রবিবার ২৯ নভেম্বর, ২০২০

ইতিহাসে ২৯ ফেব্রুয়ারি: ইতিহাসে নারায়ণগঞ্জ

শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:০৯

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

রফিউর রাব্বি: ২৯ ফেব্রুয়ারি ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম দিন, যার ভিত্তিভূমি নারায়ণগঞ্জ আর পেক্ষাপট ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনে ইতিহাসে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সময়ে ঢাকায় যখন আন্দোলনটি প্রায় স্তিমিত হয়ে পড়েছিল, সে সময়ে নারায়ণগঞ্জে ২৯ ফেব্রুয়ারির ঘটনা সে আন্দোলনের শুষ্ক শিকড়ে পানি যুগিয়েছিল। আন্দোলনটি আবার সারা দেশে নতুন করে বেগবান হয়ে উঠেছিল। দিনটি ছিল অধিবর্ষ। আর তাই চার বছরে তা একবার আসে।

১৯৫২ সালের এ দিনটি ছিল শুক্রবার। এ দিন সকালে নারায়ণগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক ইমতিয়াজীর নির্দেশে মর্গ্যান গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগমকে কর্মচ্যুত ও গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হয়। কারণ তিনি ছিলেন তখন মুসলিমলীগ সরকারের গোয়েন্দা তালিকায় ভাষা আন্দোলনে একজন বিপজ্জনক ব্যক্তি। তাঁর গ্রেপ্তারের সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে গোটা শহরে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস বর্জন করে মিছিল নিয়ে নারায়ণগঞ্জ কোর্ট প্রাঙ্গণে হাজির হন। স্থানীয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে এ সংবাদ পৌঁছলে সফি হোসেন খান গোদনাইলের বিভিন্ন মিলের শ্রমিকদের এ সংবাদ পাঠিয়ে দেন। সংবাদ পেয়ে বিভিন্ন মিলের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে দলে দলে মিছিল নিয়ে এসে নারায়ণগঞ্জ কোর্ট প্রাঙ্গণ ঘিরে ফেলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে মহকুমা প্রশাসক ঢাকা থেকে ইপিআর পাঠানোর আহ্বান জানান। বিক্ষোভ দমনে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট নারায়ণগঞ্জে আসার সংবাদে ছাত্ররা আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ঢাকার দোহার পুলের পর থেকে পঞ্চবটী পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কে বড় বড় গাছ কেটে ছাত্র-জনতা বেরিক্যাড তৈরি করেন। ১৬০টিরও বেশি গাছ ও ইট ফেলে রাস্তা আটকে দেয়া হয়। এদিকে নবীগঞ্জের আলাউদ্দিন মিয়া আদালতে নগদ দশ হাজার টাকা প্রদান করে মমতাজ বেগমের জামিনের আবেদন করা হলেও মুসলিম লীগ সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপে জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হয়ে যায়।১

অপর দিকে নারায়ণগঞ্জে জামিনের অনিশ্চয়তা উপলব্ধি করে আগেই শামসুজ্জোহা ও ডা. মজিবর রহমানকে ভাষা সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে ঢাকা জজকোর্টে জামিনের ব্যবস্থা করার জন্য পাঠানো হয় এবং সেখানেও তাঁরা জামিন নিতে ব্যর্থ হন। আদালত থেকে মহকুমা হাকিম ইমতিয়াজী বেরিয়ে জনতার উদ্দেশ্যে জানান মমতাজ বেগমকে স্কুলের তহবিল তসরুফের কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এর সাথে ভাষা আন্দোলনের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু জামিন না দিয়ে আদালতের ঘোষণা শোনার সাথে সাথে নারায়ণগঞ্জবাসী উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। ঐ দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পথে গাছ ও ইটের বেরিক্যাড সরিয়ে বিকেলে পাঞ্জাবি সৈন্যরা নারায়ণগঞ্জে পৌঁছে। মমতাজ বেগমকে গাড়িতে তোলা হলে কয়েক হাজার ছাত্র জনতা ও শ্রমিকের প্রতিরোধে গাড়ি আর এগুতে পারে না। সে সময় মুস্তাফা মনোয়ার চাকু দিয়ে গাড়ির একটি টায়ার ছিদ্র করে দেন আর তখনি শুরু হয় এলোপাতাড়ি লাঠিচার্জ।২

মমতাজ বেগমকে বহনকারী ঢাকাগামী ইপিআর ও পুলিশের গাড়িটি চাষাঢ়া মোড়ে এলে হাজার হাজার ছাত্র জনতা গাড়িটি আটকে দেন। পাগলা থেকে পঞ্চবটী পর্যন্ত সড়কের দু’পাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার জনতা এসে পথে অবস্থান নেন। পুলিশের সাথে পাঞ্জাবি সৈন্যরা যুক্ত হয়ে ছাত্র-জনতার উপর একসাথে হামলা চালায়। পুলিশ-সৈন্যদের সাথে ছাত্র-জনতার ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। চাষাঢ়া বাইতুল আমানে সভা বসে। তারা সে সভাতেও হামলা চালায়। শত শত লোক আহত হন। শিশু-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বহু লোককে গ্রেপ্তার করা হয়। ঐ দিনের বর্ণনা দিতে যেয়ে ভাষা সংগ্রামী মুস্তাফা সরওয়ার বলেন, ‘আমি সামনে দাঁড়ানো পাঞ্জাবি ডিস্ট্রিক মেজিস্ট্রেট শামসুল হক কোরেশির কোমরে ঝুলানো পিস্তলটিতে হাত নেয়া মাত্র রাইফেলের বাট এবং উপর্যুপরি বুটের আঘাতে আমাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে অন্যান্য রাজবন্দিসহ ঢাকায় নিয়ে যায়। বন্দি অবস্থায় দোহার জেলে ঘেরা পুলিশের গাড়িতে ঠাসাঠাসি করে ঢাকায় নেয়ার সময় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান শুনে আমরা নির্যাতনের কথা ভুলে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলাম। ঐ রাতে নারায়ণগঞ্জের রাজবন্দিদের ঢাকার কোর্ট সংলগ্ন থানা হাজতে গাদাগাদি করে রাখা হয়। বাংলা ভাষার সমর্থক কয়েকজন পুলিশ ক্ষুধার্ত রাজবন্দিদের গোপনে বিস্কুট ও পানি দিয়ে এই নির্যাতনের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। পরের দিন ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে যাওার পর দেখা গিয়েছিল অন্য অনেক রাজবন্দি আর রাস্তা থেকে গ্রেপ্তারকৃত টোকাই নামে পরিচিত অনেক বালককে।

নারায়ণগঞ্জ থেকে যারা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন মহিলা নেত্রী মমতাজ বেগম, খান সাহেব এম ওসমান আলী এম.এল.এ, তাঁর বড় ভাই স্কুল শিক্ষক আজগর আলী, ভাতিজা জালাল উদ্দিন, তৃতীয় ছেলে এই লেখক মুস্তাফা সারওয়ার, নুরুল ইসলাম মল্লিক, সফি হোসেন খান, লুৎফর রহমান, জানে আলম, এম.এইচ. জামিল, ৮ বছরের বালক মেসলেহ উদ্দিন, বাদশা মিঞা, নাজির হোসেন, সুলতান মোহাম্মদ, মুস্তাফা মনোয়ার, মশিউর রহমান, লুৎফর রহমান, নিখিল সাহা, শামছুর রহমান, শাহজাহান মল্লিক, আবু বকর সিদ্দিক, কবির উদ্দিন, নাছির উল্লাহ, আবদুল মোতালিব, রুহুল আমিন, জালাল আহমেদ, দুলু আফেন্দি, হাদিস মোল্লা, সুবিমল গুহ, আবু বকর প্রমুখ।’৩

আবদুল মান্নান নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস গ্রন্থে ঐ দিনের ঘটনা ও গ্রেপ্তারকৃতদের সম্পর্কে বলেন, ‘পুলিশ ও ই.পি.আর এর গাড়ি চাষাঢ়া মোড়ে আসতেই জনতা তাদের প্রতি ইটপাটকেল ছুঁড়তে শুরু করে। এখানে শুরু হয় আরেক খ- যুদ্ধ। বার বার মার খেয়ে ইতিমধ্যে ই.পি.আর বাহিনী মারমুখো হয়ে পড়েছে। তারা গাড়ি থেকে নেমেই রাইফেলের বাট দিয়ে জনতাকে এলোপাতাড়ি মারতে শুরু করে। জনতার একাংশ দৌড়িয়ে সম্মুখস্থ বাইতুল আমানে (খান সাহেব ওসমান আলী এম.এল.এ’র বাসগৃহ) আশ্রয় নিলে পুলিশ ও ই.পি.আর সেখানেও প্রবেশ করে। ওসমান আলীকে তারা অমানুষিক অত্যাচার করে বাড়ির অন্যদের সঙ্গে গ্রেপ্তার করে। এ স্থানে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ছিলেন সফি হোসেন খান, লুৎফর রহমান, ইলা বকসী (মর্গান গার্লস হাই স্কুলের শিক্ষয়িত্রী), বেলু বেগম, মুস্তাফা সরওয়ার, বাদশা মিয়া, মশিউর রহমান, দবির উদ্দিন, নাসির উল্লাহ, মোতালিব, কাজী হাবিবুল্লাহ, জালাল, জালাল (২), শামসু, মুস্তাফা মনোয়ার, নূরুল ইসলাম মল্লিক, মোসলেহ উদ্দিন, সুবিমল গুহ, শাহজাহান মল্লিক, আবুবকর সিদ্দিক, কবির উদ্দিন, হাবিবুর রহমান, নুরুল আমিন, হাফিজ মোল্লা, আয়েশা আক্তার, ফিরোজা বেগম, খাজা জহিরুল হক, নিখিল সাহা, দুলু আফেন্দি।’৪

ঐদিন বাইতুল আমানে আশ্রয় নেয়া অনেককেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে। বাইতুল আমান থেকে মুস্তাফা মনোয়ারের সাথে তাঁর বোন হাসিনা রহমান ও ভগ্নিপতি লুৎফর রহমানকেও গ্রেপ্তার করে গাড়িতে তোলার সময় হাসিনা রহমান চিৎকার করে বলতে থাকেন তাঁর ৬ মাসের বাচ্চা রয়েছে, ওকে ছাড়া তিনি যাবেন না। পরে পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু পরদিন কালিরবাজারে কনস্টেবল হত্যার পর নারায়ণগঞ্জে আবারো যখন নির্যাতন ও ধরপাকড় শুরু হয় তখন হাসিনা রহমান তাঁদের বাসায় রাখা মুস্তাফা মনোয়ারের আঁকা বহু পোস্টার ও ক্যামেরায় তোলা অনেক ছবি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলেন।৫

বদরুদ্দীন উমর তাঁর পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি গ্রন্থে নারায়ণগঞ্জের সে দিনের ঘটনা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, ‘২৯শে ফেব্রুয়ারি যাদের আটক করা হয় তাদের মধ্যে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতৃস্থানীয় কর্মী মহম্মদ আওয়াল। তিনি ঐ দিনের গ্রেপ্তার সম্পর্কে বলেন, “আমাকে ও বিনয় রায়-কে হাজতে না ঢুকিয়ে থানার ভিতরে একটা কামরায় বসালো। থানায় আমি যখন বসে আছি তখন নারায়ণগঞ্জের পাঞ্জাবি এস.ডি.ও. ইমতিয়াজী ফোন করলো ঢাকাতে, হোম সেক্রেটারি আজফারকে। ৭৫ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করার কথা জানালে আজফার বললো Make it hundred, as far as possible Hindus. টেলিফোন হাতে রেখেই ইমতিয়াজী থানার ও.সি.-কে বললো, ২৫ জন হিন্দু ধরতে পারো? শেষ পর্যন্ত এক হোসিয়ারীতে গিয়ে ২৫ জন হিন্দুকে ধরে নিয়ে এলো আমরা থানায় থাকতে থাকতে।” এইসব ঘটনার পর ২৯শে তারিখেই নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্য ওসমান আলীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁর বাড়িখানা তল্লাশী ও বাড়ির আসবাবপত্র তছনছ করা হয়।৬

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থে এম.আর. বার্ণিক বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহের নারায়ণগঞ্জের ঘটনাবলী বিচলিত করে তোলে মুসলিম লীগ সরকারকে। ...বিকেলে পুলিশ মিসেস মমতাজ বেগমকে নিয়ে ঢাকা রওনা হলে জনতা চাষাঢ়া স্টেশনের নিকটে তাদের গমন পথে বাধা দেয়। ইতিমধ্যে ইপিআর ঘটনাস্থলে চলে আসে। এসেই তারা নির্বিচারে রাইফেল বাঁট দিয়ে ছাত্র-জনতাকে পেটাতে শুরু করে। তাদের হাত থেকে ছাত্রী মহিলারাও রেহাই পায়নি। ঐ দিন গ্রেপ্তার হন ছাত্রী ইলা বকশী ও বেলু ধর। নিরস্ত্র জনতা ইপিআর-এর প্রতি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এভাবে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী জনতা-পুলিশ-ইপিআর সংঘর্ষ চলে। এ পর্যায়ে ছাত্র-জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালের দুজন ডাক্তার ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসা করেন এবং নয়জনের আঘাত গুরুতর বিবেচিত হওয়ায় তাদেরকে হাসপাতালে প্রেরণ করেন। এই নয় ব্যক্তির মধ্যে কোন পুলিশের লোক ছিল না। পুলিশ পরে স্থানীয় এম.এল.এ ওসমান আলীর বাড়ি তল্লাশি করে এবং ওসমান আলীসহ কয়েক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। হাসপাতালে স্থানান্তরিত আহতরা হলেন নিজামুদ্দিন ভূঁইয়া (২০), মোহাম্মদ সাত্তার (১২), কফিলুদ্দিন (১২), মোহাম্মদ ইউসুফ (৩০) এবং অপর এক মূক বধির ব্যক্তি। (আহত ব্যক্তিদের মধ্যে মোঃ ইউসুফের নাম আছে)। রাতে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নারায়ণগঞ্জে এসে গ্রেপ্তারকৃতদের ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে নারায়ণগঞ্জে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। রাতে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়। ভাষা আন্দোলনের নেতাকর্মীদের বাসায় হামলা চালানো হয়। নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশ বেপরোয়া হয়ে ওঠে।৭

পর দিন ১ মার্চ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে লেখা হয়, ‘সকাল বেলা স্থানীয় পুলিশ নারায়ণগঞ্জ মর্গান বালিকা বিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষয়িত্রী মিসেস মমতাজ বেগমকে গ্রেপ্তার করে মহকুমা হাকিমের আদালতে হাজির করে। সংবাদ পেয়ে একদল ছাত্র ও নাগরিক আদালতের সামনে হাজির হয়, বিনা শর্তে তাঁর মুক্তি দাবি করে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ ইত্যাদি ধ্বনি করতে থাকে। মহকুমা হাকিম ইমতিয়াজী তখন বাহিরে এসে বলেন, মমতাজ বেগমকে স্কুলের তহবিল তসরুফের দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাথে তাঁর গ্রেপ্তারের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু জনতা তা বিশ্বাস করে না, বলতে থাকে, মমতাজ বেগম নারায়ণগঞ্জ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রবীণ কর্মী বলেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে। সুতরাং তাকে বিনা শর্তে মুক্তি না দিলে তারা আদালত প্রাঙ্গণ ছেড়ে যাবে না। পুলিশ তখন লাঠিচার্জ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে। বিকালে পুলিশ মোটর যোগে ঢাকা রওনা হলে চাষাঢ়া স্টেশনের কাছে জনতা বাধা দেয়। তাতে পুলিশ ও জনতার মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ লাঠিচার্জ করে। ফলে উভয় পক্ষে ৪৫ জন আহত হয়’।৮

২ মার্চ দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়, ‘ঢাকা, ২৯ ফেব্রুয়ারি অদ্য অপরাহ্নে এখান হতে ১০ মাইল দূরবর্তী নারায়ণগঞ্জে জনতার আক্রমণে প্রায় ২০ জন পুলিশের লোক আহত হয়েছে। প্রকাশ, একদল তহবিল তসরুফের একটি মামলায় অভিযুক্ত স্কুলের জনৈক হেডমিস্ট্রেসকে স্থ্নীয় আদালত হতে জেলে নিয়ে যাওয়ার সময় জনতা কর্তৃক আক্রান্ত হয়। কর্তৃপক্ষীয় মহল হতে জানা যায়, জনতা উক্ত হেডমিস্ট্রেসকে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে ধরা হয়েছে মনে করে সম্ভবত পুলিশ দলকে আক্রমণ করেছে ও তাঁকে উদ্ধার করতে চেষ্টা করেছে। প্রকাশ, জনতা ইট-পাটকেল ছোড়ার সময় পুলিশ নিকটবর্তী পুলিশ ফাঁড়িতে যেয়ে আশ্রয় নেয়। জনতা দু’ঘণ্টাকাল ইট-পাটকেল ছোড়ে এবং ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রোডের উপর গাছের গুঁড়ি ফেলে বাধার সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত পুলিশ অবিলম্বে ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয় এবং লাঠিচার্জ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সম্পর্কে কয়েক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’৯

৩ মার্চ দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার সংবাদে উল্লেখ করা হয়, ‘গত ২৯ ফেব্র“য়ারি তারিখে মর্গান এইচ ইস্কুলের প্রধান শিক্ষয়িত্রী মমতাজ বেগমকে গ্রেপ্তারের পর নারায়ণগঞ্জে যে হাঙ্গামা হয়, সে সম্পর্কে এ পর্যন্ত দু’জন ছাত্রীসহ ১১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’১০

১লা মার্চ শহরের কালীরবাজারে গুলিবিদ্ধ হয়ে জোবায়েদুল হক নামের এক পুলিশ কনস্টেবলের মৃত্যু হয় এবং অপর এক আনসার সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এ ঘটনায় সারা দেশে নতুন করে উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরকার এ ঘটনাকে রাষ্ট্রদ্রোহী ও কমিউনিস্টদের ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করতে থাকে। নারায়ণগঞ্জ শহরে পুনরায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম কর হয়। সরকারি সংস্থা এ.পি.পি’র বরাত দিয়ে পরদিন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় লেখা হয়, ‘গুলির আঘাতে নারায়ণগঞ্জে অদ্যরাতে পাহারারত একজন কনস্টেবল নিহত ও একজন আনসার আহত হইয়াছে। পূর্ববঙ্গ সরকার এ সম্বন্ধে দুঃখ প্রকাশ করিয়া এক ইশতেহারে জানাইয়াছেন যে, গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গেই কনস্টেবলের মৃত্যু হয়। আনসারটিকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। গভর্নমেন্ট নিহত ব্যক্তির শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি এবং আহত ব্যক্তির প্রতি সমবেদনা জানাইতেছেন। পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী জনাব নূরুল আমীন নিহত ব্যক্তির শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি এবং আহত ব্যক্তির প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করতো জনগণকে প্রদেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সহায়তা করিতে বলেন। প্রধানমন্ত্রী এ সম্বন্ধে অদ্য রাতে এক বিবৃতি দান করিয়া বলেন : “গুলির আঘাতে নারায়ণগঞ্জে পাহারারত একজন কনস্টেবল নিহত ও একজন আনসার অদ্য রাতে আহত হইয়াছে জানিয়া আমি ব্যথিত হইয়াছি। আমি এই নিহত ব্যক্তির শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জানাইতেছি। মৃত্যুবরণ করিয়া কনস্টেবল কর্তব্য পরায়ণতার মহান দৃষ্টান্ত রাখিয়া গেল। আমার বিশ্বাস, তৎদৃষ্টে জনগণের বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার দৃঢ়তা আরও বৃদ্ধি পাইবে। ভাষার প্রশ্নের আবরণে নীচে যে একটি রাষ্ট্রধ্বংসী কু-প্রয়াস চলিয়া আসিতেছে, তাহা ক্রমশ বাহির হইয়া পড়িতেছে। এমতাবস্থায় আমি সমুদয় পাকিস্তানিকে দেশের বৃহত্তম স্বার্থের খাতিরে প্রদেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কাজে সহায়তা করার আহ্বান জানাইতেছি।”১১

দৈনিক আজাদ এপিপি’র বরাত দিয়ে ‘নারায়ণগঞ্জের মিছিলে ‘যুক্ত বাংলা চাই’ ‘জয়হিন্দ’ ইত্যাদি ধ্বনি শোনা গেছে।’ শিরোনামে আরেকটি সংবাদ প্রকাশ করে। আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘নারায়ণগঞ্জে কালীবাজার এলাকায় ব্যাপক ত্রাসের সঞ্চার, বহুগৃহে পুলিশের হানা: ১১৫ জন গ্রেপ্তার’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, ‘গত শনিবার পূর্ব বঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ পাট ব্যবসা কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জের কালীরবাজার এলাকায় এক গুলি চালনার ঘটনার পর উক্ত এলাকায় ব্যাপক ত্রাসের সঞ্চার হয়। গুলি চালনার উক্ত ঘটনায় একজন পুলিশ কনস্টেবল এবং একজন আনসার নিহত হয়। কালীরবাজার এলাকায় প্রত্যেকটি গৃহে পুলিশ হানা দেয় এবং বহু লোককে গ্রেপ্তার করে। ঘটনার পর যেসব দোকান বন্ধ হইয়া গিয়েছিল, পুলিশ জোর করিয়া তাহা খোলায়। পুলিশের তল্লাশের সময় কয়েকটি দোকান লুণ্ঠিত হয় বলিয়া প্রকাশ। গু-া শ্রেণীর লোকেরা অবস্থার সুযোগ লইয়া কতিপয় দোকান লুট করে। বহুলোক পুলিশের হস্তে লাঞ্ছিত হয়। মোট ১১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হইয়াছে। ধৃত ব্যক্তিদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের মিউনিসিপ্যাল কমিশনার ও এডভোকেট শ্রী বিনয় কৃষ্ণ রায় অন্যতম। তাঁহাকে জননিরাপত্তা আইন অনুসারে গ্রেপ্তার করা হইয়াছে। নারায়ণগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটির ভূতপূর্ব চেয়ারম্যান জনাব অখিলুদ্দিন আহমেদের গৃহেও তল্লাশি করা হয়। প্রকাশ, কালীবাজার এলাকার অধিবাসীদের উপর ৫০,০০০ টাকা পাইকারি জরিমানা ধার্য করা হইয়াছে।’১২

এদিকে নিহত কনস্টেবল জোবায়েদুল হকের ময়নাতদন্তে দেখা যায়, নিহতের গায়ে বিদ্ধ গুলিটি ই.পি.আর বাহিনীর সদস্যদের রাইফেল থেকে ব্যবহৃত। ঘটনাটি ভুলক্রমে সংঘটিত। বিষয়টি জানাজানি হলে সরকার নিহতের পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে দশ হাজার টাকা প্রদান করে। কিন্তু এ ঘটনাটিকে সরকার বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে। ১ মার্চের ঘটনা প্রসঙ্গে বদরুদ্দীন উমর তাঁর পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘১লা মার্চ নারায়ণগঞ্জে আততায়ীর গুলিতে সৈয়দ জোবায়েদ নামক একজন পুলিশ কনস্টেবল নিহত এবং খলিল আহমদ নামক একজন আনসার গুরুতরভাবে আহত হয়। এই কনস্টেবল নিহত হওয়ার প্রসঙ্গে মহম্মদ আওয়াল (নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী মুসলিম লীগের কর্মী) বলেন, “যে আনসারকে মারা হলো সে দাঁড়িয়েছিলো সিটি আওয়ামী লীগ সম্পাদক আলমাসের বাড়ির সামনে। একটা বুলেট এসে তার বুক বিদ্ধ করে আলমাসের দোকানে এসে পড়ে। পুলিশ ইন্সপেক্টর নবিউল হক চৌধুরী তদন্ত করে, ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারি। সে রিপোর্ট দেয় যে, যে বুলেটটা পাওয়া গেছে তাতে মার্ক ছিলো বেঙ্গল পুলিশ এবং তৎকালে ব্যবহৃত হচ্ছিলো ই.পি.আর. এর দ্বারা। ঘটনার পর পুলিশ আমার এবং আলমাসের বন্দুক সিজ করেছিলো কিন্তু এই তদন্ত রিপোর্ট দাখিলের পর বন্দুক আমাদের ফেরৎ দেওয়া হয়”।’১৩

পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীন ৩ মার্চ রেডিওতে এক ভাষণে আন্দোলনকারীদের ষড়যন্ত্রকারী এবং নারায়ণগঞ্জে ‘জয়হিন্দ’ ও ‘যুক্তবাংলা চাই’ স্লোগান হয়েছে বলে প্রচার করেন। এর দুইদিন পর করাচি থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নূরুল আমীনের বেতার ভাষণের তীব্র সমালোচনা করে সংবাদ মাধ্যমে একটি বিবৃতি প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমান অবস্থাকে সমর্থন করিয়া তিনি যে বিবৃতি দান করিয়াছেন তাহার একটি পরিচ্ছেদ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি পুনরায় অখ- বঙ্গের রব তুলিয়াছেন, নারায়ণগঞ্জে অনুষ্ঠিত শত শত সভার মধ্যে কোন এক সভায় নাকি অখ- বঙ্গের ধ্বনি তোলা হইয়াছিল। আমি বিনাদ্বিধায় বলিতে পারি কোন পাকিস্তানিই উহার সমর্থক নহেন। গোয়েন্দা বিভাগের ফাইলে যদি উহা উল্লেখ করা হইয়া থাকে বা জনাব নূরুল আমীন যদি এই ধ্বনী শুনিয়া থাকেন, তাহা হইলে বলিতে হইবে যে, প্ররোচনা দানকারী দালালরাই উহার জন্য দায়ী অথবা নূরুল আমীনকে যথেচ্ছ চ-নীতি প্রয়োগের সুযোগদানের জন্য সরকারি দালালরাই এই ধ্বনি তুলিয়াছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে অখ-বঙ্গের ধ্বনি তোলা হইলে তাহা আত্মহত্যারই শামিল এবং তাহা সহ্য করা যাইতে পারে না। উহা দেশদ্রোহীতার পর্যায়ভুক্ত। কাহারও পক্ষে এই ধ্বনি তোলা সম্ভব বলিয়া আমার মনে হয় না। ভারত বিভাগের সহিত বঙ্গ-আসাম ও পাঞ্জাবের বিভাগও সম্পন্ন হইয়াছে এবং উহা চিরস্থায়ী হইবে।’১৪

নূরুল আমীনের সেদিনের রেডিও ভাষণ প্রসঙ্গে সে সময়ে রেডিওতে কর্মরত কাজী মুহম্মদ ইদ্রিস বলেছেন, ‘আমি সেদিন সকালে সেক্রেটারিয়েটে কাজে যাওয়ার পর আমাদের পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টের সকলকে নূরুল আমীন সাহেবের বাসাতে নিয়ে যাওয়া হলো। শুনলাম নূরুল আমীন বেতার বক্তৃতা দেবেন, সেজন্য আমাদের যেতে হবে। আমরা গেলাম। গিয়ে দেখলাম, দোতলায় আজিজ আহমদ, আজফার, ফজলে করিম ফজলী প্রভৃতির সাথে নূরুল আমীন তাঁর খসড়া তৈরি করেছিলেন। আমরা নিচের তলায় অপেক্ষা করতে থাকলাম। ওপরে খসড়াটি শেষ হলে নিচে আমাদের সেটি বাংলা করতে বলা হলো। সেই সময় ফজলী সাহেব নিচে নেমে এসে আমাদের বললেন যে, ইংরেজি বক্তৃতাটির মধ্যে একটা কথা নেই সেটা যোগ করে বাংলা ভাষ্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে। কথাটি হলো এই যে, সেদিন নারায়ণগঞ্জে একটি প্রসেশন হয়েছে এবং সেই প্রসেশনের মধ্যে ‘যুক্ত বাংলা চাই’ এই স্লোগান দেওয়া হয়েছে। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে সমস্ত ভাষা আন্দোলনটি এ দেশের ছাত্রদের সৃষ্টি আসলে নয়। এটা হলো বিদেশি দুশমন এবং তাদের দালালদের দ্বারা অনুপ্রাণিত। এ সময় স্বাধীনতা কাগজেও লিখেছিলো যে, কমিউনিস্টরাই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সত্যিকার নেতা ইত্যাদি। নূরুল আমীনের কাছে সে কাগজও ছিলো, যার জন্য তিনি বলছিলেন যে, সমস্ত আন্দোলনটিই আসলে কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র।’১৫

পরবর্তী সময়ে ১৯৬৮ সালের ২৮ জুন নূরুল আমীন এক সাক্ষাৎকারে নারায়ণগঞ্জে এ দিনের ঘটনা সম্পর্কে যা বলেন তা বদরুদ্দীন উমর তাঁর পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জের এই হত্যাকা- সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন বলেন যে, সেখানে ঐ সময়ে গুলিতে কোন আনসারের নিহত হওয়ার ব্যাপারে তাঁর কিছু স্মরণ নেই।’১৬

কিন্তু চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সে ষড়যন্ত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৪ঠা মার্চ নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল মাঠে আনসারদের এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে আনসার বাহিনীর মহাপরিচালক এ.এইচ.এম.এস দোহা ভাষা আন্দোলনকে হিন্দুদের কারসাজি ও ভারত সরকারের ষড়যন্ত্রের অংশ বলে উল্লেখ করেন। তিনি ২৯ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জে গ্রেপ্তার হওয়া প্রসঙ্গে বলেন, ‘যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের মধ্যে ৩৭ জন হিন্দু যুবক। আশ্চর্যের বিষয় এরা সকলেই অল্প দিন পূর্বে কলকাতা হতে নারায়ণগঞ্জ আসে। গ্রেপ্তারের সময় এরা সকলেই মুসলমানি লেবাস পরিহিত ছিল। আরও লক্ষ করার বিষয় এ সময় ভারত থেকে গড়ে প্রতিদিন দুই হাজার হিন্দু পূর্ববঙ্গে প্রবেশ করতে থাকে।১৭

নারায়ণগঞ্জে ৭ মার্চ পর্যন্ত ১৪৪ ধারা ও কারফিউ বলবৎ থাকে। এ কারফিউর মধ্যেও পুলিশ এলাকার বহু লোককে গ্রেপ্তার করে। ৮ মার্চ দৈনিক আজাদ এর ‘নারায়ণগঞ্জে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার’ শিরোনামে সংবাদে বলা হয়, ‘স্থানীয় পুলিশ নারায়ণগঞ্জ মর্গান গার্লস হাইস্কুলের জনৈকা শিক্ষয়িত্রীকে গ্রেপ্তার করায় শহরে কয়েকদিন পূর্বে যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির উদ্ভব হইয়াছিল এবং তজ্জন্য স্থানীয় মহকুমা হাকিম কর্তৃক যে ১৪৪ ধারা ও সান্ধ্য আইন জারি হইয়াছিল, অদ্য হইতে তাহা প্রত্যাহার করা হইয়াছে। গতরাত্রে সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করায় পুলিশ ২২ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করিয়াছিল। অদ্য তাহাদের জরিমানা করা হইয়াছে।’১৮

কোন আন্দোলনই সরল পথে এগোয় না। ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এ আন্দোলন কখনো স্তিমিত হয়েছে, কখনো বেগবান হয়ে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের ২৯ ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষা আন্দোলনকে নতুন করে সঞ্জিবীত করেছে, নিঃসন্দেহে আন্দোলনকে পরিণত হতে রসশিক্ত করেছে।

তথ্যসূত্র

১. আবদুল মান্নান, নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস, সুধীজন পাঠাগার, মুদ্রণ ১৯৮৫, পৃষ্ঠা ১৭৮
২. মুস্তাফা মনোয়ার, লেখকের সাথে স্মৃতিচারণ, তারিখ : ২১-১১-২০১৭
৩. মুস্তাফা সরওয়ার, দৈনিক ইত্তেফাক, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৮
৪. আবদুল মান্নান, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৭৯
৫. মুস্তাফা মনোয়ার, প্রাগুক্ত
৬. বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, ৩য় খ-, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, সংস্করণ : ১৯৯৫, পৃষ্ঠা ২৮১
৭. এম.এ. বার্ণিক, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ঘটনা প্রবাহ ও প্রেক্ষিত বিশ্লেষণ, এ এইচ ডেভেলপমেন্ট পাবলিশিং হাউস, সংস্করণ ২০০৫, পৃষ্ঠা ২৮১,২৮২,২৮৩
৮. দৈনিক আজাদ - ১ মার্চ ১৯৫২
৯. দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার - ২ মার্চ ১৯৫২
১০. দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার - ৩ মার্চ ১৯৫২
১১. দৈনিক আজাদ - ২ মার্চ ১৯৫২
১২. দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার - ৭ মার্চ ১৯৫২
১৩. বদরুদ্দীন উমর, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৮১
১৪. দৈনিক আজাদ - ৯ মার্চ ১৯৫২
১৫. বদরুদ্দীন উমর, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৯০
১৬. বদরুদ্দীন উমর, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৮১,২৮২
১৭. সাপ্তাহিক মতামত, ৩য় বর্ষ, ১১শ’ সংখ্যা, ১৫ মার্চ, ১৯৫২
১৮. দৈনিক আজাদ - ৮ মার্চ ১৯৫২

সব খবর
ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ বিভাগের সর্বশেষ