বুধবার ২৩ অক্টোবর, ২০১৯

ঈদবাজার: ৮০০ টাকার জামা ৩০০০ টাকা!

সোমবার, ১১ জুন ২০১৮, ২১:৩৮

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

সাবিত আল হাসান (প্রেস নারায়ণগঞ্জ): ক`দিন পরেই পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে আশে খুশির ঈদ। আর এই ঈদে ধনী-গরীব, ছোট-বড় সকলের প্রধান আকর্ষণ থাকে নতুন জামার প্রতি। ঈদের দিন নতুন জামা পরে ঈদকে বরণ করে নেয়ার আনন্দই অন্যরকম। তাই মাসব্যাপী সারাদেশে কাপড়ের দোকানগুলোতে চলে দেদারসে জামা-কাপড় কেনাবেচা। ঈদকে কেন্দ্র করে দোকান মালিকদের অধিক লাভের আশায় জামা কাপড়ের আকাশচুম্বী দাম হাঁকিয়ে ঈদের আনন্দ অনেকটাই ম্লান করে তোলে। ফলে একদিকে হতাশ হতে হয় ক্রেতাদের অন্যদিকে বিক্রেতা হাতিয়ে নিচ্ছে অধিক মুনাফা।

নারায়ণগঞ্জ শহরে রোজার শেষ ১৫ দিনের প্রতিদিনই প্রায় কয়েকহাজার ক্রেতা বিভিন্ন মার্কেটে আসেন কেনাকাটা করতে। পছন্দের জামা কাপড়, জুতা, কসমেটিক্স, ঘর সাজানোর শো-পিস, জুয়েলারি পন্যসহ বিভিন্ন পণ্য কিনে নিয়ে যান তারা। তবে এতো পণ্যের মাঝে শুধু মাত্র পোশাকের দাম ঈদকে কেন্দ্র করে আকাশচুম্বী হয়। অন্যান্য পণ্য সারা বছরের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেলেও পোশাকগুলোর দাম বেড়ে দাঁড়ায় তিনগুণের অধিক।

সরেজমিনে শহরের কয়েকটি মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, নারী ও শিশুদের পোশাকের দাম সবচেয়ে বেশী। বছরের অন্যান্য সময়ে মাত্র ৮০০ টাকার একটি থ্রি পিস ঈদের বাজারে ৩ হাজার টাকা দাম হাঁকা হচ্ছে। ফলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই পছন্দের জামা ক্রয় করতে বেশ বেগ পেতে হয় ক্রেতাদের। কালীবাজার ফ্রেন্ডস মার্কেটে যেখানে ৫০০ টাকার থ্রি পিস বিক্রি হত সেখানকার অধিকাংশ দোকানে ঝুলছে `১৫০০ টাকার নিচে কোন থ্রি পিস নাই` এ ধরনের লেখা সংবলিত বার্তা। স্বাভাবিকের তুলনায় তিন গুন বাজেট নিয়েই মার্কেটে প্রবেশ করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। আর অধিক মুনাফার আশায় থাকা দোকান মালিকরা সিন্ডিকেট করে প্রায় একই দাম হাঁকছেন সব দোকানে। ফলে নিন্মমানের কাপড় ও অধিকদামে কিনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতারা।

তবে বড়দের জামা কাপড়ের চাইতে অধিক মুনাফা আসে বাচ্চাদের জামা কাপড় থেকে, ৫ থেকে ১০ বছরের বাচ্চার জামা ১৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা দাম চাওয়া হয়। বাচ্চাদের পছন্দের জামা অধিক দামে কিনতে অস্বীকৃতী জানালে অনেক বাচ্চাই কান্না জুড়ে। ফলে মান সন্মান বাঁচাতে এসব দামেই কিনে নিতে বাধ্য হন ক্রেতারা। আর তুলনামুলক কম আয়ের মানুষজন বিপাকে পড়ে শুকনো মুখেই বাড়ি ফিরতে হয়।

তবে বিক্রেতাদের স্বেচ্ছাচারী বাণিজ্যে হতাশার পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। সামিরা রহমান সাবিনা নামে এক ক্রেতা শপিং করার তিক্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন,` আমার ভাতিজার জন্য কেনাকাটার উদ্দেশ্য শান্তনা প্লাজার "ডিফেন্সি"তে যাওয়া হয়। সেখানে এক বছরের বাচ্চার সুতি পাঞ্জাবি (পায়জামা ছাড়া) মুল্য ২১০০ টাকা। ফিক্সড ছিল না তাই একটু দাম করলাম, লাস্ট ১৮০০ টাকা তারপর ভাবলাম "Disney world" এ বাচ্চাদের জন্য সেখানে একটু দেখে তারপর বাবুর পাঞ্জাবি টা কিনবো, কিন্তু সেখানেও একটা নরমাল টি শার্ট ১৫০০ টাকা, যেহেতু আমরা মধ্যবিত্ত তাই কেনা হলো না। ডিফেন্সির ২য় তলাতে আবার জাওয়া হলো, এর পর বললাম পাঞ্জাবিটা লাস্ট কত দিবেন? এখন তারা ২০০০ এর কমে দিবেই না।

তিনি অভিযোগ করে আরো বলেন, নারায়ণগঞ্জ এ কোন মার্কেট এ ঈদে কেনাকাটায় কোন সস্তি নাই। একেকটা দোকানে এসি, জাকজমক ডেকোরেশন , আলোকসজ্জা করে আমাদের মতন মধ্যবিত্ত মানুষ এর গলা জবাই করতেসে। মার্কেটে গিয়েই বুঝলাম আসলে মানুষ কতটা ডাকাত। এইভাবেই এদের অত্যাচার দিন দিন বাড়বে। কেউ প্রতিবাদ করা তো দূরে থাক বিপক্ষেও যাবে না। এসব এর জন্য দায়ি কারা? অবশ্যই আমরা, আর নারায়ণগঞ্জ এ শপিং করব না।`

ডালিম আহমেদ অয়ন নামে আরেক ভুক্তোভুগী জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষন করে বলেন, নারায়ণগঞ্জের মার্কেট গুলোতে জেলা প্রশাসক বা র‍্যাবের দৃষ্টি আকর্ষন করছি। ১৫০০ টাকার জামা দাম চায় ৭৫০০। দেখার কি কেউ নেই ?

মার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী রাজিয়া সুলতানা বলেন, প্রতিবার ঈদে দাম বাড়বেই। আগেরবারের তুলনায় দ্বিগুণ হয় দাম। ঈদ মার্কেট করার জন্য আমাদের মত মধ্যবিত্তদের টাকা জমানো লাগে। তবে এত দাম হাঁকার কারন জানতে চাইলে বলেন, মুলত ওরা জামা কাপড়ের অধিক দাম চেয়ে ক্রেতার মাথা খারাপ করে দিতে চায়। ১ হাজার টাকার জামা ৫ হাজার টাকা দাম বললে ক্রেতা যদি ২৫০০ বলে তাহলে তাদের মূল লাভের পাশাপাশি দেড় হাজার টাকা লাভ হয়। যারা বুদ্ধিমান তারা ঠিকমত কিনতে পারে, নাহলে ঠকতে হয়।

তবে ফ্রেন্ডস মার্কেটের ব্যবসায়ী জুনায়েদ জানান ভিন্ন কথা, ঈদে সব পন্যেরই চাহিদা বেশী থাকে তাই দাম অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশী থাকে। ঈদের জন্য দোকানে অতিরিক্ত সেলসম্যান সাময়িক নিয়োগ দেয়া হয়। তাছাড়া জামা বিক্রির উপর সেলসম্যানদের কমিশন থাকে। অতিরিক্ত কমিশনের আশায় সেলসম্যানরা মালিকের অনুপস্থিতিতে বেশী দাম চায়। তবে ঈদে সবাই লাভ করে তাই পুরো মার্কেটের দামের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই দাম চাওয়া হয়।

তবে দেশে জামা কাপড়ের অধিক দাম চাওয়া হয় তার প্রমান হিসেবে দেখা যায় শুধুমাত্র ঈদের কেনাকাটার জন্য প্রায় দেড় লাখ মানুষ কলকাতা গিয়েছেন। সেখানে এদেশের তুলনায় পোশাকের দাম যথেষ্ট সস্তা। অধিক লাভের আশায় থাকা মুনাফাখোর মালিকদের যদি দ্রুতই লাগাম টেনে না ধরা যায় তবে পোশাক বাজার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দখলে নিতে খুব বেশীদিন লাগবে না। তাই অচিরেই কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্যের মত পোশাক-আশাকের দাম নির্ধারন না করা হয় তবে সাধারণ ভোক্তাদের পকেট কাটা দিনকে দিন আরো বৃদ্ধি পাবে লাগামহীন ভাবে।

সব খবর
অর্থনীতি বিভাগের সর্বশেষ