বুধবার ১৪ নভেম্বর, ২০১৮

চোখ ধাঁধানো ডেকোরেশন আর আলোকসজ্জার অন্তরালে যা হয়

মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ২২:০০

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: নগরীর অলিতে গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ফাস্টফুড ও রেস্তোরা। বাহারী নাম ও সাজসজ্জামন্ডিত এ সকল রেস্তোরাগুলোতে পাওয়া যায় বাহারী পদের সব খাবার। শুধু তাই নয় চোখ ধাঁধানো ডেকোরেশন আর লাল-নীল আলোতে মুগ্ধ হয়ে এসব রেস্তোরায় ভিড় করছেন ভোক্তারা। তবে অভিজাত খাবারের প্রতিষ্ঠানগুলোতে খাবার পরিবেশের দৃশ্যটাও অসাধারণ। কোন কোনটাতে ওয়েল কাম জুসও দেয়া হয়। ভোক্তাকে স্যার বলতে বলতে অস্থির ওয়েটাররা। কিন্তু বাহারী নাম ও সাজসজ্জার মোড়কে মোড়ানো এ সকল রেস্তোরাগুলোতে বিভিন্ন নামের যে খাবার গ্রাহককে পরিবেশন করা হচ্ছে তা কতটা স্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি ও মানসম্মত সে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।

অথচ বাইরে থেকে বা ভেতরে গিয়েও বুঝার উপায় নেই সুসাধু খাবার গুলো অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে তৈরী করা। এমনকি রান্না-ঘরের অবস্থাও বেহাল। ভুল করে কেউ রান্নাঘরে ঢুকে পড়লে দম বন্ধ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে উৎকুট গন্ধে। কোন কোনটার মেজেতে স্যাঁত স্যাঁতে অবস্থা। রান্নার কাজে নিয়োজিত বাবুর্চী, সেইফ, কারিগরদের পোশাক বা স্বাস্থ্যগত বিষয়েরও কোন বালাই নেই। হোটেল-রেস্তোরা ও ফাস্ট ফুডের এমন চিত্র বেরিয়ে এসেছে ভ্রাম্যমান আদালতের সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু অভিযানের মধ্যদিয়ে।

সূত্র মতে, কেবল শহরের মধ্যেই প্রায় ৫ থেকে ৬’শ ছোট-বড় রেস্তোরা ও ফাস্টফুড রয়েছে। এসব রেস্তোরাগুলোর বেশিরভাগ খাবারই মানসম্মত নয়। অন্যদিকে তৈরিও হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। এ নিয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিজাত এসব রেস্তোরা ও ফাস্টফুডকে বেশ কয়েকবার জরিমানাও করা হয়েছে।

এছাড়া অধিকাংশেরই আনুাঙ্গিক কোন কাগজপত্র নেই। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি রেস্তোরার কাছে সিটি কর্পোরেশন অনুমোদিত ট্রেড লাইসেন্সে থাকতে হবে। তার পাশাপাশি জেলা প্রশাসন কর্তৃক আরো ৫টি লাইসেন্স থাকতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ রেস্তোরার মালিকরাই ট্রেড লাইসেন্স ব্যতিত আর কোন কাগজ রাখেন না। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরী, পচা-বাসি খাবার গ্রাহককে পরিবেশন করা, মেয়াদ উত্তীর্ণ উপাদান দিয়ে খাবার তৈরি, রেস্তোরার সাজসজ্জার নামে খাবারের পরিমানের তুলনায় বেশি দাম রাখা ইত্যাদি অনিয়ম রেস্তোরাগুলোতে হয়ে থাকে প্রতিনিয়ত।

নগরীর খ্যাতনামা রেস্তোরাগুলোর মধ্যে রয়েছে দি গ্র্যান্ড হল, সুগন্ধা প্লাস, সুগন্ধা ফাস্টফুড, মেলা ফুড ভিলেজ, প্যারিস এন্ড বাগেট ফেমিলি মার্ট, মুঘল-এ-আজম, চায়না জাংশন, সুমাইয়া রেস্তোরা, নুরুল ইসলাম রেস্তোরা, ফুড মাসালা রেস্তোরা, বৈশাখী বিরিয়ানী হাউজ। খ্যাতনামা রেস্তোরাগুলোর প্রত্যেকটিতেই পরিচালিত হয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ জরিমানা। এমনকি কয়েকটি রেস্তোরাকে একাধিকবারও জরিমানা করা হয়েছে। প্রতিটি অভিযানে উঠে এসেছে বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির চিত্র।

পরিচালিত কয়েকটি অভিযানের চিত্র:

১৫ অক্টোবর (সোমবার) বিকেলে সদর উপজেলার জালকুড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে পচা বাসি খাবার বিক্রির অভিযোগে ভোজন বিলাস ও ফকির রেস্তোরা নামে দুইটি খাবার হোটেলের মালিককে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমান আদালত। এসময় দুটি হোটেল থেকেই বিপুল পরিমানের পচা বাসি খাবার ধ্বংস করা হয়।

১৪ অক্টোবর (রোববার) ফতুল্লার শিবু মার্কেটে অবস্থিত সুন্দরবন প্লাস রেস্তোরাকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরী, পরিবেশন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ব্যতিরেকে ব্যবসা পরিচালনার দায়ে ৭০ হাজার টাকা অর্থদন্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

৯ সেপ্টেম্বর (রোববার) বিকেলে বঙ্গবন্ধু সড়কে অবস্থিত দি গ্র্যান্ড হল রেস্তোরা, চায়না জাংশন ও ফুড মাসালা রেস্তোরা হোটেল রেস্তোরা আইন ২০১৪ অনুযায়ী তিন রেস্তোরার লাইসেন্স না থাকায় ৭০ হাজার টাকার অর্থদন্ড ও একজনকে আটক করেছে ভ্রাম্যমান আদালত।

দি গ্রান্ড হল রেস্তোরার ৫টি লাইসেন্সের মধ্যে তিনটি না থাকায় দি গ্র্যান্ড হল রেস্তোরার ম্যানেজার ওয়াহিদুল রহমানকে আসামি করে ২০১৪ সালের ৭ ধারায় ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা। অন্যদিকে চায়না জাংশন রেস্তোরার মেয়াদ উত্তীর্ণ ট্রেড লাইসেন্স থাকায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ফুড মাসালা রেস্তোরায় লাইসেন্স না থাকায় ফুড মাসালার স্বত্বাধীকারির ছোট ভাই এবং ম্যানেজার নাঈমকে আসামী করে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু টাকা পরিশোধ না করায় নাঈমকে আটক করে ভ্রম্যমাণ আদালত।

১০ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহরের নিতাইগঞ্জের মদিনা মার্কেটের বেকারী ও ৩টি খাবার হোটেলে অভিযান চালায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। এরমধ্যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রান্না করার কারণে মেসার্স বাদশাহ হোটেলের মালিক মোহাম্মদ হোসেনকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এসময় খাজা গরীবে হাউজ বিরিয়ানি হাউজে ম্যাজিস্ট্রেট প্রবেশ করলে রান্না ঘরের দরজা তালা বন্ধ করে রাখা হয়। ম্যাজিস্ট্রেটদের জানানো হয় তারা বিরিয়ানী কিনে বিক্রি করে। পরবর্তীতে দরজা খুললে দেখা যায় সেখানে খাবার তৈরির সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে। নষ্ট ফ্রিজে মসলা রাখা হয়েছে । মসলায় মাছি পড়ে আছে। সবজি কেটে মাটিতে ফেলে রাখা হয়েছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করা হচ্ছে খাবার। পরে বিরিয়ানি হাউজের মালিক মোহাম্মদ রফিককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। মা হোটেল এন্ড রেস্তোরার লোকজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি টের পেয়ে নিজেদের রান্না ঘর দ্রুত পরিষ্কার করে। কিন্তু না ঢেকে খাবার রাখা ছিল। ছিল মাছির ভনভন। নেই বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা। এসব কারণে মা হোটেল এন্ড রেস্তোরার মালিক নসরুল চৌধুরীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

৭ আগস্ট (মঙ্গলবার) বিকেলে শহরের গলাচিপা মোড়ে অবস্থিত ‘মুঘল-এ-আজম’ রেস্তোরার লাইসেন্স না থাকায় এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরীর জন্য দুই মামলায় ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমান আদালত।

৫ জুলাই (বৃহস্পতিবার) দুপুরে চাষাঢ়া সলিমুল্লাহ রোড এলাকার আঙ্গুরা শপিং কমপ্লেক্সে অবস্থিত সুমাইয়া রেস্টুরেন্ট এন্ড চাইনিজকে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর খাবার বিক্রি এবং ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে না পারায় হোটেল ও রেস্তোরা আইন ২০১৪ এর ৭ ও ১৯ ধারা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৩৮ ও ৪৩ ধারা অনুযায়ী ৭৫ হাজার টাকা অর্থদন্ড দেয়া হয়। একই আইনে চাষাঢ়া রেলগেট এলাকার বৈশাখী বিরায়ীনী হাউজকে ২০ হজার টাকা অর্থদন্ড দেয়া হয়।

১১ এপ্রিল (বুধবার) বিকেলে চাষাড়া সুগন্ধা ফাস্টফুডকে ১০ হাজার, নবাব সলিমুল্লাহ রোডের সুমাইয়া রেস্তেরাকে ৫ হাজার এবং নুরুল ইসলাম রেস্তেরাকে ১ হাজার টাকাসহ মোট ১৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

৭ জুন (বৃহস্পতিবার) দুপুরে নিম্মমানের খাবারের জন্য শহরের জামতলার মেলা ফুড ভিলেজ ও প্যারিস এন্ড বাগেট ফেমিলি মার্ট রোস্তোরকে হোটেল রেস্তোরা ও ভোক্তা অধিকার আইনে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমান আদালত।

মজার বিষয় হচ্ছে অভিযান চালালে প্রত্যেকটি খাবার হোটেল-রেস্তোরা ও ফাস্টফুডের দোকানের উল্লেখিত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

এদিকে হোটেল-রেস্তোরা ও ফাস্টফুডের দোকানে অভিযানগুলোর অধিকাংশই পরিচালিত হয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উজ্জ্বল হোসেনের নেতৃত্বে। ম্যাজিস্ট্রেট উজ্জ্বল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সাধারণত ছোট রেস্তোরাগুলোকে আমরা টার্গেট করি না। আমাদের টার্গেট বড় রেস্তোরা অর্থ্যাৎ খ্যাতনামা রেস্তোগুলো। কেননা বড় রেস্তোরাগুলোই মানসম্মত পরিবেশ, লাইসেন্স ও খাবার মান বজায় রাখতে সক্ষম হয়। তারা চার্জও করে বেশি। আমরা নিশ্চিত করতে চাই, গ্রাহকগণ বেশি টাকায় যা খাচ্ছে তা মানসম্মত কিনা। আর বড় রেস্তোরাগুলোকে জরিমানা করলে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও তৈরি হয়। নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি বড় রেস্তোরাগুলোতে অনেক সমস্যাই দেখা যায়। যেমন নডুলস, চিকেন ফ্রাইয়ের মতো খাবারগুলো তারা ফ্রিজে প্রিজার্ভ করে রাখে। মসলাও সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে না। নোংরা পরিবেশে খাবার তৈরি করে, খাবারের পরিমানের তুলনায় দাম বেশি রাখে। অন্যদিকে অধিকাংশ রেস্তোরার লাইসেন্স থাকে না। আমরা এ বিষয়গুলোতে মূলত নজর রাখি।’

গ্রাহকদের সচেতন হবার পরামর্শ দিয়ে ম্যাজিট্রেট উজ্জ্বল হোসেন বলেন, ‘আমরা সবসময় সব অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। তাই গ্রাহকদের বলবো, একটু সচেতন হতে। গ্রাহকদের প্রতি একটা আহ্বান থাকবে, আপনারা যে রেস্তোরায় যাচ্ছেন অবশ্যই সেই রেস্তোরার রান্নাঘর পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শন না করতে পারলে অন্তত রান্নার পরিবেশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। তাহলে রেস্তোরার কর্তৃপক্ষ কিছুটা হলেও সচেতন হবেন। আর এটা প্রতিটি গ্রাহকের অধিকার।’

সব খবর
নগর বিভাগের সর্বশেষ