শনিবার ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮

আমার কাছে ঈদ মানে কসকো সাবানের ঘ্রান

রবিবার, ১৭ জুন ২০১৮, ০৯:৪৫

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: ছড়ায় ছন্দে জীবনের অনেক রূঢ় বাস্তবতাকে যিনি তুলে ধরেন সহজ ভাষায়। যার স্বরচিত কবিতা আবৃত্তির ভক্ত নারায়ণগঞ্জের প্রায় সকল শ্রেণির মানুষ। তিনি নারায়ণগঞ্জের পরিচিত মুখ, প্রিয় ব্যক্তিত্ব, কবি,ছড়াকার আহমেদ বাবলু। লেখালেখির সাথে যুক্ত আছেন শৈশব থেকে। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত কবিতার বইয়ের সংখ্যা ৬ টি। সর্বশেষ দেশজ জাতীয় পান্ডুলিপি প্রতিযোগীতা ২০১৭ তে পুরস্কৃত হয় তার বই “আকাক্সক্ষার বিষন্ন গল্প’। এছাড়াও তিনি নারায়ণগঞ্জের ব্যান্ড শহুরে গায়েনের সংগঠক। প্রেস নারায়ণগঞ্জের এবারের ঈদ আয়োজনে আমরা কথা বলেছি এই ছড়াকারের সঙ্গে তার লেখা, সাহিত্য ভাবনা, ছড়াকার বা লেখক হয়ে ওঠা এবং ব্যক্তি জীবন নিয়ে।সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন প্রেস নারায়ণগঞ্জ এর স্টাফ রিপোর্টার আফরিন আহমেদ।

ঈদ মানে কসকো সাবানের ঘ্রান...
আমার ছেলে বেলায় কসকো সাবান খুব জনপ্রিয় ছিল। অনেকটা এলিটিয় ধরনের পণ্য। সব সময়ে এ সাবান ব্যবহার করা হতো না। কিন্তু ঈদ এলে কসকো সাবান গায়ে মাখাটাই ছিল আমারদের জন্যে অনেক আনন্দের।এই সময়ে এসে ছেলে বেলার ঈদের কথা মনে করলে,সবার প্রথমে মনে পরে কসকো সাবানের কথা।
একটা নতুন জামা পাবো কিনা তার নিশ্চয়তা ছিল না। ফলে একটা উদ্বেগ আর আকাঙক্ষার মধ্য দিয়ে ঈদের জন্যে অপেক্ষা করতাম। এবং যখন পেতাম রাতে বিছানায় নিয়ে ঘুমানো আর ভোর হওয়ার অপেক্ষা। নামায পড়ে মসজিদ হতে বের হয়ে প্রথমেই, মুকরুম নামে এক ধরনের সন্দেশ ছিল সে সময়ে। তা কেনা ছিল অত্যাবশ্যকীয় কাজ, বলা চলে ফরয কাজ ছিল। তারপরে এক টাকা দামের প্লাস্টিকের রঙিন ঘড়ি আর রঙিন চশমা লাগিয়ে বাড়ি ফেরা । এই অনুভুতিগুলোই আসলে ছোট বেলার ঈদ। আর এখনকার ঈদ ছেলে বেলার ঈদের মত তেমন রঙিন হয় না।

মাঝে মাঝে নিজেকে উপন্যাসের চরিত্র মনে হয়...
আমার ছেলে বেলা কাটে নারায়ণগঞ্জেই। পাইকপাড়ায় আমার জন্ম, শৈশব। পাইকপাড়ার নামাপাড়া এলাকায় জয় গোবিন্দ হাই স্কুলের পেছনে ছিল আমাদের ভাড়া বাড়ি। শৈশবে স্কুলে যেতে আর দশটা শিশুর মতো আমারও ভালো লাগতো না। যদিও বাবা মা চাইত আমি স্কুলে যাই। কিন্তু নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম হওয়ায় আমার পারিপার্শ্বের অনেক শিশুই যেহেতু শ্রমজীবী ছিল, তখন কাজটাই আমাকে বেশি আকর্ষণ করতো। মনে হতো স্কুলের চেয়ে কাজেই বেশি স্বাধীনতা। আর পারিবারিক অসচ্ছলতাও যেহেতু ছিল সেহেতু শেষ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনাটা আমার আর হয়ে উঠে নি। সুতরাং আমি নিজেকে স্বশিক্ষিত বললে ভুল বলা হবে না।
‘আমার বন্ধু কথন’ নামে আমার একটা লেখা আছে। সেখানে আমি আমার শৈশবের দু/তিন জন বন্ধুর কথা বলেছি। একজন দেলোয়ার নামে একজন বন্ধু ছিল। আমরা ডাকতাম দেলু বলে। যতখানি মনে পড়ে দেলুকে নিজের পায়ে আমি কখনো হাঁটতে দেখিনি। ও দাঁড়াতে পারতো না। দেলুর মা ওকে প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় বসিয়ে দিয়ে যেত ভিক্ষার জন্যে। দেলুর সাথে আমার অনেক বন্ধুত্ব ছিল, ওর সাথে বসে বসে গল্প করতাম, ছয়গুটি, নয়গুটি, বারো গুটি খেলার স্মৃতি আছে। বেশিরভাগ সময় দেলুই জিতত, আমি পারতাম না। মাঝে মাঝে ওর ভিক্ষার পয়সা চুরি করতাম। যেহেতু জানা ছিল যে ও দৌড়াতে পারবে না, তাই কখনো কখনো ছিনতাই করতাম।
আলী আশরাফের কথা মনে হলে ওর সাদা শরীর কালো হাফপ্যান্টের ছবি চোখে ভাসে। ওর সাথে পুকুর পাড়ে টারজান টারজান খেলতাম। ও ই জিততো। ওরাই ছিল আমার শৈশবের বন্ধু।
স্কুল ছেড়ে নয়ামাটি হুশিয়ারী কারখানায় যুক্ত হই। সেখানকার অনেক কথা মনে পড়ে। অনেক গল্প, যা বলে শেষ করা যাবেনা। বলার মত আসলে অনেক গল্প আমার ঝুলিতে আছে। এত এত গল্পের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা। বেড়ে উঠতে উঠতে আজকের আহমেদ বাবলু। নিজেকে মাঝে মাঝে একটা উপন্যাসের চরিত্র মনে হয়। আমি আসলে আমাকেই মাঝে মাঝে বিশ্বাস করে উঠতে পারি না । বিস্ময়ের সাথে বলি, এটা আমি!!
আমার লেখা চারটা লাইনও আছে এমন-
আমার চোখের সামনে আমার বদলে যাওয়া দেখি
চমকে গিয়ে অস্ফুট স্বর বেরিয়ে পড়ে, একি!
এই লোকটাই আমি নাকি? যায় না কেন চেনা!
তোমারো কি তেমনটা লাগছে না!

আমার কাছে সুরের মানুষ ছিল আমার বাবা...
আমার বাবার কথা আমার লেখালেখিতে তেমন আসেনি। কারণ যখন বাবা কাছে ছিলেন, অনেকটা ঘিরে ছিলেন। এই ঘিরে থাকার ফলে বাবাকে নিয়ে ভাবনার অবকাশটা পাইনি। এখন দুরে থাকার ফলে এক ধরনের নির্মোহ ভাবে তাকে দেখতে পাই। পুত্র হিসেবে কিছুটা মোহ অবশ্য থেকেই যায়।
আমার বাবা ছিলেন অনেকটা রঙিন স্বভাবের মানুষ। শিক্ষায় কিংবা অর্থনৈতিক ভাবে নিম্ন শ্রেণির মানুষ ছিলেন। তবে তার মধ্যে অসাধারণ কিছু ব্যাপার ছিল। ‘হাটুরে কবিতা’ যা গ্রামে গঞ্জে একটা সময় তুমুল জনপ্রিয় ছিল। আঙ্গিকের দিক থেকে অনেকটা উপাখ্যানমূলক। পয়ারন ত্রিপদী, পঞ্চপদী ধুয়া এমন সব সুরে, অনেকটা পুঁথির ঢঙে এ কবিতা লেখা হতো। যে সুরে আমার বাবা এ কবিতা করতেন, তা ঐ সময়কার অনেক প্রতিষ্ঠিত পুঁথি পাঠকদের থেকেও অসাধারণ ছিল। আমার এখনো মনে পড়ে ঐ সময়, তখন তো আর এত টিভি চ্যানেল ছিল না কেবল ছিল বিটিভি। বিটিভি তে পুঁথি পাঠ করতেন আব্দুল লতিফ। বাবার কণ্ঠের কাছে তার কণ্ঠ বেশ ফিকে মনে হতো। আমার কাছে সুরের মানুষ ছিল আমার বাবা। তাঁর কাছ থেকে লোক কবিতা, গান, লোক কাহিনি শুনে শুনে বড়ো হওয়া। বাবা অসাধারণ গল্প বলতেন। গ্রামের হাটে বাজারে গল্প শুনিয়ে মানুষ জড়ো করা যাকে বলে মজমা। আমার বাবা এ কাজে খুবই দক্ষ ছিলেন। তার গল্প কয়েক প্রজন্ম ধরে জনপ্রিয় ছিল।

প্রথম কবিতা...
এটা একটা শৈশবের স্মরনীয় স্মৃতি। একদিন কাজে ফাঁকি দিয়ে স্টেশনে ঘুরছি। তখন আমার মায়ের কথা খুব মনে পড়ে এবং মায়ের জন্যে কয়েকটা লাইন একটা ছেড়া কাগজে লিখার চেষ্টা করি। এরপর ঠিকানা লিখার পর ভাবলাম এটা মাকে পাঠাতে হবে। পোস্ট বক্সে ফেলে দেই মার উদ্দেশ্যে। আমার ধারনা ছিল মা এটা পাবে। এটা আমার প্রখম কবিতা লেখার অভিজ্ঞতা। যদিও কী লিখেছিলাম আজ আর তা মনে নেই।
এছাড়াও, আমি সচেতন ভাবে যখন লেখালেখি শুরু করি একটি লেখার কথা আমার প্রায়ই মনে পড়ে, যেটা আমি ভুলতে পারিনা। লেখাটি ছিল এমন,
“আসছে বৃষ্টি জোরসে নেমে,
তাই বেল কি থাকবে থেমে।
কাপড় চোপড় ঘরে আনো,
বোকার মতো রইছ কেন।
বোকার মত থাকবে যদি,
থাকো একা নিরবধি।
আমার ঘরে থাকতে হলে,
থাকবে শুধু কথা বলে।
বোকার মত থাকবে যদি যেতে হবে ঘর ছেড়ে,
এই যাওয়াই শেষ যাওয়া জীবন মরণ সব তরে”
এই লেখাটা কেবল আমার স্মৃতিতে সংরক্ষিত আছে। বড়ো হয়ে শৈশবের এই কবিতাটি যে আমার লেখা তা নিয়ে আমার নানান সময়ে সংশয় জাগে। এই কবিতাটি আমি সম্ভবত যখন লিখেছি তখন আমার বয়স ১০ কি ১১ হবে। যখন আমি লেখালেখি শুরু করি এত অল্প বয়সে এমন একটা কবিতা আমি লিখেছি ভাবতে বিস্ময় জাগে। তাই আমি কোথাও বলি না এটা আমার প্রথম লেখা। আমার এক ধরনের অবিশ্বাস জন্মায় এই লেখাটার উপর যে এটা আমার রচনা। কিন্তু এটা যে আমার লেখা না এমন কোন প্রমাণও আমি খুঁজে পাই না।

প্রথম প্রকাশিত কবিতা “বদলে গেছে”...
১৯৮৬ সালে নারায়ণগঞ্জে সাহিত্য জোট নামে একটি সংগঠন ছিল। আব্দুর রহমান যিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং কবিও ছিলেন, তিনি এ সংগঠনের প্রধান ছিলেন। কবি আমজাদ হোসন, ড. সৈকত আজগর, জালালুদ্দিন নলুয়া, চঞ্চল মেহমুদ কাশেম এরকম অনেক কবি এর সাথে যুক্ত ছিল। তো সেই সাহিত্য জোট থেকে ১৯৮৬ সালে তাদের একটি মুখপত্র বের হয় লেখালেখি নামে। যার প্রচ্ছদ করেন মাহবুব কামরান। সেখানে আমার প্রথম লেখা ‘বদলে গেছে’ নামে একটি কবিতা প্রকাশিত হয় । এটিই আমার প্রথম প্রকাশিত লেখা।

‘তুমি আকাশ বলে’...
আমার প্রথম বই আসলে প্রকাশিত ও প্রচারিত ৬ টা বইয়ের মধ্যে নাই। আমার প্রথম বই যেটা ছিল সেটা একটা যৌথ প্রকাশনা। ১৯৯২ বা ৯৩ সালে পকেট বই আকারে বইটা প্রকাশ হয়। সেই সময়ের তুখোড় বন্ধু এবং গল্পকার রশীদ আহমদ রবির একটা গল্প আর আমার কিছু কবিতা নিয়ে বইটি প্রকাশিত হয়। একপাশে বন্ধু রশীদের গল্প আর অন্যপাশে আমার কিছু কবিতা। গল্প কবিতার মিশ্রণ বলা যায়। বইটিতে আমার কবিতার অংশের নাম ছিল ‘তুমি আকাশ বলে’।

এখানে আমি আমার লড়াইয়ে জিতে গেছি সুহাসিনীর মত একজন বন্ধু পাশে আছে বলে...
লেখালেখির অনুপ্রেরণা প্রথমেই আমার পরিবার। চার ভাই, তিন বোনের মধ্যে আমি পঞ্চম আর ভাইদের মধ্যে তৃতীয়। বাবার কাছ থেকে, বলা চলে অনেকটা জেনেটিক্যালি লেখালেখির অনুপ্রেরণা। এছাড়া আমার বোন মণি খন্দকার একজন অভিনয় শিল্পী ছিলেন। ঢাকা নারায়ণগঞ্জ এমনকি কলকাতায় অভিনয়ের অভিজ্ঞতা আছে। অনেক পুরষ্কার পেয়েছেন। এর ফলে যেটা হয়েছে খুব নিভৃতে সাহিত্য চর্চার একটা পারিবারিক পরিবেশ আমি পেয়েছি। সেটা খুৃব উচ্চকিত কিছু নয়। পরে আমার মেজো ভাই আবুল হোসেন আমাকে অনেক অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, যা আমার লেখালেখির জন্যে অনুকূলে ছিল। ২০০০ সালের দিকে একটি সংগঠন আমাকে অনেকটা অনুপ্রাণিত করেছে সেটা হলো সমগীত সংস্কৃতি প্রাঙ্গণ। আমার প্রথম প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ বই “ভাবনা ভরা ছন্দ ছড়া” সমগীত প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। সমগীতের সাথে পরিচয়ের সূত্রে আমার লেখার ধরণ বদলে যায়। এক ধরনের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরী হয়। আমার গানের কথা বদলাতে থাকে, আমার ছড়ার ভাষা বদলাতে থাকে। এবং গানে অনেক আগে থেকে কাজ করলেও নতুন ভাবে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে অমল আকাশ। এরপর শাহীন মাহমুদ, তারিক মাহমুদ ও আবু হানিফের সাথে মিলে গড়ে তোলা সংগঠন শহুরে গায়েন এর কথা বলা যায়। এখন গায়েনে অতটা সক্রিয় সদস্য হিসেবে নেই। তবে যতদিন সক্রিয় ছিলাম গায়েন আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে, প্রভাবিত করেছে। এছাড়াও ১৯৮৭ থেকে ৯২ পর্যন্ত আমি ক্রান্তি খেলাঘর আসরের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করি। এই সংগঠনের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
আর যার কথা বলবো, সে আমার কাছের বন্ধু, যার সাথে আমি সংসার করি সুহাসিনী লিপি। আমার কাছে মনে হয় এই মানুষটার সাথে সংসার না করলে আমি হয়ত আজকে যে অবস্থানে আছি সে অবস্থানে থাকা হতো না। কারণ আমার দেখা সমাজের বেশিরভাগ মানুষ সংসারে এসে পরাজিত হয়। প্রাত্যহিক জীবন যাপনে, প্রাত্যহিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খায়। এখানে আমি আমার লড়াইয়ে জিতে গেছি সুহাসিনীর মত একজন বন্ধু পাশে আছে বলে। এবং সে আমার লেখার সবচে বড় সমালোচকও।

সব খবর
সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বশেষ