শুক্রবার ২৩ এপ্রিল, ২০২১

আইভী ও মাওলানা আউয়ালের ফোনালাপে যা ছিল

বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২১:২৭

প্রেস নারায়ণগঞ্জ.কম

প্রেস নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও ডিআইটি মসজিদের খতিব হেফাজতে ইসলামের জেলা শাখার আমীর মাওলানা আব্দুল আউয়ালের ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। সাম্প্রতিক মসজিদ-মাদরাসা নিয়ে মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রসঙ্গে মাওলানা আব্দুল আউয়াল ও সিটি মেয়র আইভীর মধ্যকার কথোপকথন শোনা যায় ওই ফোনালাপে। অভিযোগের অনেক বিষয়ে ওই ফোনালাপে খোলাসা হয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি ডিআইটি মসজিদে জুমার নামাজের খুতবার পূর্বে বয়ানে মেয়রকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে সিটি মেয়রকে উষ্মা প্রকাশ করতে শোনা যায়। এ সময় মেয়র আইভীর সরাসরি কিছু প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি মাওলানা আব্দুল আউয়াল৷ তাদের কথোপকথন নিচে তুলে ধরা হলো:

মাওলানা আব্দুল আউয়াল: আমাদের নুুরুল ইসলাম সাহেবকে আপনি বলেছিলেন যে তাকে আপনারা এখানের সাধারণ সম্পাদক বানিয়েছেন। কে আপনাদের এ অধিকার দিলো, কীভাবে বানালেন? সে কথাটা তিনি আমাকে বলেছেন। আমি বলেছি, এখানে আমি সাধারণ সম্পাদক হয়ে মসজিদের কোন ক্ষতি করি নাই। বরং এটার জন্য তিনি এত মাথাব্যাথা নিয়ে আছে। আর এভাবেই একটার পর একটা কথাগুলো আসতেছে। মাসদাইর কবরস্থানে দীর্ঘদিন ধরে মাদরাসাটা ছিল এবং তা আপনি বানিয়ে দিবেন বলছেন।

উত্তরে সেলিনা হায়াৎ আইভী: আচ্ছা আমি যে বানিয়ে দিবো এ কথাটা আপনি শুনেছেন?

আব্দুল আউয়াল: এ কথাটা তো আমাকে কয়েকটা লোকে বলেছে।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: কে বলেছে?

আব্দুল আউয়াল: মাদারাসা কমিটির সাথে জড়িত ব্যক্তিরা আমাকে এ খবর দিয়েছে।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: আপনি এত বড় আলেম তাহলে আপনার কান কথা শুনে বিশ্বাস করা কী উচিত? আপনি কী এ বিষয়ে সভাপতি সিদ্দিক সাহেবকে কিছু জিজ্ঞেস করেছেন? তিনি কী এ বিষয়ে আপনাকে কিছু বলেছে?

আব্দুল আউয়াল: সিদ্দিক সাহেব বলে নাই। কিন্তু তার কিছু সহযোগীদের থেকে শুনেছি।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: আপনাকে সিদ্দিক সাহেব বলে নাই। তাই এই শোনা কথা বলার ক্ষেত্রে আমাকে একবার জিজ্ঞেস করা দরকার ছিল। আপনি যেমন একজন সম্মানিত ব্যক্তি, ঠিক আমিও একজন সম্মানিত ব্যক্তি। এটা কিন্তু আপনি মনে রাইখেন। আমি কিন্তু একজন নারী দেখে আমাকে অবহেলা করিয়েন না, আমি কিন্তু আপনার মায়ের জাত।

আব্দুল আউয়াল: অবশ্যই, নারী দেখে নয় বিশেষ করে আপনাকে আমি অনেক সম্মান করছি। কিন্তু যখন এখানে আমাদের উপর এ কথাগুলো আসছে। তখন একটার পর একটা কী অবস্থা হয়ে গেল। তিনি তাদেরকে পাশের জায়গা দিয়ে দিচ্ছে, সবকিছু হচ্ছে কিন্তু তার কোনো মাথা ব্যাথা নাই। আমি মসজিদের কয়েকটা দোকান নিয়ে রনি, আবুল কালামকে বলেছি। সেগুলো আমাদের দিবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা সে হিসেবে রয়েছি। মাঝখানে শুনি এটার (ডিআইটি মসজিদ) উপরে ফ্লাইওভার হবে। আর এ ফ্লাইওভার করলে এটা দৃষ্টিকটু হয়ে যাবে।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: একটা একটা করে শেষ করি। আপনি সবগুলো শোনা কথা শুনে যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটা কিন্তু আপনি সঠিক করেন নাই। কালকে যখন পত্রিকায় দেখবো আমি তার প্রতিবাদ দিবো। প্রথমত, আপনার কাছে আলেম সমাজ অনেক আছে। এই জন্য আল্লাহ বলে নাই যার এত বড় শক্তি আছে সে অন্যরে যা খুশি তাই বলবেন। এটা কিন্তু ঠিক না। দ্বিতীয়ত, কবরস্থান মসজিদের মাদারাসা নিয়ে আপনি কিছুই জানেন না। এটা ১০ বছরের আগের কাহিনী। আপনি না জেনে বলছেন। আমি কিন্তু কবরস্থানের জায়গায় মাদরাসা করতে পারি না। মাদরাসা যখন করা হয় তখন কিন্তু টাকা নিয়ে করা হয়। শোভন গার্মেন্টসের মালিক সিদ্দিক কাকার সাথে কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, তিনি মাদরাসার জন্য ২ না ৩ শতাংশ জায়গা কিনেছেন। তিনি নিজের মাদরাসা নিজে চালাবনে। আপনি না জেনে হুজুর আমার উপর কোনো অভিযোগ করবেন না। আপনাকে আমি অনেক সম্মান করি। কিন্তু এর মানে এই না যে আপনি আমাকে যা খুশি তাই বলবেন।

আব্দুল আউয়াল: আর বাগের জান্নাতের ব্যাপারটা?

সেলিনা হায়াৎ আইভী: বাগে জান্নাতের ব্যাপারটা আপনি আমাকে বলেন, অবৈধভাবে ২০ না ৩০ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে এটা ন্যায় না অন্যায়?

আব্দুল আউয়াল: এই জায়গায় কিছু কবর ছিল এবং একটা মসজিদ হয়েছে। আর জায়গাটা অবৈধ বলছেন, জায়গাটা তো আপনার অধীনে। শহরের মধ্যে আপনি কতজনকে কত জায়গা দিয়েছেন।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: আমি বৈধ করবো কী করবো না সেটা পরের ব্যাপার। আগে আপনি বলেন, এটা বৈধ কিনা?

আব্দুল আউয়াল: যারা বলতেছে তাদের কাছে একটা দলিলও আছে।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: কোনো দলিল নাই। সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলছে। যারা বলছে আপনি কী তাদের সাথে নিয়ে আমার সঙ্গে বসবেন?

আব্দুল আউয়াল: আমি অবশ্যই তাদেরকে ডাকবো।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: আপনি তাদের বলবেন, তাদের দলিলটা আমাকে দেখাতে। আমি ১ নয় বরং ১০০ শতাংশ জায়গা দিয়ে দিবো। আর আমি যদি না দেয় তাহলে আপনি যে শাস্তি দেন আমি তা মেনে নিবো। কিন্তু মিথ্যা দিয়ে এভাবে একজন সম্মানিত ব্যক্তিকে অসম্মান করা আল্লাহ সহ্য করবে না। আল্লাহর আরশও কিন্তু কেঁপে উঠবে। আর আপনি না শুনে আমার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিবেন। আপনি আমার কবর রচনা করে দিবেন। এটা কিন্তু ঠিক না।

আব্দুল আউয়াল: এটা তো কথার বশে কথা এসে পড়েছে।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: আমাদের তো কোন কথা আসে না। একটা কথা যদি বেফাঁসে বলি তাহলে আপনারা মিছিলে নেমে যান। বাগে জান্নাত সিএস, এসএ ও আরএস এই তিন দিক থেকে সিটি করপোরেশনের জায়গা। এখানে তারু সরদার, আমার বাবার সাথে সে যখন কমিশনার তখন জায়গা চেয়েছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর নাজিম উদ্দিন মাহুমদের কাছে আবেদন করেছিল ৬ শতাংশ জায়গার জন্য। মন্ত্রণালয়ে সেই ৬ শতাংশের জন্য পাঠানো হয়েছিল, যা এখন পর্যন্ত দেয় নাই। ২০১০ সালে এ জায়গা বৈধ করার জন্য বলেছিলাম, আমি এখানে মসজিদ করে দিবো। এবং যে মসজিদটি আছে তার কমিটি আমার কাছে আবদার করলো, আপনি একটু জমি বাড়িয়ে দেন। আমি বললাম ঠিক আছে ৬ এর জায়গায় আমি ১০ বাড়িয়ে দিলাম। শর্ত হলো আমি মসজিদটি একসাথে মিলেমিশে করে দিবো। তারা তখন রাজি হয়েছে। আমি যখন মসজিদটি দেখতে গেলাম, তখন কমিটি আমার কাছে দাবি করলো আরও ৭ শতাংশ। আমি তাতেও রাজি হয়েছি। আমি মসজিদের জায়গা দিবো কিন্তু মাদরাসার জায়গা দিতে পারবো না। কারণ তাতে আমার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে। তাই আমি এ বিষয়ে কোন কথাও দিতে পারবো না। সেই ১০ বছর আগের চুক্তির কাগজ এখনও আমার কাছে আছে। কিন্তু পরবর্তীতে আবুল হোসেন সাহেব ও বিভিন্ন লোকজন এমপি সাহেব থেকে ডোনেশন পেয়ে নিজেরা নিজেরা করে ফেলছে। গত ৩ সপ্তাহ আগে আমরা যখন দেখলাম, আমাদের প্রচুর জায়গা দখল করে ফেলছেন আপনারা। তখন আমি বাধা দিয়েছি। এবং আমি মসজিদ কমিটির সাথে মিটিং করছি এবং তারা মেনে নিয়েছে যে, ১৭ শতাংশের উপর আমি মসজিদ করে দিবো এবং নাসিক তাদের সহযোগিতা করবে। আর মাদরাসা তারা অন্যত্র সরায়ে নিবে। যেহেতু টাকার বিনিময়ে মাদরাসায় পড়ায়। তাই তারা অন্য জায়গায় ভাড়া নিয়ে তারা এটা করবে। এখন আমার অপরাধ কোথায়? আপনি অবৈধ জায়গার মধ্যে মসজিদ তুলে রাখছে সেই ফতোয়া দেন না কেন? তাহলে আমি কী মন্ত্রণালয়ে লিখবো, কতিপয় লোকজন আমার জায়গা অবৈধভাবে দখল করে মসজিদ-মাদরাসা করে রাখছে। আমি কমিটিকে ডাকাবো। কমিটি আমার সাথে এক কথা বলে গেল আর আউয়াল হুজুর কেন আমাকে এ ধরণের কথাবার্তা বলতেছে। আমি কিন্তু শহরে ভাইসা আসি নাই।

আব্দুল আউয়াল: ঠিক আছে আমি তাদেরকে ডাকাবো। আপনি মাদরাসা ভেঙ্গে দিতে গিয়েছেন। এ কথাগুলো আমাদের কাছে এসেছে। এবং তারা এ জায়গা ছাড়বে না।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: ভাঙ্গতে হলে তো ভাইঙ্গা দিতাম। ফেরত আসতাম না। আর নারায়ণগঞ্জ শহরে কার এত স্পর্ধা যে, অবৈধ জায়গা ছাড়বে না?

আব্দুল আউয়াল: সেটা তারা বলতেছে তাদের এই অবস্থা। এখন ধর্ম-কর্ম এর দিক থেকে মাদরাসার জন্য একটা জায়গা নিয়ে নিতে পারে।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: তাই বলে আমার কবর রচনা করে আমার থেকে জায়গা নিবেন? আমি ৬টি মসজিদ করে দিচ্ছি এই শহরে। আমি স্কুল করতেছি, মন্দির করতেছি। আমি সব ধর্মের জন্য সমান। আমি তো আপনার মত ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা বলি না। আমার বাবা আমাকে এ শিক্ষা দেয় নাই। আমারে যা খুশি তাই বলবেন, এটা তো হয় না হুজুর। আমি তো আপনার সন্তানের মতোই। আপনি তো আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। এরকম লোকজন এসে মিথ্যা কথা কেন বলবে?

আব্দুল আউয়াল: আমি সবগুলো কথা আপনার থেকে শুনছি, আমি তাদের ডাকাবো। এ অনুযায়ী আমি তাদের থেকে চাইবো।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: আমি নিজের জায়গা দান করে মসজিদ করে দিলাম। একবারও তো শুকরিয়া জানালেন না হুজুর। এই শহরে ৫টা, ৭টা মসজিদ করে দিছি, কবরস্থান সব ঠিক করে দিছি তার জন্য কখনও তো আমার জন্য দোয়া করলেন না।

আব্দুল আউয়াল: এগুলো আমি অনেক আগেই বলেছি ও জনগণের কাছে স্বীকার করেছি। কিন্তু মাদরাসা ও মসজিদ নিয়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তখন চিন্তা করে দেখলাম বিষয় কোনদিকে যাচ্ছে।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: তাহলে অবৈধ জায়গায় মসজিদ থাকবে এটা কী আপনি সমর্থন করেন?

আব্দুল আউয়াল: না। অবৈধ জায়গা বৈধ করতে জনগণের জন্য কষ্ট হয়। আর আপনারা যেহেতু ক্ষমতায় আছেন, বৈধ করলে আপনারা আল্লাহর কাছে অনেক পুরষ্কার পাবেন।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: যারা এই মাদরাসার জায়গায় ব্যবসা করবে সেটাও কী আমি বৈধ করে দিবো। আমার কী পৈত্রিক সম্পত্তি হুজুর? এটা তো সরকারের জায়গা। আমি তো চাইলেই যা খুশি তা করতে পারি না।

আব্দুল আউয়াল: সরকারের এই জায়গা ধর্মীয় অনেক কাজে ব্যবহার হয়।

সেলিনা হায়াৎ আইভী: পার্ক থেকে আমরা কোন ইনকাম করি না। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন হল প্রচুর খোলা জায়গা থাকতে হবে। যারা ঐসব মসজিদের সভাপতি তাদের সবার সাথে আলাপ আলোচনা করে নিয়েছি। আমি এত অবুঝ না। আমি আপনার সন্তানের মত তাই আমার সাথে কথা না বলে আমার বিরুদ্ধে কোন কথা বইলেন না।

সব খবর
রাজনীতি বিভাগের সর্বশেষ