বুধবার ১৭ অক্টোবর, ২০১৮

‘এইতো দেহেন গোলাগুলি বাইজ্যা গেসে’

বুধবার, ৪ এপ্রিল ২০১৮, ২২:৪৩

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: এইতো দেহেন গোলাগুলি বাইজ্যা গেসে, হাজার হাজার সৈন্য আছে, কত সৈন্য শহীদ হল, বামে ডানে লক্ষ করেন, এবারেতে দেখেন শহীদ মিনার কাছেই আছে, এবারেতে দেখেন বঙ্গবন্ধুর ছবি আছে। শেখ হাসিনার ছবি আছে, ইন্দিরাগান্ধী পাশেই আছে। এবারেতে দেখেন কলকাতা শহর আছে, বড় লোকের বাড়ি আছে, হাইকোর্টের কাচারি আছে। এবারেতে দেখেন আমেরিকা শহর আছে, একশ তলা বাড়ী আছে। এইবারেতে দেখেন ভীষণ যুদ্ধ বাইজ্যা গেসে, কত বিমান উইরা গেছে, কত বিমান পইরা রইছে। এবারেতে দেখেন দিল্লীর শহর আছে, লন্ডন শহর দেখা যাচ্ছে, সারি সারি বিল্ডিং আছে, পাহাড় আছে, ঝর্না আছে, নবাবের বাড়ি আছে, তাজমহল আছে, রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে। এবারেতে দেখেন ফাঁকা ময়দান পরে আছে। এভাবেই বায়োস্কোপ দেখাচ্ছেন আব্দুল জলিল মন্ডল। 

বায়োস্কোপ গ্রাম-বাংলার শিশু-কিশোরদের বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আগেরকার দিনে গ্রাম-গঞ্জের যেখানে সেখানে হামেশা দেখা যেত বাক্সবন্দি বায়োস্কোপ। কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেঁতে বসেছে হাজার বছরের এই ঐতিহ্য। আধুনিক প্রযুক্তির দাপটে গ্রাম-বাংলার মেলা ও হাট-বাজারে এখন আর বায়োস্কোপের দেখা মিলে না। গ্রাম বাংলার শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ একসময় বায়োস্কোপ দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। বায়োস্কোপের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের নানা ঐতিহ্যের স্থিরচিত্রের মাধ্যমে ইতিহাসের কথা জানতে পারত। বায়োস্কোপ দেখতে বায়না ধরত শিশু-কিশোরেরা। বায়োস্কোপ দেখে ক্ষণিকের জন্য হলেও গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো আনন্দ উপভোগ করতেন। আর বায়োস্কোপ প্রদর্শনকারী নেচে গেয়ে শিশু-কিশোর সহ সব বয়সী মানুষকে আকৃষ্ট করতেন। মাতিয়ে রাখতেন বায়োস্কোপ দেখার সময়টুকু।

বায়োস্কোপের বাক্স কাঁধে নিয়ে ফেরিওয়ালা চেঁচিয়ে বলতেন বায়োস্কোপ দেখবেন, বায়োস্কোপ। এ ধরনের শব্দ শুনে ছুটে আসত শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী লোক। কিন্তু দিন দিন পাল্টে গেছে গোটা দৃশ্যপট। আধুনিক কালে বায়োস্কোপ এখন বিলুপ্তির পথে। কেউ আর ডিজিটাল যুগে এসে এই বায়োস্কোপ দেখতে চায় না। এমনকি খোঁজ খবরও নিচ্ছে না বায়োস্কোপওয়ালাদের।

তাদেরই একজন রাজশাহীর বাগমারার চাইনছড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল মন্ডল। তিনি গত তিন বছর ধরে নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁও লোক ও কারু শিল্পমেলা ও লোকজ উৎসবে তার বায়োস্কোপ বক্স নিয়ে ছুটে আসেন। জাদুঘরে ছুটে আসা বিনোদন প্রিয়াসী শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী লোকেদের সেই ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ নেচে গেয়ে দেখান। এক হাতে প্রেমজুড়ি বাজিয়ে অন্য হাতে বাক্সের চাবি ঘুরিয়ে স্থির চিত্র প্রদর্শন করেন জলিল মন্ডল। বাক্সের আতশ কাচে চোখ রেখে স্থিরচিত্র দেখে উৎফুল্ল হয় শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ। তিনি তার কন্ঠে বায়োস্কোপে কি কি প্রদর্শন করা আছে তার বর্ননা দেন। তার কন্ঠে ছিল, এইতো দেহেন গোলাগুলি বাইজ্যা গেসে, হাজার হাজার সৈন্য আছে, কত সৈন্য শহীদ হল, বামে ডানে লক্ষ করেন, এবারেতে দেখেন শহীদ মিনার কাছেই আছে, এবারেতে দেখেন বঙ্গবন্ধুর ছবি আছে। এবারেতে দেখেন শেখ হাসিনার ছবি আছে, ইন্দিরাগান্ধী পাশেই আছে, এবারেতে দেখেন কলকাতা শহর আছে, বড় লোকের বাড়ি আছে, হাইকোর্টের কাচারি আছে, এবারেতে দেখেন আমেরিকা শহর আছে, একশ তলা বাড়ী আছে। এইবারেতে দেখেন ভীষণ যুদ্ধ বাইজ্যা গেসে, কত বিমান উইরা গেছে, কত বিমান পইরা রইছে, এবারেতে দেখেন দিল্লীর শহর আছে, লন্ডন শহর দেখা যাচ্ছে, সারি সারি বিল্ডিং আছে, পাহাড় আছে, ঝর্না আছে, নবাবের বাড়ি আছে, তাজমহল আছে, রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে। এবারেতে দেখেন ফাঁকা ময়দান পরে আছে।

আব্দুল জলিলের বাপ, দাদা ও চাচার পেশা এটি। এখনোও জলিল মন্ডল এই পেশা ছাড়তে পারেননি। রক্তের সাথে মিশে আছে তার বায়োস্কোপ। জলিল মন্ডলের পিতার নাম বকশি মন্ডল। তার চাচা শান্তি মন্ডলও এই পেশায় যুক্ত ছিলেন। জলিল মন্ডল চল্লিশ বছর থেকেই এই পেশায় নেমে পরেন, এখন তার বয়স পঞ্চান্নোর্ধ।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এই আধুনিক যুগে এখন আর কেউ বায়োস্কোপ দেখতে চায় না। টিভি, ডিশ, মোবাইল ফোন এসে যাওয়ায় এখন বায়োস্কোপের কদর কমে গেছে। তিনি যানান বর্তমানে তার বায়োস্কোপে রয়েছে, বাঘ, তাজমহল, বিশাল অট্টালিকা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ছবি। ঝর্না, পাহাড়, পর্বতের ছবি রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ছবি, কলকাতা শহরের ছবি, হাইকোর্টের ছবিসহ নানা দর্শনীয় স্থান। আগে বায়োস্কোপে দেখানো হত বিভিন্ন নায়ক নাইকার ছবি, ক্ষুদিরামের ফাঁসি, রাম লক্ষনের যুদ্ধ, স্বর্গ ও নরকের কাল্পনিক চিত্র, মক্কা মদীনা সহ আরো কয়েকটি স্থির চিত্র।। তিনি আরো বলেন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ছবিও পাল্টাতে হয়। তিনি এখন বিভিন্ন মেলায় ঘুরে ঘুরে বায়োস্কোপ দেখাচ্ছেন। তার বায়োস্কোপে কাচের সামনে ৬ জন একসাথে দেখতে পারেন। এতে ৪০ টি ছবি লাগানো হয়েছে। প্রতিটি ছবি দেড় ফুট আয়তনের। মোট ৪০/৪৫ ফুট ছবি দেখানো হয়। প্রতিবার দেখতে প্রতিজনকে ১০ টাকা দিতে হয়। প্রায় ৫-১০ মিনিট দেখানো হয় বায়োস্কোপ। তার বায়োস্কোপ দেশের ঐতিহ্য। কিন্তু কারো সহযোগীতা পাচ্ছেন না তিনি। কেউ তাদের খোঁজ-খবর ও নিচ্ছে না। এখনোও গ্রাম গঞ্জে বায়োস্কোপ দেখালে নগট টাকার পরিবর্তে চাউল দেয়া হয়। বায়োস্কোপ দেখিয়ে যা পাওয়া যায় তা দিয়েই তার সংসার চলে।

সব খবর
ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ বিভাগের সর্বশেষ