিদারী হয়েছে। এই পরিবারটির দুর্বৃত্তগিরির কারণে ঐ শহরের সকলেই সর্বক্ষণ ভীতসন্ত্রস্ত থাকে, তাদের নাকি নির্যাতন কক্ষ বা ‘টর্চার সেল’ পর্যন্ত আছে এবং বর্তমান সরকারের কেষ্টবিষ্টুরা সবাই সে ব্যাপারে ওয়াকিবহাল, অথচ নিজেদের কার্যসিদ্ধি হয় বলে কেউই উচ্চবাচ্য করেন না। কী লজ্জা ও গ্লানিকর! শেখ হাসিনা কি তা জানেন না? সকলের ধারণা, তিনি জানেন এবং জেনেও নিশ্চুপ থাকেন, কারণ তিনি কিছু বললে তাঁর পক্ষপুষ্ট লোকজনদের অসুবিধে হতে পারে।

দু’দিন নিখোঁজ থাকার পর ৮ মার্চ ২০১৩ তারিখে মাত্র ১৭ বছর বয়সী এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের এ-লেভেলের শিক্ষার্থী মেধাবী এই তরুণ ছাত্রের লাশ পাওয়া গেছে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে। তার এভাবে নিহত হওয়ার কারণ তার নিজের কোনো কর্মকা- নয়, তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে তার উদ্যমী ও বিদ্রোহী পিতার কারণে। নিষ্পাপ এই তরুণের মৃত্যু ঘটানো হল তার পিতাকে শাস্তি দানের জন্য। এমন অন্যায় ও কাপুরুষোচিত কাজ কাদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ শহর শুধু নয় তা দেশের কারো নিকটেই অজানা নয়। রফিউর রাব্বি এমন ব্যক্তিগত সর্বনাশেও কিন্তু দমে যাননি, এরপরেও তিনি বলেছেন: ‘যদি বাসভাড়া কমানোর বিষয়টি অপরাধ হয়ে থাকে, যদি ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে রেলওয়ের ভূমি রক্ষা করা অপরাধ হয়ে থাকে, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ করাটা অপরাধ হয়ে থাকে, যদি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাওয়াটা অপরাধ হয়ে থাকে- তবে এই অপরাধ আমৃত্যু করে যাবো।’ তাঁর এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা এতখানিই সৎ-সাহসের পরিচয় দেয় যে, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায় আমাদের মাথা নুয়ে আসে। কী বর্বর এই হত্যাকা-! পিতাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য পুত্রকে হত্যা করা। নারায়ণগঞ্জের সকলের ঘৃণা সেই পরাক্রমশালী আওয়ামী লীগপন্থী পরিবারটির প্রতি ফেটে পড়েছে। অথচ কী পরিতাপের বিষয় আজ সাতবছর অতিবাহিত হলেও এ নির্মম হত্যাকা-ের অভিযোগপত্র আদালতে দেয়া হলো না। আর এ বিচার না হওয়া আমাদের কষ্টটাকে আরও বহুগুণ বারিয়ে দিয়েছে।

শুধু ত্বকীই নয় এর পরে আরও যাদের জীবনের আলো নির্মম ভাবে চিরতরে নিভিয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা; আমরা চাই সে অন্যায়কারীদের প্রতি ক্রোধ ও ঘৃণায় প্রতিবাদী হোক মানুষ। আর শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় এ প্রতিবাদে অংশ নিক দেশের সমুদয় জনগণ। আমরা বিশ্বাস করি, পুত্রশোকগ্রস্ত পিতা রফিউর রাব্বি কুণ্ঠাহীন সাহস ও তেজে যে লড়াই করে যাচ্ছেন এ লড়াই তাঁর একার লড়াই নয়, আমাদের সকলেরই লড়াই- স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে হলে, এ লড়াইয়ে সকলেরই অংশ নিতে হবে, নইলে আমরা কেউই শেষ পর্যন্ত এ দুর্বৃত্তায়ন থেকে রক্ষা পাবো না।

ড. হায়াৎ মামুদ: শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক

সব খবর
মতামত বিভাগের সর্বশেষ