বুধবার ২০ নভেম্বর, ২০১৯

ট্র্যাজিক হিরো এসপি হারুন

শুক্রবার, ৮ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৫০

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: গুম, খুন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডসহ নানা নেতিবাচক খবরে বছরজুড়ে সারাদেশে বারবার আলোচনায় থাকে নারায়ণগঞ্জ। এই জেলায় এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে দখলদারিত্ব নেই। অভিযোগ ছিল দখলদারিত্বের এই শহরে পুলিশও হয়ে গিয়েছিল দখল। সাধারণ মানুষ তাদের অভিযোগ নিয়ে পুলিশের কাছে যাবে তারও জো ছিল না। কিন্তু হঠাৎ যেন সব বদলে দিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ। যিনি একইসাথে আলোচিত ও সমালোচিত।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক কয়েকদিন পূর্বে জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে নারায়ণগঞ্জে যোগদান করেন তিনি। নির্বাচন শেষ হবার পর চলতি বছরের শুরুতেই শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়ায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সংবাদ সম্মেলনে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যু, মাদক, ঝুট সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কথাও রেখেছিলেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তার নেতৃত্বে অনেক রাঘববোয়াল যারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াতেন তাদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ। জনপ্রতিনিধির আড়ালে যারা মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির সাথে জড়িত কিন্তু পুলিশ তাদের ধরা তো দূরের কথা ভুক্তভোগীর অভিযোগ পর্যন্ত থানায় গ্রহণ করা হতো না তাদের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েছেন, এনেছেন আইনের আওতায়। দায়িত্ব অবহেলা কিংবা অনিয়মের সাথে জড়িত এমন পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও তড়িৎ এ্যাকশন নিয়েছেন তিনি।

নারায়ণগঞ্জে ১১ মাস দায়িত্ব পালন করেছেন এসপি হারুন। অল্প সময়ে ভালো কাজের জন্য মানুষের কাছ থেকে সুনাম কুড়িয়েছেন। হয়ে উঠেছিলেন ‘সাধারণ মানুষের এসপি’, পেয়েছিলেন ‘বাংলার সিংহাম’ তকমা। এসপি হারুন অর রশীদের জনবান্ধব কর্মকা-ের জন্য নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসায়ী, এমনকি বিভিন্ন পাড়ার ছিচকে চোরও আতঙ্কের মধ্যে ছিল- কখন কোন অপকর্মের জন্য এসপির আইনের থাবা এসে তার উপর পড়বে। তিনি নারায়ণগঞ্জের সব থানায়, গ্রামে, পাড়ায় রাজনৈতিক সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার ছিচকে চোরের কাছেও একটি বার্তা অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন। তা হলো- আপনি যত শক্তিশালী হোন, যে দলের লোকই হোন বা অনেক টাকার মালিক হোন, আইন ভেঙে কোন ধরণের অপকর্ম করে পার পাবেন না। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক, যত বড়ই হোক, ভয় পাবেন না, রুখে দাঁড়ান। মনে রাখবেন পুলিশ আপনার পাশে আছে।

প্রতিদিন তিনি সাধারণ মানুষের অভিযোগ শুনতে তার কার্যালয়ে আসা অসংখ্য মানুষকে সাক্ষাৎ দিয়েছেন, তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরাসরি ওই থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন। সাধারণ মানুষ তাকে বলিউডের একটি সিনেমার নায়ক চরিত্রের আদলে ‘বাংলার সিংহাম’ উপাধিও দিয়েছিল। স্থানীয় পত্রিকাগুলো খুললেই দেখা যেতো ‘নারায়ণগঞ্জে একজন ব্যতিক্রম পুলিশ সুপার’, ‘এসপি হারুনের এ্যাকশনে আতঙ্কিত দুর্বৃত্তরা’, ‘রুখে দাড়িয়েছেন এসপি বদলে যাচ্ছে পরিস্থিতি’, ‘নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে পালাচ্ছে অপরাধীরা’- এসপি হারুনকে নিয়ে এমন সব প্রশংসনীয় প্রতিবেদন। একাধিক জাতীয় গণমাধ্যমেও তাকে নিয়ে প্রশংসনীয় প্রতিবেদন প্রচারিত হয়েছে।

এই যে তিনি এভাবে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে পেরেছেন, এটা একজন এসপির জন্য সত্যিকার অর্থেই একটি সাফল্য। আর এই সাফল্যের কারণেই তিনি নারায়ণগঞ্জের সহজ-সরল সাধারণ মানুষের বাহবা পেয়েছেন। কিন্তু শেষটা ভালো যায়নি আলোচিত এই পুলিশ কর্মকর্তার। নানা অভিযোগে সমালোচিত হয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে উঠেছে চাঁদাবাজির অভিযোগও। পুলিশ হেডকোয়ার্টারে বদলি হয়ে যাবার সময় বিদায়ী সংবর্ধনায় আবেগ আক্রান্ত হয়ে কান্নাও করেছেন তিনি। এসপি হারুনের এই কান্নায় কাঁদতে পারতো পুরো নারায়ণগঞ্জবাসী। কিন্তু তা হয়নি। অন্য রকম নারায়ণগঞ্জের স্বপ্ন দেখেছিল এখানকার মানুষ। আর এই স্বপ্নের সারথি ছিলেন এসপি হারুন অর রশীদ। অথচ শেষটায় তিনি ‘ট্র্যাজেডি’র করুণ শিকার। কোন বিউগল বাজেনি তাঁর বিদায়ে। নারায়ণগঞ্জ ছাড়লেন অভিযোগের পাহাড় নিয়ে। শেষ পর্যন্ত এসপি হারুন ট্র্যাজিক হিরো হয়েই রইলেন। দেশের বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাঁর বিরুদ্ধে তুলেছে চাঁদাবাজির অভিযোগ। গণমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে তুমুল লেখালেখি। নগরবাসীর মধ্যে যেমন রয়েছে আশা জাগানিয়া স্বপ্ন ভঙ্গের জন্য গোপন হাহাকার তেমনি রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠা বিতর্কিত কর্মকা-ের জন্য প্রকাশ্য ক্ষোভ।

 

সব খবর
নগর বিভাগের সর্বশেষ