মঙ্গলবার ১১ ডিসেম্বর, ২০১৮

সাক্ষাৎকার

কেউ ওসমানলীগ, কেউ চুনকালীগ, আমি করি আ’লীগ: আনোয়ার হোসেন

সোমবার, ৮ অক্টোবর ২০১৮, ১৯:১৭

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: আলহাজ্ব আনোয়ার হোসেন। বতর্মান নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি। এছাড়ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার কারাবরন করেছেন আনোয়ার হোসেন। আবার নামাজের ইমামতিও করেছেন। প্রতিবাদ করতে গিয়ে যেমন লাঞ্ছিত হয়েছেন আবার রাস্ট্রের প্রধান ব্যক্তির মাধ্যমে সম্মানিতও হয়েছেন তিনি। নগরীতে দুই ধারায় বিভক্ত আওয়ামী রাজনীতির বেড়াজাল থেকে নিজেকে নিরাপদ দুরত্বে রেখে নিরবে এগিয়ে যাচ্ছেন আনোয়ার হোসেন। প্রেস নারায়ণগঞ্জ এর সাথে আলোচনায় আরো অনেক বিষয় উঠে এসেছে। আনোয়ার হোসেনের সাক্ষাৎকারটি প্রেস নারায়ণগঞ্জ এর পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: আপনি তো প্রথমে ছাত্র রাজনীতি দিয়েই রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন? সেটা কবে? এবং রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার গল্পটা আপনার মুখেই শুনি।

আনোয়ার হোসেন: ১৯৭০ সালে যখন বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষন দেন রেসকোর্স ময়দানে তখন আমার সেজো ভাইয়ের সাথে আমি সেখানে যাই। মাত্র মেট্টিক পরীক্ষা দিয়েছি। তখন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে আমি খুব আবেগ আপ্লুত হয়ে যাই। তখন মনে হয়েছিল আমি যদি বঙ্গবন্ধুর মতো ভাষণ দিতে পারতাম! আমি যদি তার মতো বড় নেতা হতে পারতাম! বাসায় এসে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ভাবতাম। নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলে পড়াশুনা করতাম। ভাল ছাত্র ছিলাম। তোলারাম কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হলাম। কলেজে আসার পর দেখলাম ছাত্র নেতারা ভাল ছাত্রের সন্ধানে ঘুরতো। বিভিন্ন ছাত্রকে রাজনীতিতে ঢুকানোর চেষ্টা করতো। ১৯৭৩ সালে আমি ডিগ্রির প্রথম বর্ষের ছাত্র। তখন তৎকালীন ছাত্র নেতারা বিভিন্ন পর্যায়ে খুঁজে আমাকে তোলারাম কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক দেয়া যায় কি না সেটা বিবেচনা করছিল। তখন তারা আমার কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসলো। আমি তোলারাম কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হবো এরকম স্বপ্ন আমার ভিতরে ছিল না। কিন্তু তখন আমি সম্মতি প্রকাশ করলাম। আমাকে তোলারাম কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনয়ন দিল। ভিপি হিসেবে মনোনয়ন দিল শহীদ বাঙ্গালীকে। তখন রাজনীতিতে দুটো বিভেদ ছিল শহরের উত্তর-দক্ষিণ। একটি হলো সামসুজ্জোহা আরেকটি হলো আলী আহম্মদ চুনকা। তখন জেলা আওয়ামীলীগের প্রেসিডেন্ট ছিলেন একেএম সামসুজ্জোহা। তিনিই ছাত্রলীগ দেখাশুনা করতেন। এক পর্যায়ে আমাকে নমিনেশন দেয়ার ফলে একটি শিবিরে বিভক্তি দেখা দিল। নাজিম উদ্দিন মাহমুদ, আলী আহম্মদ চুনকা এরা ছিল। একেএম সামসুজ্জোহার যে আশীর্বাদ টুকু ছাত্রলীগের প্রতি ছিল সেটা তারা মেনে নিতে পারেনি। তখন তারা মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ নামের একটি ছেলেকে আমার বিপরীতে ছাত্রলীগে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মনোনয়ন দিল। এটা নিয়ে আমাদের মধ্যে একটি বিভেদের সৃষ্টি হলো। তখন আমি আমার মতো ওরা ওদের মতো নির্বাচন করতে শুরু করলো। নির্বাচনের একদিন আগে ছাত্রলীগের সাথে ছাত্র ইউনিয়নের একটি সমঝোতা হলো। ছাত্রলীগ থেকে সাধারণ সম্পাদক দেয়া হবে আর ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ভিপি দেয়া হবে। সে সময় আমার ভাই ছাত্র ইউনিয়ন করতো। ভাই রাতে এসে আমাকে বললো, তুমি কি পুলিং এজেন্ট দিতে পারবা? আমি বললাম, হ্যা দিতে পারবো। নির্বাচনের দিন আমি যখন কলেজে আসলাম তখন আমাদের ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট সমঝোতার ব্যাপারটা বললো। তখন আমরা যৌথ প্যানেলে নির্বাচন করলাম। সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করলাম। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই আমি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত হই।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: রাজনীতিতে আসার পিছনে কার অনুপ্রেরণা ছিল?

আনোয়ার হোসেন: বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার একটা দুর্বলতা ছিল। তার আদর্শ আমাকে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: পরিবার থেকে কোন বাঁধা আসে নি?

আনোয়ার হোসেন: পরিবার থেকে বাঁধা ওইরকম কিছু না। ৭৫ এর পরে যখন আন্দোলন করতাম তখন পরিবার থেকে একটু বাঁধা ছিল।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: আপনি বর্তমানে মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি একই সাথে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধি এই দুটোতে সমন্বয় কিভাবে করছেন? কোন সমস্যা হচ্ছে কি না?

আনোয়ার হোসেন: সমস্যা না। আমি তো রাজনীতি চিরজীবনই করে আসছি। রাজনীতি করার মধ্য দিয়েই আমার উত্থান। শুধু যে দুইটা পদ তাও না। আমি মর্গ্যান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান, নারায়ণগঞ্জের রেড ক্রিসেন্ট চেয়ারম্যান এই সমস্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কিছুটা ব্যাঘাত হয়। তারপরও রাজনীতি করতে হয়।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী রাজনীতিতে দুটি মেরু আলোচিত, মানে শহরের উত্তর ও দক্ষিণ মেরু, এটা কেন?

আনোয়ার হোসেন: এটা হলো বংশানুক্রমে। আদর্শিক কোন দ্বদ্ধ না। পারিবারিক কোন্দল। এটা আমি জন্মের পর থেকেই দেখছি। আগে ছিল ওইদিকে আলমাস আলী এদিকে খান বাহাদুর ওসমান আলী। ওইদিকে আলী আহম্মদ চুনকা এইদিকে একেএম সামসুজ্জোহা আবার এদিকে নতুন করে হইছে আইভী আর শামীম ওসমান। আমি বরাবরই দুই গ্রুপের বাহিরে ভিন্ন অবস্থান করি। আমি উত্তর গ্রুপেও নাই দক্ষিণ গ্রুপেও নাই। আমি মধ্য পন্থায়। আমার রাজনীতি করাই উদ্দেশ্য। আমি গ্রুপিং রাজনীতি বিশ্বাস করি না। নেত্রীও জানে আমি এই দুই গ্রুপের বাহিরে রাজনীতি করি। আমার আদর্শ বঙ্গবন্ধু, আমার নেত্রী শেখ হাসিনা, এই রাজনীতিই আমি করি।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: ২০০৩ নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা এবং ২০১১ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আপনি নাসিকের বর্তমান মেয়র আইভির পক্ষে কাজ করেছেন, কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচনে তার পক্ষে আপনাকে দেখা যায়নি। মাঝে শামীম ওসমানের সাথে, আবার সরে এসেছে কেন?

আনোয়ার হোসেন: আমি তো রাজনীতি করি, আমারও তো কিছু চাওয়া পাওয়ার ব্যাপার আছে। ২০০৩ সালে পৌরসভার যখন নির্বাচন হয় তখন আইভী দেশে ছিলো না। দেশের বাহিরে ছিলো। তখন আমি আওয়ামীলীগের একজন সিনিয়র পর্যায়ের নেতা। সেই সময় দলের নেতৃত্ব আমার হাতেই ছিল। সেই ভাবেই আমি আগাচ্ছিলাম। নির্বাচনের সব প্রস্তুতি আমার ছিল। আমাকে দল মনোনয়ন দিল। কিন্তু এমন একটা সময়ে আইভী দেশে চলে আসলো। তার বাবার একটা নাম ডাক ছিল। তিনি এসে সবাইকে ম্যানেজ করলেন। স্বার্থের সময় কিন্তু তারা এক হয়ে যায়। আমার মতো কাউকে তখন তারা মেনে নিতে পারেনি। শামীম ওসমানের কর্মীরা আইভীকে সমর্থন করলো। দল আইভীকে নমিনেশন দেয়াতে আমি সেক্রিফাইস করলাম। দলের সিদ্ধান্ত মেনে তখন আইভীর নির্বাচন করেছি। তারপর ২০১১ সালের সিটি নির্বাচন। তখন বাসের ভাড়া বাড়ানোর বিপক্ষে আমরা আন্দোলন করি। সেটা নিয়ে ডিসি অফিসে একটি মিটিং হয়। তখন শামীম ওসমান বাস মালিকদের পক্ষে অবস্থান নেয়। আমরা তো যাত্রীদের পক্ষে। এটা নিয়ে আইভী তখন আমাদের পক্ষে ছিল। কবরী তখন এমপি, কবরীও আমাদের পক্ষে ছিল। এটা নিয়ে মিটিং এ শামীম ওসমানের সাথে আমাদের এক পর্যায়ে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়। তখন আমরা ওই জায়গা থেকে বের হয়ে আসি। তো শামীম ওসমানের সাথে আমার বিরোধীতার কারণে আমি সেইদিন আইভীর পক্ষে সিটি নির্বাচনে অবস্থান নেই। দল শামীম ওসমানকে নমিনেশন দেয়ার পরও কিন্তু আমি আইভীর পক্ষে অবস্থান নেই। অনেক পরিশ্রমের ফলে আইভীকে আমরা সিটি মেয়র হিসেবে জয় লাভ করাতে সক্ষম হই। আমার একটি লক্ষ্য ছিল। যেহেতু শামীম ওসমানের সাথে আমার বিরোধ। আমার একটা উদ্দেশ্য ছিল আইভীকে নিয়ে আমি রাজনীতি করব। কিন্তু নির্বাচন হওয়ার পরে আইভীকে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে আমি পাচ্ছিলাম না। এদিকে শামীম ওসমানের সাথে আমার বিরোধ। শামীম ওসমান বার বার এটা করতে চায় ওটা করতে চায়। আমি বার বার আইভীকে অবগত করার পরেও কোন সহযোগিতা পাইনি। না পাওয়ার ফলে আমি চিন্তা করলাম আইভী তো রাজনীতিতে আসে না। সে তার সিটি কর্পোরেশন নিয়ে আছে। বার বার ডাকার পরেও সে আসে না। তো এরমধ্যে নাসিম ওসমান মারা গেল। মারা যাওয়ার পরে উপ-নির্বাচন হলো। আমি তখন প্রার্থী হলাম। প্রার্থী হওয়ার পরে মহাজোট থেকে সেলিম ওসমানকে দিল। তো ওই সময়ে আমি আইভীর কাছ থেকে কোন সহযোগিতা পেলাম না। সেলিম ওসমানকে সমর্থন দিলাম। সেই সুযোগে শামীম ওসমান আমার বাসায় আসলো। আমার কাছে মাফ চাইলো, ক্ষমা চাইলো। বললো, ভাই আপনি রাজনীতি করেন। আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে। আমি তখন চিন্তা করলাম আইভী যেহেতু রাজনীতি করবে না, রাজনীতি তো করতে হবে রাজনীতিবিদের সাথেই। তো শামীম ওসমান যেহেতু ভুল স্বীকার করেছে তার সাথেই আবার রাজনীতি করি। পরে মহানগরের কমিটি করার সময় শামীম কথা দিয়ে কথা রাখলো না। সে কইলো আপনি যেভাবে কইবেন মহানগরের কমিটি সেভাবেই হইবো। আপনি রাজনীতি করবেন আমি আপনাকে সব সহযোগিতা করবো। আপনি শুধু নেতা, নেতার মতো থাকবেন। আমি সব ব্যবস্থা করবো। তো সে কথা দিয়ে কথা রাখলো না। সে মহানগরের কমিটি করার সময় হস্তক্ষেপ করলো। এটা করবেন না ওটা করবেন না। তারপরও মেনে মহানগরের কমিটি করলাম। তারপরে সিটি নির্বাচনে তারা আমাকে সমর্থন দিল। কিন্তু যাই হোক দলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। দল তখন আমাকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মনোনয়ন দিল না। আমাকে মনোনয়ন দিল না ঠিক আছে। আমাকে অফার করলো জেলা পরিষদের। আমি শামীম ওসমানকে জানালাম, আমাকে তো জেলা পরিষদের নির্বাচনের জন্য কাগজপত্র সাবমিট করতে বললো। তখন শামীম ওসমান বললো, না। আপনি এটা গ্রহণ করবেন না। আমি তখন নিলাম না। এদিকে গণভবনে আমাদের সবাইকে ডাকালো। আইভীর সাথে মিলিয়ে দেয়ার জন্য। এরপরে আমি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলাম। তখন জেলা পরিষদের মনোনয়ন বোর্ড বসছে। আমাকে নেত্রী ফোন দিয়ে নির্বাচন করার কথা বললেন। কথা হলো, ক্ষণে আইভী ক্ষণে শামীম এটা না। আমি আসলে রাজনীতির কারণে বিভিন্ন লোককে কাছে টানতে চাইছিলাম। কিন্তু কাছে এসে তারা কথা দিয়ে কথা রাখে নাই। আমি এক সময় আইভীকে কাছে টানছিলাম রাজনীতি করার কারণে। কিন্তু সে তার স্বার্থ উদ্ধার করে চলে গেছে। সে আর আসে নাই। শামীম ওসমানও তার মতো স্বার্থ হাসিল করে চলে গেল। এই কারণেই আমি আর কোন গ্রুপিং রাজনীতিতে নাই।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: শামীম ওসমান ও আইভীর দুই জনের সাথেই আপনার সম্পর্কের অবনতি, এটা কেন হলো?

আনোয়ার হোসেন: না আইভী আসলে বয়সের তুলনায় তো আমার থেকে অনেক ছোট। শামীমও আমার থেকে ছোট। আইভী তো আসলে রাজনীতি করে নাই কখনো। রাজনীতির মাঠে ছিল না। তাকে আমি রাজনীতিবিদ বলতে পারি না। আমি তাকে মেয়ের মতো স্নেহ করি। কিন্তু স্নেহ করা মানে এই না যে, রাজনীতিতে আদর্শের বিচ্যুতি হয়ে গেলে আমি তার পক্ষে থাকি না। যার কারণে শামীম নিজের ভুল বুঝেছিল বলে তাকে কাছে টানছিলাম। শামীম যখন আমাকে কর্মী বানিয়ে ফেলতে চায়! তাকে আমি এক সময় কর্মী বানাইছি, কর্মী থেকে নেতা বানাইছি। এখন শামীম যদি আমাকে কর্মী বানিয়ে ফেলতে চায় আমি তো সেই রাজনীতিতে অভ্যস্থ না। যদিও ব্যাক্তিগতভাবে তাদের সাথে রাজনৈতিক বনিবনা নেই। কিন্তু স্নেহ, শ্রদ্ধাবোধ এই সবই আছে।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: অনেকেই বলছেন শামীম ওসমান ও আইভী এই দুই ধারায় বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামীলীগের রাজনীতি বিভক্ত, তবে আইভী শামীমকে ফেলে একটি অংশ আপনাকে তৃতীয় শক্তি/বলয়/ পক্ষ হিসেবে দেখছে বিষয়টি কতটা সত্য?

আনোয়ার হোসেন: এটাই সত্য, এটাই বাস্তব। আমি ছাত্র রাজনীতি থেকেই এই ধারায় রাজনীতি করছি। আমি উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরু কিছু বুঝি না। আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করি। কেউ ওসমানলীগ করে কেউ চুনকালীগ করে। আর আমি করি আওয়ামীলীগ।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: আগামী নির্বাচনে মহানগর আওয়ামীলীগের প্রস্ততি কেমন?

আনোয়ার হোসেন: আমাদের মহানগরের অবস্থান ভাল। আমরা চাচ্ছি সব আসনে নৌকার প্রার্থী। জননেত্রী শেখ হাসিনা যাকে নমিনেশন দিবে তার হয়েই কাজ করবো।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নে জনপ্রতিনিধি ও সরকার দলীয় নেতাদের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

আনোয়ার হোসেন: আসলে আমরা যারা জনপ্রতিনিধি ও সরকার দলীয় লোক তাদের কাজটা কি? জনগণকে ভালবাসা, জনগণের মঙ্গল করা, দেশকে ভালবাসা। আসলে আমরা জনগণকে ভালবাসতে পারি নাই। আমরা ব্যাক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গেছি। দলের থেকে ব্যাক্তিকে বেশি ভালবাসি, দেশের থেকে ব্যাক্তিকে বেশি ভালবাসি। এই পর্যায়ে আমরা চলে গেছি। ব্যাক্তি কেন্দ্রিক হওয়াতে জনগণকে যা দেওয়ার সেটা আমরা দিতে পারছি না।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের সবগুলো আসনে আপনি এবার নৌকার প্রার্থী আশা করছেন, যদি শেষ পর্যন্ত না হয় তখন আপনাদের ভূমিকা কি হবে?

আনোয়ার হোসেন: আমরা আওয়ামীলীগের রাজনীতি করি। আওয়ামীলীগের প্রতিনিধি চাইবোই। আওয়ামীলীগের প্রতিনিধি না থাকার কারণে আওয়ামীলীগের লোকেরা সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই আমরা একটি জোট বেঁধেছি প্রতিটা আসনে নৌকা প্রতীক চাই। শেখ হাসিনা হলো সব সিদ্ধান্তের মালিক। মায়ের কাছে সন্তান চাইতেই পারে। মা যা সিদ্ধান্ত দিবে তাই হবে।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: শোনা যাচ্ছে আপনি নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন, কথাটা কি ঠিক?

আনোয়ার হোসেন: আসলে আমি জেলা পরিষদের মনোনয়ন চাইনি। আমাকে দেয়া হয়েছে। আমি শেখ হাসিনার একজন কর্মী। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। আমি শেখ হাসিনাকে অনেক শ্রদ্ধা করি। তিনি আমার মায়ের মতো, বোনের মতো। তিনি যদি মনে করেন, দলের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, এলাকার স্বার্থে আমাকে পার্লামেন্টে দরকার তাহলে আমি অবশ্যই করবো। তিনি যা বলবেন তাই করবো। নেত্রীর নির্দেশনাই আমার নির্দেশনা।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: দল যদি আপনাকে না দিয়ে অন্যকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আপনার ভূমিকা কি থাকবে?

আনোয়ার হোসেন: শেখ হাসিনা যেটা বলবে, যাকে নমিনেশন দিবে তার পক্ষেই কাজ করবো।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: আগামীদিনে মহানগর আওয়ামীলীগ নিয়ে আপনার কোন পরিকল্পনা আছে কি না?

আনোয়ার হোসেন: মহানগর আওয়ামীলীগটাকে আগামীতে সুন্দর এবং সুশ্রী এবং অপরাধ মুক্ত, সন্ত্রাস মুক্ত রাজনীতিতে নিয়ে যাবো। সেই লক্ষে আমরা বিভিন্ন ভাবে কাজ করতেছি। যাদের দ্বারা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় তাদের থেকে দলকে মুক্ত করবো। দলের নেতৃত্বে থাকবে ভাল লোক। যার প্রতি আস্থাশীল হয়ে বিভিন্ন লোক দলে ভিড়বে। এইভাবে দলকে সাঁজাতে চাই।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আপনার ভাল লাগা এবং মন্দ লাগা কোন বিষয় আছে কি?

আনোয়ার হোসেন: আমার ভাল লাগার ব্যাপারটি হলো, আমার জীবনের প্রথম প্রাপ্তি হলো জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী আমাকে ফোন দিয়ে নমিনেশনটা দিয়েছেন। সারা বাংলাদেশে এটি একটি ইতিহাস। একটা কর্মীকে একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী ফোন দিয়ে বললো, তোমাকে মনোনয়ন দিলাম। তুমি জেলা পরিষদের নির্বাচনটা করো। এটা হলো আমার প্রাপ্তি এবং ভাল লাগা। আর মন্দ লাগা হলো এই রাজনীতিতে বিরোধ বা ঝগড়া এটা থাকবেই স্বাভাবিক। যাদেরকে আমি রাজনীতিতে পুনর্বাসন করলাম তাদের (শামীম ওসমান) দিয়ে যখন আমি লাঞ্ছিত হই এটাই আমার মন্দ লাগা।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু বলেন?

আনোয়ার হোসেন: ব্যাক্তিগত জীবন হলো আমি বিয়ে করেছি ১৯৮৯ সালে ডিসেম্বরের দিকে। মার্চ মাসে আমার ওয়াইফকে আমি তুলে আনি। সেই অনুষ্ঠানের গায়ে হলুদে বাংলাদেশের তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত হয়েছিলেন। একসময় আমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছি। সেই সময় আমি দেওভোগ মাদ্রাসার ছাত্র ছিলাম। মাদ্রাসায় থাকা অবস্থায় আমি কোরআন শিক্ষা নিয়েছি। কোরআন শিক্ষা নিয়ে আমি প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হয়েছি। এবং নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলে ৫ বছর লেখাপড়ার জীবনে কোরআন তেলাওয়াতে আমি প্রথম স্থান অর্জন করেছি। নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী নিয়ে একটি মহকুমা ছিল। সেই মহকুমা থেকে একটি কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা হতো। সেই প্রতিযোগিতায় আমি প্রথম হতাম। আমি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেলে আবদ্ধ হলাম। ঢাকা জেল থেকে আমাকে রাজশাহী জেলে ট্রান্সফার করলো। রাজশাহী জেলে থাকা অবস্থায় আমি দীর্ঘ ৮ মাস ইমামতি করেছি। আসলে রাজশাহী জেলে যারা থাকে তাদের থেকে একজনকে সিলেক্ট করে ইমামতি করতে দেয়া হয়। তো নিয়ম ছিল যে সকালে উঠবে সে আজান দিবে। এরকম একটি নিয়ম ছিল। একদিন আমি সকালে আগে উঠছি তাই আজানটা আমি দিছি। আজান দেয়ার পরে নামাজ হওয়ার পরে মুসুল্লীরা বললো আজানটা দিছে কে? আমি মনে করলাম আজানটা দিলাম, ভুল টুল হইলো নাকি! তখন আমি বললাম আজানটা আমি দিছি। ভুল টুল হয়েছে নাকি? তখন বললো, না, না। আপনার আজানটা খুব সহি। আমাদের ভাল লেগেছে। আজকে থেকে আপনি আমাদের ইমাম। আমরা ৬ ভাই আর ৩ বোন। আমার দুটো মেয়ে। এক মেয়ে বিবাহিত। আরেক মেয়েকে বিবাহ দিবো।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আনোয়ার হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

সব খবর
সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বশেষ