মঙ্গলবার ১৬ জুলাই, ২০১৯

কোকাকোলা ও বেনিয়াগিরি

বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১২:০৪

ফরহাদ মজহার

কোকাকোলা ১
...... ...

আজ একুশে ফেব্রুয়ারি!
এবার দেখছি, পানীয় কম্পানি কোকাকোলা আমাদের বাংলাভাষা শেখাচ্ছে। এটাও জানলাম, বাংলাদেশে তাদের প্রধান কর্মকর্তা একজন ভারতীয়।

সাধু! সাধু! বাংলা ভাষার এখন দরকার হয়ে পড়েছে কোকাকোলা কোম্পানি! শহিদ মিনারে কোকাকোলার লাল সাদা পতাকা উড়ুক! হায় বাংলা ভাষা!একুশে ফেব্রুয়ারিতে তোমাকে নিয়ে বাংলাদেশে মেরুদন্ডহীন সংকৃতিওয়ালাদের দৌরাত্মে এই অপমানজনক কর্পোরেট তামাশাটুকুও সহ্য করতে হচ্ছে।

কোকাকোলা বাংলাদেশে `মহান একুশের শক্তি বুকে ধারন করে নিখোঁজ বাংলা ভাষার খোঁজ করছে`। কর্পোরেট বুদ্ধি আর কাকে বলে! তবে তাদের ফেইসবুক পাতায় নিখোঁজের তালিকায় দেখলাম সংস্কৃত ও তৎসম শব্দের ফুলঝুরি। এমনকি সংস্কৃত শব্দ যেখানে বঙ্গীয় হয়ে উঠতে চায় সেই তদ্ভব শব্দও এই `নিখোঁজ` তালিকায় নাই।

কোকাকোলার নিখোঁজ বাংলার উদাহরণ: সংশপ্তক, শ্লোক, সম্পৃক্ত, অয়োময়, প্রত্যুৎপন্নমতি, যুগসন্ধি, সমীচিন, অবিমিশ্র, বহুব্রীহি, পদ্মলোচন, মৃণ্ময়, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, অমর্ত্য, বিপ্রতীপ, ইত্যাদি। সংস্কৃতের মতো আরবি, ফারসি, উর্দু, ওলন্দাজ, ইংরেজি কিম্বা অন্য যে কোন কোন ভাষা থেকে আসা যেসকল শব্দ আমরা ব্যবহার করি তারা কোকাকোলার এই তালিকায় নাই। অন্যত্র যে শব্দ হাতে নিয়ে বিজ্ঞাপন চলছে তার একটিও `নিখোঁজ` নয়। প্রাকৃত বাংলা, দেশি বা খাঁটি বাংলা নিখোঁজ মোটেই নয়, হামেশাই আমরা সেইসব শব্দ বিস্তর চলতে ফিরতে ব্যবহার করি।

এই তালিকায় কি বুঝি? কোকাকোলা এইসব শব্দ দিয়ে আমাদের সংস্কৃত শেখাতে চায়! তাই কি? কোকাকোলার ভারতীয় কর্মকর্তা এটাই প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন বাংলা ভাষা আসলে সংস্কৃত, কিম্বা সংস্কৃতের সমতুল্য!

ঠিক যে বাংলাদেশীরা সংস্কৃত, তৎসম, অর্ধ-তৎসম এখন কম ব্যবহার করে, কোকাকোলা এই অভ্যাস কি বদলাতে চায়? `প্রমিত বাংলা`র নামে বাংলাকে সংস্কৃত ভাষা ও ব্যাকরণের অধীন রাখবার রাজনীতি এখনো প্রবল ও প্রকট। আরবি, ফারসি, উর্দু, ওলন্দাজ, ইংরেজি কিম্বা অন্য কোন ভাষা থেকে আসা শব্দ -- নিখোঁজ হোক বা না হোক -- তাতে অবশ্য কোকাকোলার কিছুই আসে যায় না।

মিস্টার কোকাকোলা, আপনাদের বলি, `নিখোঁজ বাংলা শব্দ` কথাটার মানে কী আসলে? ঔপনিবেশিক আমলের সাহেব আর পণ্ডিত মিলে বাংলা ভাষার জবরদস্তি সংস্কৃতায়ন, পুরানা অথচ অতি চেনা কলোনিয়াল প্রকল্প। যার বিরুদ্ধে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রবীন্দ্রনাথ, দীনেশ চন্দ্র সেন, শহীদুল্লাহ প্রমুখেরা দাঁড়িয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ভাষার স্বাভাবিক বিকাশ ব্রাহ্মণ পণ্ডিত আর ইংরেজ সাহেবরা মিলে রুদ্ধ করেছিল, যার কাফফারা এখনও বাংলাদেশে আমাদের গুনতে হচ্ছে। কারন বাংলা সাহিত্যের ভাষা একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ যেখানে সাধারণ মানুষের ভাষা আর সাহিত্যের ভাষার মধ্যে ব্যবধান বিশাল।

কোকাকোলা কোম্পানি এবং তার ভারতীয় অধিকর্তার `নিখোঁজ` বাংলা শব্দ প্রকল্প একান্তই বাজারি বা ব্যবসায়ী বিজ্ঞাপন। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তাদের চেষ্টা দিল্লির হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অংশ। এর মধ্যে বাংলা প্রীতি নাই, বরং সংস্কৃত এবং দিল্লীর প্রতি প্রভূত গোলামি রয়েছে।

বাংলার কবি, নাট্যকার, সাহিত্যিক, আউল, বাউল, দরবেশ ফকির কেচ্ছাদার,বয়াতিরা তাঁদের কাব্য, গান, নাটক, থিয়েটার, ভাবগান,পালা গান,কীর্তন,ভক্তিগান,শব্দগানসহ নানান চর্চার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটাচ্ছে। হারিয়ে যাওয়া শব্দ ঘষে মেজে আবার চকচকে আধুলির মতো নতুন ভাবে নিত্যই ব্যবহার করছে।কোকাকোলার বোতলে বাংলা শব্দ ছাপিয়ে তাকে পণ্য বানাবার এই চেষ্টা ঘৃণ্য বেনিয়াগিরি।

নিজের ভাষাকে ভালবাসুন, কোকাকোলার বোতলের বিজ্ঞাপনের কারনে কোকাকোলার বোতলকে মোটেও নয়। আপনার ভাষা ব্যবহারকে অপমান করবার জন্যই এই বেনিয়াগিরি।

আর ভালবাসুন, বাংলাভাষার ভাষার কারিগরদের! কোকাকোলা কোম্পানিকে নয়।

কোকাকোলা বয়কট করুন। সেই টাকা দিয়ে বাংলা বই কিনুন।

(নজর রাখুন, এরপর আসছে, `কোকাকোলা ও প্যালেস্টাইন`। কোকাকোলা খাওয়া আর প্যালেস্টাইনের জনগণের রক্ত পান সমার্থক --আপনি কি জানেন কেন একথা বলে ২০০৫ সালে ফিলিস্তিনের জনগণ কোকাকোলা বয়কটের ডাক দিয়েছিল?)

 

মূল পোষ্টটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে ফরহাদ মজহার

সব খবর
সোশাল মিডিয়া বিভাগের সর্বশেষ