শুক্রবার ১৬ নভেম্বর, ২০১৮

একান্ত সাক্ষাৎকারে এএসপি (ট্রাফিক) ৪টি স্প্লিন্টার এখনো শরীরে আছে

বৃহস্পতিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৯:৩৬

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

নুসরাত জাহান সুপ্তি (প্রেস নারায়নগঞ্জ): সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) আব্দুর রশিদ পিপিএম। ২০১৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক বিভাগে সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন। জীবনে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিলেও নিরাপত্তার টানেই পুলিশের পেশাকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। প্রেস নারায়ণগঞ্জের সাথে এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে তিনি তার চাকুরী জীবনের নানা বিষয় আলোকপাত করেছেন।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: কেমন আছেন?

আব্দুর রশিদ: ভাল আছি।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: প্রথমে শিক্ষা জীবন সম্পর্কে কিছু বলেন।

আব্দুর রশিদ: জামালপুর জেলায় আমার গ্রামের হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করি। ১৯৭৭ সালে আশ্বিন মোহাম্মদ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স ও মাস্ট্রার্স করেছি।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: পেশাজীবন শুরুটা কেমন ছিল?

আব্দুর রশিদ: জীবনের প্রথম পেশা ছিল একজন লেকচারার হিসেবে। সুধারাম কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে শিক্ষক হিসেবে প্রথম আমার পেশা জীবন শুরু হয়। শিক্ষকতার দিকেই আমার বেশি নজর ছিল। পরবর্তীতে আমার এলাকাতেই সড়িষা বাড়ি মহাবিদ্যালয়ে আবেদন করি। সেখানে আমার চাকরিও হয়ে যায়। তবে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধুও সেখানে আবেদন করে। বন্ধুর জন্য চাকরিটি খুব প্রয়োজন ছিল, তাই আমার হলেও আমি সেটা আর করি নাই।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: পুলিশে যোগদানের ইচ্ছা কেন হল?

আব্দুর রশিদ: ১৯৮৩ সালে নোয়াখালিতে ভুতে মানুষ মেরে ফেলে, এই ধরনের একটা খবর শুনেছিলাম। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল না এখানে কোন জটিলতা আছে। আমার একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এরপরে আমি পুলিশের এসআই পদে আবেদন করি। পুলিশের এস আই পদে আমার চাকরি হয়ে যায়। একই সাথে আমি ফ্যমিলি প্লানিং এ আবেদন করেছিলাম। সেখানেও চাকরিটি হয়েছিল। কিন্তু পুলিশের চাকরির প্রতি সেই যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল তার জন্য পুলিশের চাকরিটিকেই বেছে নিয়েছিলাম।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: পুলিশের চাকরীতে প্রবেশের প্রস্তুতিটা নিয়ে বলেন।

আব্দুর রশিদ: ১৯৮৩ সালে সর্ব প্রথম সারদা থানায় প্রশিক্ষন নিলাম। এরপর ১৯৮৫ সালে টাঙ্গাইল জেলায় ঘাটের থানায় শিক্ষানবিশ হিসেবে। পরবর্তীতে গাজীপুর জেলাতে প্রথমে সাব-ইন্সপেক্টর ও পরে ইন্সপেক্টর পদে নিযুক্ত হলাম।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: দেশের কোন জেলায় চাকরী করেছেন?

আব্দুর রশিদ: গাজীপুরেই মূলত আমার চাকরি জীবন শুরু হয়। গাজীপুরের কয়েকটি থানায় আমি চাকরী করেছি। টঙ্গী, কাপাশিয়া, জয়দেবপুর ও কালিগঞ্জ থানায় ছিলাম। গাজীপুর থেকে আমার পোস্টিং হয় ঢাকা মেট্রোপলিটনে। মতিঝিলে এসআই হিসেবে পোস্টিং হয়ে যায়। ১৯৯০ সালে কতুয়ালি থানায় এসআই থেকে ইন্সপেক্টর হই। তখন এরশাদের বিরুদ্ধে গন আন্দোলন হচ্ছিল। ওই একই সালে ঢাকা জেলা সিআইডি ইন্সপেক্টর হয়েছিলাম। এরপর ময়মনসিংহে পোস্টিং হয় সিআইডি ইন্সপেক্টর হিসেবে। সেখান শরীয়তপুরের জাজিরা থানায় অফিসার ইনচার্জ হিসেবে পোস্টিং হয়। এরপ ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় পোস্টিং হয়। আবার ঢাকার বাহিরে নরসিংদী সদর থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব নেই। সেখান থেকে রাজশাহী জেলার কুটিয়া থানায় ওসি হিসেবে পোস্টিং হয়। এরপর নরসিংদী বেলাবো থানার ওসি। শিবপুর থানায় দায়িত্ব পালনের পর টাঙ্গাইল জেলায় বদলি হই। সেখান থেকে ঢাকার পল্লবী থানার ওসি।

২০১৩ সালে ময়মনসিংহের কতোয়ালি মডেল থানায় এএসপি হিসেবে পোস্টিং হয়। সেখানে সাড়ে তিন বছর ছিলাম। এরপরে নারায়ণগঞ্জে সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) হিসেবে আছি। ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করছি এই প্রথম। নারায়ণগঞ্জে ৬ সেপ্টেম্বর আমার দুই বছর হবে। দুইবছর আগে ৬ সেপ্টেম্বর এখানে জয়েন করেছি। এই সময়ের মাঝে আমি তিনবার জাতি সংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে ছিলাম।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: দেশের বাহিরে কোথায় দায়িত্বে ছিলেন?

আব্দুর রশিদ: ১৯৯৩ সালে আমি জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে পরীক্ষা দেই সেখানে সিলেক্ট হয়ে আমি ক্রোয়েশিয়া চলে যাই। সেখানে ১ বছর ছিলাম। ২০০৩ সালে আমি ২য় বার জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে সিলেক্ট হয়ে কসোভোতে যাই। যেখানে আমি ১৫ মাস ছিলাম। ২০১০ সালে ৩য় বার জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে সিলেক্ট হয়ে আমি সুদানে যাই। তখন ১ বছর ছিলাম। সেই বছর ছয় মাস সাউথ সুদানে ছিলাম। সেখান থেকেও সাউথ সুদানে জাতিসংঘ পদক পাই। জাতিসংঘ মিশনে আমি ভালো করেছি। আমি সেখানে স্টেশনের কমান্ডার ছিলাম।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিলো?

আব্দুর রশিদ: সব দেশের পুলিশের কাজের ধরন ভিন্ন। আমার দৃষ্টিতে কানাডার পুলিশ অফিসাররা অনেক প্রফেশনাল ছিলো। ডেনমার্কের পুলিশদের ও দেখেছি অনেক তৎপর।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: চাকরী জীবনের ভালো-মন্দ অভিজ্ঞতা কিছু বলেন।

আব্দুর রশিদ: গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় যখন অফিসার ইনচার্জ ছিলাম, তখন আমাকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছিল। একবার জিএমবি ধরা পড়ে। গ্রেনেট বিস্ফোরক, নারী ও বাচ্চাসহ গ্রেপ্তার হয়। এসপি অফিসে সাংবাদিক সম্মেলনে এগুলো ডিসপ্লে হচ্ছিল। আসামী হেন্ডকাপ পড়া অবস্থাতেই হঠাৎ করে গ্রেনেড নিয়ে আল্লাহু আকবর বলে গ্রেনেড উপরের দিকে ছুড়ে মারে। বিস্ফোরণের পর আমার শরীরে অনেক স্প্লিন্টার ঢুকে যায়। যার মধ্যে ৪টি এখনো আমার শরীরে আছে। আমার বাম পায়ের ছোট আঙ্গুলে কোন বোধ শক্তি নেই। সেইটা আমার জন্য ভালো মন্দ দুটো অভিজ্ঞতাই বলতেই পারি। ভালো এজন্য বলব কারণ এরপর থেকে আমার মাঝে কোন ধরনের ভয় নেই। মনে হয় জীবনের অতিরিক্ত কাটাচ্ছি।

আমার কাছে সবসময় ন্যায়ের গুরুত্ব ছিলো বেশি, অন্যায়ের প্রশ্রয় আমি দেই নাই, কারণ গ্রেনেডের সেই বিস্ফোরনের পর আমার মৃত্যু ভয় নেই।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: চাকরী জীবনের সবচেয়ে পছন্দনীয় স্থান কোনটি এবং কেন?

আব্দুর রশিদ: চাকরী জীবনে সবচেয়ে বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছি গাজীপুরে। ৮ বছর সেখানে দাযিত্ব পালন করেছি। সেখানের স্কুল-কলেজেও অনেকটা সময় কাটিয়েছি। আগামী বছরের জানুয়ারীর ২০ তারিখে দায়িত্ব থেকে অবসর নেবো। ভাবছি চাকরির শেষ সময়টা গাজিপুরে থাকা যায় কিনা।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: চাকরী জীবনের সফলতা ও সম্মাননা নিয়ে কিছু বলেন?

আব্দুর রশিদ: যেসব স্থানে আমার পোস্টিং হয়েছিল আজও সেখানকার মানুষ আমার প্রশংসা করে, এটাই আমার সফলতা। আর যে সময় আমার টঙ্গী থানায় পোস্টিং হয়। সেসময় আমি রাস্ট্রপতি পুলিশ পদক পাই। ঢাকার মেট্রোপলিটন মোহাম্মদপুরে থাকাকালীন সময়ে ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হেলালকে গ্রেপ্তার করার জন্য আইজি ব্যাচ পাই। ১৯৯৩ সালে প্রথম ক্রোয়েশিয়া জাতিসংঘ পদক পাই। ২০০৩ সালে আমি ২য় বার কসোবো জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশন থেকে পদক পাই। ২০১০ সালে সুদান জাতিসংঘ পদক ও সাউথ সুদান জাতিসংঘ পদক পেয়েছিলাম।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে বলেন।

আব্দুর রশিদ: পরিবারে আমার মিসেস আর দুই মেয়ে ও এক ছেলে আছে। আমার বড় মেয়ে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ছে। আমার ছেলে কানাডায় থাকে। সেখানেই পড়াশোনা করছে। ছেলেকে বিয়ে করিয়েছি। ছোট মেয়ে সিএসই দিয়েছে।

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আব্দুর রশিদ: আপানাকেও ধন্যবাদ।

সব খবর
সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বশেষ