মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

কবি আল মাহমুদ স্মরণে ‘পাখির কাছে, নদীর কাছে’

শনিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:২৭

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

আহমেদ বাবলু: লেখার শিরোনাম পড়েই- সচেতন যে কোনো পাঠক ভ্রু কুঁচকে ফেলতে পারেন এই ভেবে যে- আমি হয়তো কবি আল মাহমুদের বহুল পঠিত ছড়া বা ছড়াগ্রন্থটির নামটিই লিখতে ভুল করে ফেলেছি! কারণ, "পাখির কাছে ফুলের কাছে" নামে তাঁর বিখ্যাত ছড়ার বইটির কথা কে না জানে? তবে? আমি যে ফুলকে ছিঁড়ে ফেলে সেখানে নদীকে নিয়ে এলাম? প্রিয় পাঠক, আমি তা সচেতনভাবেই করেছি এবং একটু সময় দিলেই আপনাদের কাছে তা ব্যখ্যা করতে সচেষ্ট হব।

"পাখির কাছে ফুলের কাছে" বইটি আল মাহমুদ প্রকাশ করেন ১৯৮০ সালে। যে বইয়ে নোলক, পাখির মতো, পাখির কাছে ফুলের কাছে এবং একুশের কবিতার মতো তুমুল জনপ্রিয় কিছু কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। যারমধ্যে বেশকয়েকটি আমরা পাঠ্যপুস্তকে পড়ে এসেছি অনেক আগে থেকে এবং এখনকার শিশু-কিশোররাও পড়ছে।
পাখির কাছে ফুলের কাছে শিরোনামে কবিতাটির শেষ চারটি লাইন এমন-

দীঘির কথায় উঠলো হেসে ফুল পাখিরা সব
কাব্য হবে, কাব্য হবে, জুড়লো কলরব।
কি আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই
পাখির কাছে ফুলের কাছে মনের কথা কই।

কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পঠন- পাঠনে দেখেছি, মনের কথা বলার জন্য তিনি পাখির কাছে বারবার গিয়ে থাকলেও, ফুলের কাছে খুব কমই গেছেন। তাঁর কবিতার নিবিড় পাঠক যদি লক্ষ্য করেন, দেখবেন- উপমা হিসেবে তিনি ফুলের কাছে খুব একটা জাননি আসলে। তবে পাখির কাছে গেছেন। এ ছাড়া তিনি যে উপমাটির কাছে বারবার দ্বারস্থ হয়েছেন, সে হলো - নদী। আল মাহমুদ পড়তে গেলেই, কবিতার নানান প্রেক্ষাপটে, নানান মনোভঙ্গির প্রকাশে, উপমা হিসেবে তিনি নদীকে ব্যবহার করেছেন। আর এই জন্যেই আমার লেখাটির শিরোনাম- "পাখির কাছে ফুলের কাছে" নয়, বরং "পাখির কাছে নদীর কাছে"।
আমি দেখাতে চাই বাংলার এই অসামান্য কবি তাঁর কবিতায়, কখন কোথায় কীভাবে পাখি আর নদীর কাছে ফিরে ফিরে আশ্রয় নিয়েছেন।

বলে রাখা দরকার, আমার আপাত এই পর্যবেক্ষণ শুধু কবির কবিতাতেই সীমাবদ্ধ রেখেছি। আগ্রহী পাঠক চাইলে- তাঁর অন্যান্য লেখালেখিতেও মনোযোগ রাখতে পারেন। তবে আমার ধারনা সেখানেও ব্যতিক্রম কিছু ধরা পড়বে না।

দুই
শুরুতেই আমরা দেখব কবি আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় কতভাবে কোন কোন অনুভূতি প্রকাশে পাখিকে প্রতীক হিসেবে হাজির করেছেন। প্রথমেই আমরা যে কবিতাটির দিকে চোখ রাখবো তা তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তরে প্রকাশিত। বেরিয়েছিল ১৯৬৩ সালে। এই বইয়ে "কাক ও কোকিল" নামে একটি কবিতায় পাখি এলো এভাবে-

একবার এক শহুরে কাকের দলে
মিশে গিয়েছিলো গানের কোকিল পাখি
মনে ছিলো তার কোনমতে কোনো ছলে
শেখা যায় যদি জীবিকার নানা ফাঁকি।

এই কবিতার কোকিল কি কবি নিজেই? যাকে শহীদ কাদরীরা গ্রাম্য কবি আখ্যা দিয়ে নানানভাবে অপমান করার চেষ্টা করতেন? আল মাহমুদ স্পষ্টতই তাদের সাথে মিলে থাকার বাসনা পোষণ করলেও বাস্তবতা হলো তিনি মিলে থাকতে পারেননি। যেমন পারেনি কবিতার কোকিল পাখিটিও।

কাকেরা যে তার বোঝে না গানের ভাষা
রুক্ষ পালকে তীব্র কণ্ঠে হাসে
গানের পাখির নিভে যায় কত আশা
সবুজ পাহাড়ে একদিন ফিরে আসে।

আল মাহমুদের কবিতায় পাখি হিসেবে কাক এসেছে অনেকবার। কাককে কখনো চতুর বলেছেন, আবার পরক্ষণেই নাগরিক এই পাখিটিকেই প্রিয় ও পরম বলেও উল্লেখ করেছেন।

হে আমার প্রিয়, পরম চতুর পাখি
তোর কণ্ঠেই শুনি সত্যের সুর,
এই উদ্দাম নগরের হাঁকাহাঁকি
আত্মায় তোর উত্তাল ভরপুর;

লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, কবিতার এই কাকের মধ্য তিনি বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণাও খুঁজেছেন।

ক্লান্তিতে প্রাণ ক্ষয় হয়ে গেলে, আমি
তখন ভাবছি বাঁচবো আবার কিসে?
জীবন তো চাই দুর্দম দ্রুতগামী,
তখন তুমিই উড়ে এসো কার্নিশে,
শোনাও তোমার সাহসী কলস্বর
অথবা দড়িতে বসে থেকে আড়াআড়ি
উচ্চ কণ্ঠে ফোটাও যে অক্ষর,
এতেই জীবন মনে হয় তরবারি।

কাকের কলস্বর যে কবির মধ্যে দারুণ অভিঘাত তৈরী করত, তা "অসুখে একজন" কবিতার প্রথম লাইনেও স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন-

কাকটা তাড়িয়ে দাও, ও বড় ভীষণ কণ্ঠে ডাকে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে কবি আল মাহমুদ কবিতার জন্য কাকের কাছে আশ্রয় নিয়েছেন বারবার। কখনো কখনো এই কাকের রূপকে নিজেকেই যেন কবিতায় হাজির করেছেন তিনি। বলেছেন-

আমি যেন সেই পাখি, স্বজন পীড়নে যারা
কালো পতাকার মতো হাহাকার ওঠে কা-কা
আর্তনাদে ভরে দেয় ঘরবাড়ি, পালক ভাঙ্গার
উপায়হীন প্রতিবাদে
আকাশ কাঁপিয়ে কাঁদে।

অন্যান্য পাখির প্রতীকেও তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়। "খড়ের গম্বুজ" নামে অসাধারণ এক কবিতা আছে। সেই কবিতায়ও তিনি যেন স্বগতোক্তি করছেন-

এখন কোথায় পাখি? একাকী তুমি সারাদিন
বিহঙ্গ বিহঙ্গ বলে অবিকল পাখির মতন
চঞ্চুর সবুজলতা রাজপথে হারিয়ে এসেছো,
অথচ পাওনি কিছু, না পল্লবের ঘ্রাণ
কেবল দেখেছো শুধু কোকিলের ছদ্মবেশ সেজে
পাতার প্রতীক আঁকা কাইয়ুমের প্রচ্ছদের নীচে
নোংরা পালক ফেলে পৌর-ভাগাড়ে ওরে নগর শকুন।

কখনো প্রতীক্ষারত প্রেমিকের কথা বলতে গিয়ে লিখছেন-

তোমার হাতে ইচ্ছে করে খাওয়ার
কুরুলিয়ার পুরোনো খই ভাজা;
কাউয়ার মতো মুন্সি বাড়ির দাওয়ায়
দেখবো বসে তোমার ঘষা মাজা।

পড়ে পড়ে মনে হয়, জীবনানন্দ দাশের বিপন্ন বিস্ময়ের মতো আল মাহমুদের রক্তের ভেতরে নানাবিধ পাখিরা খেলা করে গেছে। আমার তেমনই প্রতীতি হয়। তিনি নিজেও বলেন-

কে অস্বীকারের পাখি ডানা ঝাড়ো আমার ভিতরে
বেয়াদব শিসে তোর ছলকে ওঠে রক্ত চলাচল।

জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে কবিতাও লিখেছেন তিনি। "জীবনানন্দের প্রতি" শিরোনামে। এখানেও লক্ষ্যনীয় ব্যাপার যে- সেই কবিতার প্রথম লাইনেও পাখি এসে জায়গা করে নিয়েছে।

কেন যে তোমার মুখ ভাবলেই মাছরাঙা পাখির শিকার
ধরার নিঃশব্দ ঝাঁপ মনে পড়ে আমাদের পুকুর পাড়ের।

তিন

১৯৮৫ সালের জানুয়ারিতে "বখতিয়ারের ঘোড়া" নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় আল মাহমুদের। ততদিনে তাঁর চিন্তায় ও কবিতায় ব্যাপক পরিবর্তন এসে গেছে। যে কবি তাঁর সোনালী কাবিনে উচ্চারণ করেছিলেন-

আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণীর উচ্ছেদ,
এমন প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ
যেন না ঢুকতে পারে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ।

অথচ শেষ পর্যন্ত সেই তিনিই লোকধর্মের প্রতি বিশ্বাসটুকু আর ধরে রাখতে পারেননি। বখতিয়ারের ঘোড়াতে যা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সোনালী কাবিনের কবিই এবার উচ্চারণ করেন-

মাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে
মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি;
আমি তখন স্বপ্নের ভেতর জেহাদ, জেহাদ বলে জেগে উঠি।

যাইহোক, আমাদের আলাপের বিষয় তা নয় অবশ্যই। আমরা বরং আল মাহমুদের পাখির সন্ধানে যাই। এই কবিতার বইটিতেই তিনি `ডানাঅলা মানুষ" নামে একটি কবিতা লিখেন-

ডানাঅলা কবি? ডানা?
হ্যাঁ, পৃথিবীর ক্ষুধার্ত মানচিত্রের প্রায় প্রত্যেকটি
প্রাণীরই যেমন অদৃশ্য ডানা থাকে, তেমনি। থাকে
স্বপ্নের অলীক পাখনা।

১৯৮৭ সালে প্রকাশিত "আরব্য রজনীর রাজহাঁস" বইয়ের শিরোনাম কবিতায় পাখি আসে এভাবে-

হায় হতভাগ্য পাখি
তুমি কেন নতুন নগর প্রান্তের জলাশয়গুলোতে বিহার করতে চাও?
নাকি তুমি তাক করা বন্দুকের নল চিনতে পারো না?
তোমার রানের স্বাদ নিতে উন্মত্ত জিহ্বাগুলোকে চিনতে পারো না কি তুমি?

অথচ হাজার বছর আগে
বেবিলনের ঝিলগুলো থেকে তোমার ত্রস্ত উড়ালের শব্দে
আমি আনন্দ প্রকাশ করতাম! বলতাম
পালাও পালাও
মাংসাশী বাঘমানুষ,
সিংহমানুষ
চিতা-মানুষদের থেকে মেঘের গম্বুজে আত্মগোপন করো।

এই সময়ে কবি আল মাহমুদের বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে। তিনি জন্মেছিলেন ১৯৩৬ সালের ১১ই জুলাই। বার্ধক্য একটু একটু করে তাঁর শরীরে ও কবিতায় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। মজার ব্যাপার হলো তাঁর যৌবনের পাখি এই সময়ের কবিতায়ও দিব্যি উড়াউড়ি করে বেড়াচ্ছে। এই বইয়ে প্রকাশিত "জোনাকির বাসা" কবিতায় যেমন প্রকাশ পাচ্ছে-

আজকাল স্মরণশক্তি যেন কেমন হয়ে গেছে।
অনেক নিকটের ঘটনাও ভুলে যাই। মনে থাকে না।
একটি স্ট্রোকের পর পকেট ভর্তি যে ওষুধ রয়েছে
তা জীবন পাখির নীলাভ ডিম মাত্র
আঙুলের ওম না দিলেই সে মৃত্যু প্রসব করবে।

আরও পরে এসে "উড়াল কাব্য" নামে একটি বইই প্রকাশ করে ফেলেন তিনি, যেখানে বয়সের নির্মম বাস্তবতা আরও প্রকটভাবে ধরা পড়ে তাঁর কবিতায়। যে কোনো মহৎ শিল্পীই যেমন জীবনের নির্মম সত্যকে পরিহাস করতে পারেন, এই কাব্যগ্রন্থে এসে আল মাহমুদও অবলীলায় তা করলেন নিজেকে নিয়ে। লিখলেন "কানা মামুদের উড়ালকাব্য" নামে এক সিরিজ কবিতা। বোঝা যায় এখানে এসে তিনি তাঁর দৃষ্টি হারাচ্ছেন। সাধারণ যে কোনো মানুষ এই সময়ে এসে হয়তো ভেঙ্গে পড়েন, কিন্তু আল মাহমুদ হলেন প্রকৃত কবি। নিজের অন্ধত্ব নিয়ে গভীরতর বোধের প্রকাশ হয় এই সিরিজ কবিতায়। তিনি লিখেন-

হায় আল্লা। কানা মানুষেরও একটা জগত আছে। এর সবটুকু না দেখিয়ে আমাকে অন্য কোনো পর্দার অন্তরালে ঠেলে দিও না । আমি অন্ধত্বের জগত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হাতড়ে হাতড়ে অতিক্রম করব। আমি হোঁচট খেয়ে আসবাবপত্রের উপর পড়ে যাবো। হয়তোবা শক্ত ও কাঠিন্য পরখ করতে করতে কোনও এক কালে আমি সেই কোমল শিহরণের কাছে পৌঁছে যাবো যা কবিকেও অশ্রুজলে পরিবর্তিত করে দেয়। কবি হয়ে যান ভর বর্ষার মেঘ।

এইভাবেই আল মাহমুদের কবিতার পাখি তাঁর যৌবন থেকে বার্ধক্যে এসে নানান রুপে উড়তে থাকে। অজস্র পাখির কাছে তাঁর মনে কথা কওয়া, আমরা মুগ্ধ হয়ে পাঠ করতে থাকি।

সব খবর
শিল্প ও সাহিত্য বিভাগের সর্বশেষ