শনিবার ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

এক দুর্ঘটনায় পঙ্গু পুরো পরিবার

রবিবার, ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:৫১

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

আফসানা আক্তার (প্রেস নারায়ণগঞ্জ): বন্দর মুছাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল বাতেন। টুকটাক ব্যবসা করে স্ত্রী, তিন সন্তান নিয়ে কোনোমতে চলছিল তাদের জীবন। কিন্তু বার্ধক্যে কর্মক্ষমতা হারিয়ে বসে পড়লেন বাতেন। পিতার পর সংসারের হাল ধরতে এগিয়ে আসে বাতেনের বড় ছেলে সাজ্জাদ আহমেদ সাজু। জীবিকার তাগিদে ঋণ নিয়ে পাড়ি জমান সুদূর সৌদি আরব। দেখতে দেখতে তিন বছর। ঋণের টাকা পরিশোধ করে এবার দেশে ফেরার পালা সাজ্জাদের। দেশে ফিরে জং পড়া টিনের ঘরটি সংস্কার করবে সে, এরপর বিয়ে। তার আগে ছোট ভাই সানজিদকে প্রবাসে পাঠানের ব্যবস্থা করতে হবে তার। ব্যবস্থা হলো ভাইয়ের জন্যও। অগ্রীম কিছু আর বাকিটা ঋণ করে। এসেছে ভিসা, প্লেনের টিকেটেও। পরিকল্পনা মত সবকিছু ঠিক ঠাক। ছোট ভাই পাড়ি জমানোর কিছুদিন পর দেশে ফিরবেন সাজ্জাদ। এদিকে ছেলেকে কাছে পাবার জন্য অধীর আগ্রহে দিন গুণছেন মা খোশনে আরা খুশি। সবকিছুই যখন ঠিক তখনই একটি দুর্ঘটনা ধুলোয় মিলিয়ে দিলো সব আশা-আকাঙ্ক্ষা।

শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) সৌদি আরবের মদিনা থেকে জেদ্দা ফেরার পথে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় সাজ্জাদের। এ ঘটনায় নিহত হন বন্দরের কলাবাগ এলাকার মেজবাহ উদ্দিন ফাহিম ও আহত হয় আরো তিনজন।

নিহত সাজ্জাদের মা খোশনে আরা

এ দুর্ঘটনায় বাতেনের পরিবার হারায় একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিকে। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় ছোট ছেলে সানজিদের সৌদি যাবার পরিকল্পনা। এই এক ঘটনায় যেন পঙ্গু তাদের পুরো পরিবার।

এদিকে শুক্রবার রাতে ছেলের মৃত্যুর সংবাদ পাবার পর থেকেই পাগল প্রায় সাজ্জাদের মা খোশনে আরা খুশী। মৃত্যুর শোকে কাতর মা প্রতিনিয়ত কেঁদে যাচ্ছেন ছেলের জন্য। দীর্ঘ সময় ধরে কাঁদতে কাঁদতে ভেঙ্গেছে তার কন্ঠ। তবু তার কষ্ট যেন শেষ হয় না। ভাঙ্গা কন্ঠেও বিলাপ করে যাচ্ছেন তিনি।

রোববার (২২ ডিসেম্বর) বন্দর মুছাপুর ইউনিয়নের বাজুরবাগ গ্রামে অবস্থিত সাজ্জাদের বাড়িতে গিয়ে দেয়া যায়, জং পড়া টিনের ঘর ভর্তি আত্মীয়-স্বজনদের ভিড়। এক কক্ষে কিছু নারী আত্মীয়া ঘিরে রেখেছেন বিলাপ করতে থাকা সাজ্জাদের মাকে। কেউই যেন তাকে ধরে রাখতে পারছে না। বারবার সাজু! সাজু! করে বিলাপ করে যাচ্ছেন। কারো হাতে ফোন দেখলেই চিৎকার করে উঠছেন, ‘আমারে একটু দে। আমি আমার সাজুরে একটু দেখুম। আমারে একটু দে।’ বিলাপের সুরে তিনি আরো বলেন, ‘ও বাবারে, কই গেলিরে। আমি কেমনে থাকমুরে। আল্লাগো, আল্লাগো, আমার বাবা কই গেল গো।’

নিহত সাজ্জাদের বাবা আব্দুল বাতেন

পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি সাজ্জাদের মৃত্যু, ছোট ছেলের প্রবাস যাত্রার অনিশ্চয়তা ও স্ত্রীর মানসিক অবস্থা সবকিছুই দিশেহারা করে দিয়েছে আব্দুল বাতেনকে। তিনি বলেন, ‘বড় ছেলের উপর নির্ভর করেই ছোট ছেলেকে বিদেশ পাঠাচ্ছিলাম। এখন বড় ছেলে নাই, ছোট ছেলে কীভাবে যাবে। এত টাকা কোথা থেকে পাবো! তার উপর আমার স্ত্রী পাগল প্রায়। আমি এখন কি করবো বুঝে উঠতে পাছি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘ছেলেকে হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। এখন সরকার আমাদের জন্য কিছু না করলে আমরা পরিবারসহ মারা যাব।’

এ বিষয়ে বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুক্লা সরকার বলেন, ‘প্রবাসে কোন বাংলাদেশীর অপমৃত্যু হলে সরকারের পক্ষ থেকে তিন লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়ে থাকে। এই কাজটি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় করে। লাশ অতি দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবার যাতে ক্ষতিপূরণ পেতে পারে সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

সব খবর
নগরের বাইরে বিভাগের সর্বশেষ